মানুষটি চলে গেছেন, আলোটি রয়ে গেছেঃ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর স্মৃতিতে

জীবনে আমরা অনেক শিক্ষকের কাছে পড়ি। কারও শেখানো সূত্র মনে থাকে, কারও দেওয়া নোট বহু বছর যত্ন করে রেখে দিই, কারও পড়ানো বিষয় আমাদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের ভিত তৈরি করে। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একসময় বুঝতে পারি-সব শিক্ষক আমাদের স্মৃতিতে একইভাবে থেকে যান না। কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁদের পড়ানো পাঠের অনেক কিছু সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু মানুষটিকে কিছুতেই ভোলা যায় না। কারণ তাঁরা শুধু বইয়ের পাতা খুলে দেননি; খুলে দিয়েছিলেন জীবনেরও কিছু দরজা। তাঁরা শুধু মস্তিষ্কে জ্ঞান দেননি; হৃদয়ে রেখে গেছেন মমতা, নৈতিকতা, আদর্শ ও আলোর এক স্থায়ী ছাপ।

আমার জীবনে তেমনই একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক ও উস্তাদ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)।

আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম আলিম পর্যায় থেকে কামিল পর্যন্ত। ছাত্রজীবনে অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি, পরবর্তী জীবনে আরও অনেক স্বনামধন্য শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ হয়েছে; কিন্তু মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) আমার স্মৃতিতে বিশেষ একটি জায়গা দখল করে আছেন। তিনি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের একজন। তবে আজ এত বছর পরে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে হয়, শুধু ‘ভালো শিক্ষক’ বললে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয় না। তিনি সব দিক থেকেই একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন-আদর্শিক, নীতিনিষ্ঠ, সৎ, স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল এবং সত্যের প্রশ্নে আপসহীন। তাঁর কথার চেয়েও তাঁর জীবন আমাদের বেশি শিক্ষা দিত।

আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাদের আলিম পর্যায়ে তিনি ছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তাঁর নামের সঙ্গে ‘অধ্যক্ষ’, ‘আলেম’, ‘শিক্ষক’, ‘প্রশাসক’-অনেক পরিচয়ই যুক্ত করা যায়। কিন্তু আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে আপন এবং সবচেয়ে বড় পরিচয় একটিই-তিনি আমার উস্তাদ ছিলেন।

‘উস্তাদ’ শব্দটি আমার কাছে কেবল ‘শিক্ষক’-এর আরবি প্রতিশব্দ নয়। একজন শিক্ষক একটি বিষয় পড়ান, পরীক্ষা নেন, নম্বর দেন; কিন্তু একজন সত্যিকারের উস্তাদ কখনো কখনো একজন ছাত্রের গোটা জীবনকে স্পর্শ করেন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ থেকে চলে যেতে পারেন, কিন্তু উস্তাদের কোনো একটি কথা, কোনো একটি দৃষ্টি, কোনো একটি আচরণ, কোনো স্নেহময় মুহূর্ত কিংবা নীরবে দেওয়া কোনো শিক্ষা ছাত্রের মধ্যে সারাজীবন বেঁচে থাকে।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) আমার জীবনে তেমনই একজন উস্তাদ।

যে স্মৃতি আজও চোখের সামনে ভাসে

আজও চোখ বন্ধ করলে তাঁর বাসায় পড়তে যাওয়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

আমরা কয়েকজন বিশেষ করে – আমি, মহিউদ্দিন, লোকমান এবং নোমান। নোমান আমার প্রিয় বন্ধু ও হুজুরের কলিজার টুকরা বড় ছেলে। নোমানের বন্ধু হবার সুবাদে আমারা বাসায় যাতায়াত করতাম। আড্ডা গল্প পড়াশোনা খাওয়া দাওয়া অনেক কিছু হত। মাঝে মাঝে ডাঃ গালিব ও সালাউদ্দিন ও যোগ দিতো।

তবে সবচেয়ে স্মৃতিক কাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হুজুর আমাদের বাসায় ডাকতেন। একটি বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁর কত দায়িত্ব, কত ব্যস্ততা! শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, প্রশাসনিক কাজ, প্রতিষ্ঠানের নানা সমস্যা-সবকিছুর ভার তাঁর কাঁধে। অথচ সেই ব্যস্ত মানুষটি আমাদের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর থেকে আলাদা কিছু সময় বের করে রাখতেন।

আমরা তাঁর বাসায় গিয়ে বসতাম। পড়তাম। কথা বলতাম। কখনো সেখানে খাওয়া-দাওয়াও হতো। তারপর শত ব্যস্ততার মধ্য থেকে তিনি এসে আমাদের পাশে বসতেন, কিতাব খুলতেন এবং পড়াতে শুরু করতেন।

এখন ভাবি-আমরা তখন হয়তো বুঝতেই পারিনি, একজন ব্যস্ত অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত সময় থেকে পাওয়া সেই কয়েকটি ঘণ্টার মূল্য কত বড় ছিল। ছাত্র বয়সে আমরা সেটিকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি-কাউকে জ্ঞান দেওয়া মহৎ কাজ, কিন্তু নিজের ব্যস্ত জীবনের একটি অংশ কাউকে দিয়ে দেওয়া আরও বড় ভালোবাসা।

বিশেষভাবে মনে পড়ে নুরুল আনওয়ার পড়ার দিনগুলোর কথা। উসূলুল ফিকহের এই প্রসিদ্ধ কিতাবের বিভিন্ন বিষয় তাঁর কাছে পড়েছি। ফিকহের নানা মাসআলা এবং ইসলামী উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধিবিধানও তাঁর কাছে শিখেছি।

সময়ের কী অদ্ভুত নিয়ম!

আজ নুরুল আনওয়ার-এর প্রতিটি পৃষ্ঠা আমার মনে নেই। তিনি যে মাসআলাগুলো বুঝিয়েছিলেন, সেগুলোর প্রতিটিও হয়তো আজ হুবহু স্মৃতি থেকে বলতে পারব না।

কিন্তু যিনি পড়িয়েছিলেন, তাঁকে ভুলিনি।

কিতাবের অনেক বাক্য ভুলে গেছি, কিন্তু তাঁর মুখটি ভুলিনি। অনেক মাসআলার বিস্তারিত ব্যাখ্যা স্মৃতিতে নেই, কিন্তু তাঁর পাশে বসার অনুভূতিটি আজও আছে। তাঁর ঘরের পরিবেশ মনে আছে। তাঁর আন্তরিকতা মনে আছে। আমাদের জন্য সময় বের করার কথা মনে আছে। তাঁর সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবন মনে আছে।

জীবনের এত বছর পরে এসে শিক্ষার একটি গভীর সত্য বুঝতে শিখেছি- ছাত্র একদিন পাঠের অনেক কিছু ভুলে যেতে পারে, কিন্তু যে শিক্ষক ভালোবেসে পাঠ দিয়েছিলেন, তাঁকে সহজে ভুলতে পারে না।

তিনি শুধু পড়াতেন না, নিজের জীবন দিয়েও শিক্ষা দিতেন

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর যে বৈশিষ্ট্যটি আমাকে আজও গভীরভাবে আলোড়িত করে, তা হলো তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তা। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর নীতি কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর জীবনেও তার প্রতিফলন ছিল।

তিনি সত্যকে সত্য বলতেন। ন্যায়কে ন্যায় মনে করতেন। সত্যের প্রশ্নে আপস করা তাঁর স্বভাবের মধ্যে ছিল না। ব্যক্তিগত সুবিধা, সামাজিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার কারণে নিজের নৈতিক অবস্থান বদলে ফেলার মানুষ তিনি ছিলেন না।

একজন কিশোর ছাত্র হয়তো তখন এসবের গভীরতা পুরোপুরি বোঝে না। কিন্তু শিক্ষককে সে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন, তার পাশাপাশি তিনি কীভাবে কথা বলেন, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, অন্যায় দেখলে কী করেন, সুবিধার সামনে তাঁর নীতি কতটা অটুট থাকে-এসবও নীরবে ছাত্রের ভেতরে প্রবেশ করে।

আজ তাই মনে হয়, তাঁর কাছে আমাদের শিক্ষা শুধু কিতাবের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন-জ্ঞানী হওয়া এবং ভালো মানুষ হওয়া এক জিনিস নয়; প্রকৃত শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জ্ঞানের সঙ্গে সততা, নৈতিকতা, সাহস ও চরিত্র যুক্ত হয়।

তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর। তাঁর মধ্যে অহংকারের প্রকাশ দেখিনি। পদমর্যাদা তাঁকে ছাত্রদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং একজন অধ্যক্ষ হয়েও তিনি কয়েকজন ছাত্রকে নিজের ঘরে বসিয়ে পড়াতে পারতেন, তাদের সঙ্গে সহজ হতে পারতেন, তাদের খোঁজ নিতে পারতেন।

তাঁর কাছ থেকে তাই আমি শুধু ফিকহ শিখিনি; শিখেছি মানুষ হওয়াও।

আমরা তাঁর কাছে রোল নম্বর ছিলাম না

জীবনের অনেক পরে শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন চিন্তাবিদের লেখা পড়তে গিয়ে বারবার আমার উস্তাদের কথা মনে হয়েছে। Paulo Freire শিক্ষা সম্পর্কে সংলাপ ও মানবিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। Martin Buber মানুষের গভীর সম্পর্ক বোঝাতে “I-Thou” ধারণার কথা বলেছেন। Nel Noddings শিক্ষার কেন্দ্রে রেখেছেন care-যত্নকে। bell hooks বলেছেন এমন এক শিক্ষার কথা, যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে নিছক তথ্যগ্রহীতা হিসেবে নয়, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখেন।

তত্ত্বগুলোর ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু ছাত্রজীবনে আমি তার একটি খুব সহজ ও জীবন্ত রূপ দেখেছিলাম মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর মধ্যে।

আমরা তাঁর কাছে শুধু কয়েকটি রোল নম্বর ছিলাম না।

আমরা ছিলাম তাঁর ছাত্র।

এই ছোট্ট বাক্যটির ভেতর কত বড় অনুভূতি লুকিয়ে আছে, তা সম্ভবত একজন ছাত্রই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে।

শত শত ছাত্রের একজন হয়েও তাঁর সামনে গেলে মনে হতো, তিনি আমাকে চেনেন। আমার অস্তিত্ব তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু আমার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ভাবেন না; মানুষ হিসেবেও আমাকে দেখেন।

একজন ছাত্রের জীবনে এই অনুভূতির মূল্য কোনো পরীক্ষার নম্বর দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

ইলমের সঙ্গে ছিল আদব, সোহবত ও মমতা

ইসলামী জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে শিক্ষা কখনো শুধু তথ্য হস্তান্তরের বিষয় ছিল না। ইলমের সঙ্গে ছিল আদব, আমল, ইখলাস এবং উস্তাদের সোহবত।

আল্লাহ তাআলা বলেন- “যারা জানে এবং যারা জানে না-তারা কি সমান?” -সুরা আয-যুমার, ৩৯:৯

আবার আল্লাহ বলেন- “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন।” -সুরা আল-মুজাদালাহ, ৫৮:১১

ইমাম আল-গাজ্জালির শিক্ষাচিন্তাতেও শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু জ্ঞান বিতরণ নয়; শিক্ষার্থীর চরিত্র ও নৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

আজ বুঝতে পারি, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর কাছে পাওয়া শিক্ষার সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলোর একটি ছিল তাঁর সোহবত। একজন ভালো মানুষের কাছে বসাও একধরনের শিক্ষা। একজন সত্যবাদী মানুষের আচরণ দেখা সত্যবাদিতার পাঠ। একজন নীতিবান মানুষের আপসহীনতা দেখা নৈতিক সাহসের পাঠ। একজন বিনয়ী আলেমের জীবন দেখা আদবের পাঠ।

কিছু শিক্ষা মুখে বলতে হয় না।

মানুষের জীবনই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে।

বহু বছর পরও আমি তাঁর সেই ছাত্র

মাদ্রাসার জীবন শেষ হলো। সময় আমাকে দূরে নিয়ে গেল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। নতুন শহর, নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন শিক্ষক, নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন-জীবনের পরিধি ক্রমেই বড় হতে লাগল। আমার পরিচয়ও বদলাতে থাকল।

কিন্তু তাঁর কাছে আমার একটি পরিচয় কখনো বদলায়নি- আমি তাঁর ছাত্র।

একবার তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। খবর পেয়ে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম।

তাঁর শত শত, হয়তো হাজারো ছাত্র ছিল। সেই বিশাল ছাত্রসমুদ্রের মধ্যে আমি একজন মাত্র। এত বছর কেটে গেছে। জীবনের কত ঘটনা ঘটে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই একজন শিক্ষক তাঁর সব ছাত্রকে মনে রাখতে পারবেন না।

কিন্তু তিনি আমাকে চিনলেন।

অসুস্থ অবস্থায়ও আমাকে দেখে তাঁর চোখে পরিচয়ের সেই আলো ফুটে উঠল। তিনি কাছে ডাকলেন। কথা বললেন। আর আমি যেন মুহূর্তের মধ্যে ফিরে গেলাম বহু বছর আগের সেই ছাত্রজীবনে-তাঁর বাসার সেই ঘরে, সেই কিতাবের পাশে, সেই উস্তাদের সামনে।

আজও সেই মুহূর্ত মনে হলে হৃদয় ভারী হয়ে আসে।

কারণ আমরা আমাদের শিক্ষককে মনে রাখব-এটাই স্বাভাবিক। তিনি আমাদের পড়িয়েছেন, আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে পাশে ছিলেন।

কিন্তু একজন শিক্ষক যখন শত শত, হাজারো ছাত্রের ভিড়ের মধ্যেও বহু বছর পর একজন ছাত্রকে মনে রাখেন, তখন সেটি আর শুধু স্মৃতি থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে ভালোবাসার সাক্ষ্য।

আমি তাঁকে ভুলিনি।

আর তিনি যে আমাকে ভোলেননি-একজন ছাত্র হিসেবে এটি আমার জীবনের অমূল্য প্রাপ্তিগুলোর একটি।

একদিন তিনি উত্তরাধিকার পড়িয়েছিলেন

আমার স্মৃতিতে ‘উত্তরাধিকার’ শব্দটির সঙ্গে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর এক অদ্ভুত আবেগময় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

অনেক দিন তাঁর বাসায় বসে তিনি আমাদের ইসলামের উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধিবিধান (ফারায়েজ) পড়িয়েছিলেন। যে পড়াটি কোনক্রমেই আমার মাথায় ঢুকছিল না। কে কতটুকু সম্পদ পাবে, কীভাবে সম্পদ বণ্টিত হবে-তিনি আমাদের বুঝিয়েছিলেন উত্তরাধিকারের হিসাব। তার বিশ্লেষণ দক্ষতা, পড়ানোর ভঙ্গি, মমতা আর পবিত্রতার পরশ ফারায়েজকে আমার কাছে সহজ করে দিলো।

আজ তিনি পৃথিবীতে নেই।

এখন সেই ‘উত্তরাধিকার’ শব্দটি আমার কাছে সম্পূর্ণ অন্য এক অর্থ নিয়ে ফিরে আসে।

একদিন তিনি আমাদের সম্পদের উত্তরাধিকার শিখিয়েছিলেন।

আজ বুঝতে পারি, তিনি নিজেও আমাদের জন্য রেখে গেছেন আরও মূল্যবান এক উত্তরাধিকার- ইলমের উত্তরাধিকার, আদবের উত্তরাধিকার, সততার উত্তরাধিকার, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসের উত্তরাধিকার, ছাত্রকে ভালোবাসার উত্তরাধিকার, এবং নিঃশব্দে মানুষ গড়ে যাওয়ার উত্তরাধিকার।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন- “আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।” -সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩৬৪১

কী অসাধারণ এই উত্তরাধিকার!

সম্পদ ভাগ করলে কমে যায়; জ্ঞান ভাগ করলে বাড়ে। সম্পদের উত্তরাধিকার কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু একজন শিক্ষকের ইলম, আদর্শ ও চরিত্রের উত্তরাধিকার শত শত ছাত্রের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যেতে পারে।

তখন মনে প্রশ্ন জাগে-এমন একজন শিক্ষক কি সত্যিই সম্পূর্ণভাবে চলে যান?

মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর আদর্শ থেকে যায়

আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। Artificial Intelligence কয়েক সেকেন্ডে এমন তথ্য সামনে এনে দিতে পারে, যা একসময় খুঁজতে দিনের পর দিন লাগত। একটি মাসআলার ব্যাখ্যা, একটি বইয়ের সারাংশ কিংবা কোনো জটিল বিষয়ের উত্তর প্রযুক্তি হয়তো মুহূর্তেই দিতে পারে।

তবু মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর কথা মনে হলে বুঝতে পারি- তথ্যের জন্য প্রযুক্তি যথেষ্ট হতে পারে; মানুষ হয়ে ওঠার জন্য মানুষ প্রয়োজন।

AI একটি মাসআলা ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু একজন উস্তাদের সোহবত দিতে পারে না। প্রযুক্তি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু ছাত্রের জন্য গভীর মমতা অনুভব করতে পারে না। Search engine হাজার কিতাবের সন্ধান দিতে পারে, কিন্তু একজন সত্যবাদী মানুষের পাশে বসে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস শেখাতে পারে না।

জ্ঞান শুধু জানার বিষয় নয়; কিছু জ্ঞান দেখে শিখতে হয়, কাছে থেকে অনুভব করতে হয়, মানুষের জীবন থেকে গ্রহণ করতে হয়।

এই কারণেই একজন সত্যিকারের উস্তাদ কখনো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যান না।

একজন শিক্ষকের প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভ তাঁর ছাত্ররা

কোনো প্রিয় শিক্ষক পৃথিবী থেকে চলে গেলে আমরা তাঁর স্মরণে সভা করি, স্মারক প্রকাশ করি, কখনো কোনো ভবন বা প্রতিষ্ঠানের নাম তাঁর নামে রাখি। এসবের মূল্য আছে।

কিন্তু আমার মনে হয়, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় স্মৃতিস্তম্ভ ইট-পাথরের কোনো ভবন নয়।

তাঁর ছাত্ররাই তাঁর জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ।

যে ছাত্র অন্যায়ের সামনে তাঁর শেখানো নীতি মনে করে-সেখানে শিক্ষক বেঁচে আছেন।

যে ছাত্র সত্যের প্রশ্নে আপস না করার শিক্ষা তাঁর জীবন থেকে পেয়েছে-সেখানে শিক্ষক বেঁচে আছেন।

যে ছাত্র তাঁর কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান আরেকজন মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়-সেখানে শিক্ষক বেঁচে আছেন।

আর যে ছাত্র বহু বছর পর নিভৃতে হাত তুলে বলে, “হে আল্লাহ, আমার উস্তাদকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন”-সেই দোয়ার মধ্যেও উস্তাদ ও ছাত্রের সম্পর্ক বেঁচে থাকে।

রাসুলুল্লাহ বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি ছাড়া; এর একটি হলো এমন উপকারী জ্ঞান, যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়। -সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১

একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার আর কী হতে পারে?

আজও আমার ভেতরের সেই ছাত্রটি জেগে ওঠে

আজ আমার প্রিয় উস্তাদকে স্মরণ করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো বড় শিক্ষাতত্ত্ব আমার সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে না।

আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন মানুষ। একজন ব্যস্ত অধ্যক্ষ। তাঁর বাসার একটি ঘর। তিনজন ছাত্র। একটি খোলা কিতাব। কিছু নিরিবিলি বিকেল। একজন শিক্ষকের স্নেহময় মুখ। আর একজন আদর্শিক মানুষের আপসহীন চরিত্র।

মনে পড়ে-আমাদের জন্য তিনি সময় বের করতেন। মনে পড়ে-তিনি আমাদের কাছে বসাতেন। মনে পড়ে-তিনি পড়াতেন। মনে পড়ে-বহু বছর পর হাসপাতালের বিছানায় থেকেও তিনি আমাকে চিনেছিলেন।

আজ তিনি নেই।

এই ‘নেই’ শব্দটি লিখতে কষ্ট হয়।

একসময় যে মানুষটির কাছে বসে কিতাব খুলেছি, যাঁর কণ্ঠে পাঠ শুনেছি, যাঁর ঘরে বসে জ্ঞান অর্জন করেছি-আজ তাঁর জন্যই দূর থেকে দোয়া করি।

জীবনের এটাই হয়তো সবচেয়ে বেদনাময় বাস্তবতা-একসময় যে হাত আমাদের পথ দেখিয়েছে, একদিন সেই হাত আর পৃথিবীতে থাকে না; কিন্তু দেখিয়ে দেওয়া পথটি থেকে যায়। যে কণ্ঠ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, সেই কণ্ঠ একদিন থেমে যায়; কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ছাত্রের জীবনে থেকে যায়।

আমার উস্তাদের কণ্ঠ আজ শুনতে পাই না, কিন্তু তাঁর শিক্ষা রয়ে গেছে। তাঁর পাশে আর বসতে পারব না, কিন্তু তাঁর সোহবতের স্মৃতি রয়ে গেছে। তাঁর কাছে আর কোনো প্রশ্ন নিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু তাঁর জীবন থেকে পাওয়া অনেক উত্তরের আলো আজও রয়ে গেছে।

সম্ভবত একজন সত্যিকারের উস্তাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই-তিনি ছাত্রকে শুধু একটি কিতাব শেষ করিয়ে দেন না; ছাত্রের ভেতরে এমন কিছু শুরু করে দিয়ে যান, যার সমাপ্তি তাঁর মৃত্যুতেও ঘটে না।

শোকের চেয়েও বড় যে অনুভূতি-কৃতজ্ঞতা

আজ তাঁর স্মরণে আমার হৃদয়ে শোক আছে। গভীর শূন্যতাও আছে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে আছে এক অপরিসীম কৃতজ্ঞতা।

আমি কৃতজ্ঞ-আমি তাঁর ছাত্র হতে পেরেছিলাম। কৃতজ্ঞ-মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তাঁর মতো একজন শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। কৃতজ্ঞ-তাঁর বাসায় বসে ইলম শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। কৃতজ্ঞ-তাঁর সময় পেয়েছিলাম। কৃতজ্ঞ-তাঁর স্নেহ পেয়েছিলাম। কৃতজ্ঞ-তাঁর আদর্শিক ও নীতিনিষ্ঠ জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। কৃতজ্ঞ-তিনি আমাকে মনে রেখেছিলেন। এবং সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ-জীবনের এত পথ পেরিয়ে আজও তাঁকে স্মরণ করলে আমার ভেতরের সেই কিশোর ছাত্রটি জেগে ওঠে।

মনে হয়, আবার যদি একবার সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম! আবার যদি তাঁর বাসার সেই ঘরে গিয়ে বসতে পারতাম! আবার যদি তিনি কিতাবটি খুলে বলতেন- “পড়ো।”

কিন্তু সময় কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। মানুষ চলে যান। স্মৃতি থেকে যায়। আর কিছু মানুষ স্মৃতির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে থেকে যান-তাঁরা আমাদের চরিত্রে, চিন্তায়, দোয়ায় এবং জীবনের পথচলায় মিশে যান।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।

আল্লাহ তাআলা আমার প্রিয় উস্তাদ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সকল ইলমি, দ্বীনি ও শিক্ষামূলক খেদমত কবুল করুন। তিনি যত ছাত্রকে শিক্ষা দিয়েছেন, যত মানুষের হৃদয়ে কল্যাণের বীজ বপন করেছেন, যত জ্ঞান বিতরণ করেছেন এবং যত মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করেছেন-সবকিছুকে তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।

আল্লাহ তাঁর জানা-অজানা সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত, শান্তিময় ও নূরে পরিপূর্ণ করুন। তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চতম স্থানে স্থান দিন।

আর আমাদের তাওফিক দিন-আমাদের উস্তাদদের কাছ থেকে পাওয়া ইলম, আদব, সততা, নৈতিকতা, সত্যনিষ্ঠা ও ভালোবাসার উত্তরাধিকার যেন আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।

কারণ জীবনের শেষ পর্যন্ত এসে হয়তো আমরা আবিষ্কার করি- পাঠ একদিন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু প্রভাব শেষ হয় না। কিতাব একদিন বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষা বন্ধ হয় না। ছাত্র একদিন দূরে চলে যায়, কিন্তু কিছু সম্পর্ক কখনো দূরে যায় না। শিক্ষকের কণ্ঠ একদিন থেমে যায়, কিন্তু তাঁর শিক্ষা কথা বলতে থাকে। মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো থেকে যায়।

আর কিছু মানুষের ক্ষেত্রে- মানুষটি চলে যান, কিন্তু উস্তাদ থেকে যান।

রহিমাহুল্লাহু তা’আলা রহমাতান ওয়াসি আহ।

আল্লাহ আমার প্রিয় উস্তাদ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-কে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিন এবং তাঁর ছাত্র হিসেবে আমাদের জীবনকে তাঁর জন্য সদকায়ে জারিয়ার একটি ক্ষুদ্র মাধ্যম হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আলিয়া মাদরাসা নিয়ে একটি গবেষণা

সারসংক্ষেপ:

এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাদান কাঠামো এবং ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষা প্রদানের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষ অধ্যাপকের প্রয়োজনীয়তা এবং একাডেমিক পরিবর্তনসমূহের অকার্যকর বাস্তবায়ন। এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো এই ব্যবস্থার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা এবং এর ঐতিহাসিক উৎপত্তি, প্রতিষ্ঠা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরা। এই গবেষণার তথ্য গুণগত পদ্ধতির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা নথিপত্র, পূর্ববর্তী গবেষণা এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে তথ্য পাওয়ার সাথে জড়িত। এই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে টেক্সট বিশ্লেষণ, সাহিত্য পর্যালোচনা এবং অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের জন্য পর্যবেক্ষণ। গবেষণাটি দেখায় যে, মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানে আলিয়া মাদরাসাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলাফলগুলো দেখায় যে, আলিয়া মাদরাসাগুলোর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এবং এগুলো ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার অনন্য সমন্বয় করে। তবে, পুরনো পাঠ্যক্রম, পরিচালনাগত সমস্যা এবং অপর্যাপ্ত সম্পদের কারণে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বাংলাদেশে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। শিক্ষার মান উন্নত করার মাধ্যমে, আলিয়া মাদরাসাগুলো শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে কার্যকরভাবে সজ্জিত করতে পারে।

ভূমিকা

শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর কেন্দ্রীভূত ইসলামী প্রতিষ্ঠান মাদরাসার একটি দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে, যার সূত্রপাত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়। নবী মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে প্রথম মাদরাসা, যার নাম দারুল আরকাম, প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে, হিজরতের পর তিনি মদিনায় সুফফা রেসিডেনশিয়াল মাদরাসা এবং দারুল কুররা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে শিক্ষার গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী বিশ্বের শিক্ষা পরিবেশকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।১

বাংলায় মাদরাসা শিক্ষার সূচনা সুলতানি আমলে (১২১০-১৫৭৬) খুঁজে পাওয়া যায়, যখন মৌলানা তাকিউদ্দিন আরবি মহিসন্তোষে প্রথম মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মোগল আমলে মাদরাসা শিক্ষার পরিধি বিস্তৃত হয়ে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ভূগোল, হিসাববিজ্ঞান, কৃষি, লোক প্রশাসন, জীববিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা এবং চারুকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। এই ধীরে ধীরে সম্প্রসারণটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। বাংলাদেশে বর্তমান মাদরাসাগুলোর উৎপত্তি ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে মুসলিম রাজা বখতিয়ার খিলজি দ্বারা বাংলায় প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো পর্যন্ত পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে পর্যন্ত এই স্কুলগুলোই ছিল একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা মুসলিম জনসংখ্যাকে শিক্ষা প্রদান করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার দুটি স্বতন্ত্র রূপ রয়েছে: কওমি, যা একটি বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত পুরনো ধরনের মাদরাসা; এবং আলিয়া, যা সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত আধুনিক ধরনের মাদরাসা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ৪ জুলাই তিনি মাদরাসা শিক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে একটি পৃথক মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আলিয়া মাদরাসা কলকাতা আলিয়া মাদরাসা অঞ্চলটির শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট অবস্থান ধারণ করে। গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সহায়তায় ১৭৮০ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত, এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ে ভারতে সরকার-পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক চিহ্নিত করেছিল।

আলিয়া মাদরাসা, যা “হাই মাদরাসা” নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের একটি সরকার-নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা কামিল (মাস্টার্স) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করে। এটি ধর্মীয় এবং আধুনিক শিক্ষাকে একত্রিত করে। আলিয়া মাদরাসার উৎপত্তি ১৭৮০ সাল পর্যন্ত পাওয়া যায়, যখন ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতায় প্রথম আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল তরুণ মুসলমানদের কাঠামোবদ্ধ শিক্ষা প্রদান করা, যাতে তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে পাবলিক সার্ভিসে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার পর, কলকাতা আলিয়া মাদরাসার সম্পদ ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তারা সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা প্রতিষ্ঠা করে, যা বাংলাদেশের প্রথম আলিয়া মাদরাসায় পরিণত হয়। বছরের পর বছর ধরে, ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, গণিত, সাধারণ শিক্ষা, আরবি, কুরআন ও হাদিস, আকাইদ ও ফিকহ এবং তাজবীদসহ অতিরিক্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে পাঠ্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। বৃত্তি এবং ভাতার মাধ্যমে সরকারি সহায়তায় পরিচালিত আলিয়া মাদরাসাগুলো কওমি মাদরাসা থেকে আলাদা, যেগুলো সম্পূর্ণভাবে অনুদান এবং দাতব্য অবদানের উপর নির্ভরশীল। আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষাদানের পদ্ধতি তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক পদ্ধতির সমন্বয় করে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যৌক্তিক যুক্তি এবং সৃজনশীলতা বাড়ায়। এটি লেকচার, ডেমনস্ট্রেশন, আলোচনা এবং ল্যাবরেটরি সেশনের মাধ্যমে অর্জন করা হয়। শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং এনটিআরসিএ দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হয় এবং এটি শিক্ষকদের শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার সাথে জড়িত। বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা ধর্মীয় এবং আধুনিক শিক্ষাকে একত্রিত করে, সরকারি সহায়তা এবং নিয়ন্ত্রিত নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্বারা সমর্থিত। এটি দেশের মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই নিবন্ধটি বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক শিকড়, প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষা কাঠামো ও ফ্রেমওয়ার্ক পরীক্ষা করে।

এই গবেষণাটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে, এর ঐতিহাসিক পটভূমি, শিক্ষাগত পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানে এর অবদানের উপর ফোকাস করে। এটি বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার বিবর্তন, বিশেষ করে আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা, যা ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষার সাথে আধুনিক শিক্ষাকে একত্রিত করে, তা স্পষ্ট করার লক্ষ্য রাখে। এটি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মুখীন হওয়া বাধাসমূহ এবং আরও শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির উপর এর প্রভাবও পরীক্ষা করে।

এই গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিকাশ এবং অনন্য শিক্ষা কৌশল সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, যা আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাকে একত্রিত করে, যা এই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শিক্ষা খাতে উন্নতি ও আধুনিকায়নের প্রচেষ্টাকে তথ্য দেয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং কর্মশক্তি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ব্যবস্থার তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা মূল্যায়ন করে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক এবং পেশাদার প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করে এমন সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে।

গবেষণাটি আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতাগুলো অন্বেষণ করার জন্য একটি গুণগত পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই গবেষণায় একটি আখ্যানভিত্তিক অনুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আলিয়া মাদরাসার ঐতিহাসিক উৎপত্তি এবং শিক্ষাদান কাঠামো সম্পর্কে একটি ব্যাপক বোঝার সুবিধা দেয়।

তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতির মধ্যে ছিল সাহিত্য পর্যালোচনা, টেক্সটুয়াল বিশ্লেষণ এবং পর্যবেক্ষণ।

সাহিত্য পর্যালোচনা: আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা সম্পর্কে তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি পেতে বিদ্যমান সাহিত্যের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা। এর মধ্যে ঐতিহাসিক সাহিত্য, একাডেমিক জার্নাল, সরকারি নথিপত্র এবং বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কিত পূর্ববর্তী গবেষণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সাহিত্য পর্যালোচনাটি আলিয়া মাদরাসার ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহৃত শিক্ষাদান পদ্ধতিগুলো পরীক্ষা করে।

টেক্সটুয়াল বিশ্লেষণ: আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রম, একাডেমিক নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো বুঝতে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং অন্যান্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষের প্রাসঙ্গিক নথি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি শিক্ষার মানে ঘাটতি এবং সমন্বয়ের প্রয়োজন এমন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে।

পর্যবেক্ষণমূলক অন্তর্দৃষ্টি: ক্লাসরুমের গতিশীলতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে সরাসরি অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের জন্য কিছু আলিয়া মাদরাসায় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়েছে। ফিল্ড ট্রিপগুলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা এবং ধারণা সম্পর্কে গুণগত তথ্য সংগ্রহ করতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার সুযোগ করে।

সংগৃহীত তথ্য থিম্যাটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছিল, যাতে আলিয়া মাদরাসার ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং বিবর্তন, ধর্মীয় এবং সমসাময়িক বিষয়গুলোকে একত্রিত করে এমন শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষকের দক্ষতা, সামাজিক পক্ষপাতিত্ব এবং পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতার মতো চ্যালেঞ্জসমূহ সম্পর্কে পুনরাবৃত্তিমূলক থিম এবং প্যাটার্নগুলো চিহ্নিত করা যায়।

প্রত্যাশিত ফলাফল

আশা করা হচ্ছে যে গবেষণাটি সমসাময়িক কোর্সের সাথে ইসলামী শিক্ষাকে একত্রিত করে একটি দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রদানে আলিয়া মাদরাসাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উপর আলোকপাত করবে।

এই গবেষণাটি দেখানোর লক্ষ্য রাখে যে, দীর্ঘকালীন অস্তিত্ব এবং অনন্য শিক্ষাগত গ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও, আলিয়া মাদরাসাগুলো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে অযথার্থ পাঠ্যক্রম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং তহবিলের অভাব, যা বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।

বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধান এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ও কর্মশক্তির জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি বাড়ানোর মাধ্যমে, এই গবেষণাটি আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য ব্যবহারিক সমাধান প্রদান করার লক্ষ্য রাখে।

বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসার ঐতিহাসিক শিকড়

ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান মাদরাসার উৎপত্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়কালে। তিনি মক্কায় সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দারুল আরকাম প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে হিজরতের পর মদিনায় সুফফা রেসিডেনশিয়াল মাদরাসা এবং দারুল কুররা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।২ এছাড়াও, মসজিদে নববী এবং মদিনার অন্যান্য মসজিদগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত। হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর মতো বিশিষ্ট খলিফাগণ তাদের শাসনামলে তাৎপর্যপূর্ণ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উমাইয়া এবং আব্বাসীয় যুগে মসজিদ এবং পৃথক মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রাপ্তি প্রয়োজন ছিল। সুলতানি রাজবংশের (১২১০-১৫৭৬) সময় বাংলায় প্রথম মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারপরে সুফিগণ বিকাশ লাভ করেছিলেন এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।৩ এই সময়কালে বেশ কয়েকটি মাদরাসার বিকাশ ঘটে, যার মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে পুরনোটি, যা মৌলানা তাকিউদ্দিন আরবি মহিসন্তোষে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯) গৌড় এবং মালদহে মাদরাসা শিক্ষার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিলেন। সুলতানি পাঠ্যক্রমে আরবি, নাহু, সরফ, বালাগাত, মানতিক, কালাম, তাসাওউফ, সাহিত্য, ফিকহ এবং দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।৪ মোগল যুগে মাদরাসা শিক্ষা জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ভূগোল, হিসাববিজ্ঞান, কৃষি, লোক প্রশাসন, জীববিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা এবং চারুকলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রসারিত হয়েছিল।৫ ১৭৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়া মাদরাসা বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট অবস্থান দখল করে আছে। আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার স্রষ্টা হিসেবে, এই প্রতিষ্ঠানটি অঞ্চলটির একাডেমিক পরিবেশ গঠনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। কলকাতা আলিয়া মাদরাসা থেকে উদ্ভূত আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষাগত কাঠামোর একটি মৌলিক উপাদান হয়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থাটি ইসলামী বিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর জোর দেয়, যার মধ্যে রয়েছে কুরআনের ব্যাখ্যা, হাদিসের অধ্যয়ন এবং ইসলামী আইন বোঝা। এতে ভাষা ও সাহিত্য, বিশেষ করে আরবি, ফারসি এবং বাংলা অধ্যয়নও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ব্যবস্থার ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধিই বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে মাদরাসা শিক্ষা

মুসলিম নিয়ন্ত্রণের পতন এবং ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশদের আগমনের পর, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন দিকে ভারত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ধীর পতন ঘটে ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবের কারণে, যা ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইংরেজি শিক্ষা চালু করেছিল।৬ এই রূপান্তরটি মানসিক এবং নৈতিক বিকাশের প্রচলিত জোরের একটি উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি উপস্থাপন করেছিল, শিক্ষাকে পার্থিব আকাঙ্ক্ষার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইংরেজি শিক্ষা বৃদ্ধির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে সহজতর করা।৭ ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বারা ১৭৮১ সালে মাদরাসা-ই-আলিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এমন পণ্ডিতদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য যারা আরবি এবং ফারসি ভাষায় দক্ষ ছিলেন।৮ এই শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিদের পাবলিক সার্ভিসের জন্য প্রস্তুত করা। সরকারি চাকরির জন্য ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব মুসলমানদের জন্য ঐতিহ্যবাহী সুযোগগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল, যার ফলে দেওবন্দে দার-উল-উলূম এবং আলিগড়ে মুহাম্মাদান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। তবে, উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো সত্ত্বেও, কলকাতা মাদরাসার মতো বেশ কয়েকটি মাদরাসা অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল। বিশেষ করে কলকাতা মাদরাসা সংস্কার বাস্তবায়ন করেছিল যা ইসলামী শিক্ষার স্থায়ী প্রকৃতির উপর জোর দিয়েছিল। ১৯২২ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত সময়কালটি শিক্ষাগত অগ্রগতির সর্বোচ্চ স্তর দেখেছে, যা ভারতীয় শিক্ষার ক্রমাগত পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে তুলে ধরেছে।৯

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারীয় উপমহাদেশে, মাদরাসাগুলো তাদের চরিত্র, পরিধি এবং ভূমিকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল। এই বিবর্তন ঔপনিবেশিক প্রশাসন দ্বারা বাস্তবায়িত শিক্ষা নীতি, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর একটি পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিবেশে তাদের ভূমিকার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য মুসলমানদের প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিচয়ের রাজনীতির উত্থান দ্বারা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।১০ এইভাবে, ঔপনিবেশিক ভারতে মাদরাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার জন্য এই তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত দিক বিবেচনা করে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্যের ভিত্তির কাছে পাওয়া যায়। এটি ব্রিটিশ সর্বোচ্চতার সূচনা সংকেত দিয়েছিল, যা ক্রমান্বয়ে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে তার নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করেছিল। মোগল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল, বিশেষ করে ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর। এই ক্ষতি ব্রিটিশ সম্প্রসারণের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছিল, তাদের নীতিগুলো প্রাথমিকভাবে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার মতো প্রদেশগুলোকে লক্ষ্য করেছিল। এই নীতিগুলো একটি ব্যাপকতর ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে শিক্ষায় আনুষ্ঠানিক ব্রিটিশ সম্পৃক্ততা শুরু হয়েছিল, যদিও বিভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষাগত প্রচেষ্টার পূর্বের লক্ষণ রয়েছে। মোগল যুগে, পাঠশালা, মস্তবা এবং মাদরাসাসহ ঐতিহ্যবাহী একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো মিশনারি স্কুলের মতো উদীয়মান উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি অব্যাহত ছিল। যদিও মিশনারীরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তাদের শিক্ষাগত অনুশীলন গঠনে প্রভাবিত করেছিল, এটি তার ভারতীয় জনগণের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ উস্কে দেওয়া এড়াতে ধর্মীয় প্রতিবেদনপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ১৭৮০ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস দ্বারা কলকাতা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল, যা প্রধানত রাজনৈতিক কারণ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল।১১ এই উদ্যোগটি সক্রিয়ভাবে মুসলিম জনসংখ্যাকে জড়িত করার, ব্যবস্থাপনাগত পদে ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার এবং সম্প্রদায়ের আইনি প্রয়োজনীয়তা পূরণের লক্ষ্য রাখে। দরসে নিযামি পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন সেই যুগে প্রচলিত শিক্ষার ব্যবহারিক পদ্ধতির উদাহরণ দিয়েছিল।

তবে, বিশেষ করে ১৮৩৫ সালে থমাস ম্যাকালের শিক্ষা মিনিট প্রবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা কর্মসূচির দিকনির্দেশনা যথেষ্ট পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। এই ঘোষণাটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন উপস্থাপন করেছিল, পশ্চিমা শিক্ষা এবং ইংরেজিকে প্রাথমিক শিক্ষার ভাষা হিসেবে অগ্রাধিকার দিয়ে মাদরাসার মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রান্তিক করে।১২ ফলশ্রুতিতে ফারসি ভাষার প্রান্তিককরণ এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি ক্রমবর্ধমান মনোযোগ সরকারি চাকরি পেতে মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব আরও হ্রাস করেছিল। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, শিক্ষা পদ্ধতির একটি ব্যাপক পুনর্মূল্যায়ন ১৮৫৪ সালে উডের ডিসপ্যাচ প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এই ব্যাপক কাঠামো একটি পদ্ধতিগত এবং সম্পূর্ণ রূপান্তরের প্রস্তাব করেছে, ফিল্টারিং নীতি থেকে প্রতিটি স্তরে সরকার-অর্থায়িত শিক্ষায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। পরবর্তী শিক্ষার পশ্চিমাকরণ প্রক্রিয়াটি মাদরাসার মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশের দিকে সরিয়ে দিয়েছিল, তাদের খাপ খাইয়ে নিতে বা অপ্রচলিত হতে বাধ্য করেছিল।১৩ এই কঠিনাইগুলো সত্ত্বেও, মাদরাসাগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গুরুত্ব ধরে রেখেছিল, বিশেষ করে পরিচয়ের রাজনীতি এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতো ব্যক্তিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, সংস্কার গোষ্ঠীগুলো পরিচয়ের সমস্যাগুলো মোকাবিলা এবং ঔপনিবেশিক ব্যাঘাতের কারণে হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য উদ্ভূত হয়েছিল। বিবর্তনশীল শিক্ষা পরিবেশে মাদরাসাগুলো এখন শুধুমাত্র ইসলামী শিক্ষার স্থান হিসেবেই নয়, বরং প্রতিরোধ, ক্ষমতায়ন এবং সম্প্রদায়ের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যদিও কলকাতা মাদরাসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সমসাময়িক মাদরাসা শিক্ষা বিকাশে একটি ভিত্তিগত ভূমিকা পালন করেছিল, দেওবন্দ মাদরাসার মতো উদ্যোগগুলো মুসলিম সচেতনতা এবং কর্মকাণ্ডের একটি অনন্য উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিল।১৪ ঔপনিবেশিক ভারতে মাদরাসাগুলোর আখ্যানটি ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষা এবং বিবর্তনশীল পরিচয়ের মধ্যে জটিল মিথস্ক্রিয়া চিত্রিত করে যখন শিক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের রূপান্তরমূলক ঔপনিবেশিক শক্তির মাঝে, মাদরাসাগুলো স্থিতিস্থাপকতার দুর্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করেছিল এবং মুসলিম পরিচয়ের গঠনকে প্রভাবিত করেছিল।১৫

কলকাতা আলিয়া মাদরাসা: ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম আলিয়া মাদরাসা

কলকাতা মাদরাসা, যা পরে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা নামে পরিচিত হয়, ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট অবস্থান দখল করে আছে। গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সহায়তায় ১৭৮০ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত, এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে ভারতে সরকার-পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক চিহ্নিত করেছিল। মাদরাসাটি প্রাথমিকভাবে কলকাতার সিয়ালদহের কাছে বৈঠাখানায় অবস্থিত ছিল, কিন্তু পরে এটি ১৮২৭ সালে ওয়েলেসলি স্কয়ারে স্থানান্তরিত হয়।১৬ এর গঠনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলার মুসলিম জনসংখ্যার শিক্ষাগত প্রয়োজন মেটাতে ফারসি, আরবি এবং মুসলিম আইনে ব্যাপক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের লালন করা। মুল্লা মজদুদ্দিন এবং পরে মুহাম্মদ ইসমাইলের নির্দেশনায়, মাদরাসাটি অসংখ্য কঠিনাই এবং সংস্কার উদ্যোগের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তার মিশন অব্যাহত রেখেছিল।১৭ আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ এবং আধুনিকায়নের বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও, এটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মুসলিম শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে ইসলামী শিক্ষার একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে চলেছে। যদিও মাদরাসাটি প্রাথমিকভাবে একটি ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেছিল, পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টায় ইংরেজি এবং আধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যদিও সীমিত কার্যকারিতা নিয়ে। যদিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একীভূত করার প্রস্তাব ছিল, মাদরাসাটি তার স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল, উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাগত পথ প্রতিষ্ঠা করেছিল।১৮ কলকাতা মাদরাসা মুসলিম পণ্ডিতদের বিকাশে এবং ইসলামী জ্ঞান সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, ঔপনিবেশিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এই স্কুলের ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র-পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক, কারণ এটি অঞ্চলটিতে ইসলামী শিক্ষার বিকাশের পথ প্রশস্ত করেছিল।

কলকাতা মাদরাসা, যাকে এখান থেকে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা বলা হবে, ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ গুরুত্ব ধারণ করে। কলকাতা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ছিল তরুণ মুসলমানদের শিক্ষিত করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি স্কুলের জন্য কলকাতায় মুসলমানদের অনুরোধের একটি সরাসরি প্রতিক্রিয়া।১৯ এই উদ্যোগটি ভারতে তাদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার ব্রিটিশ প্রচেষ্টায় শিক্ষার তাৎপর্যকে তুলে ধরার লক্ষ্য রেখেছিল।২০ এই প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন উপাদানকে আত্তীকরণ এবং আদিবাসী অভিজাত শ্রেণীর দ্বারা অনুসৃত আধুনিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে একটি মূল ভূমিকা পালন করেছিল।

কলকাতা মাদরাসা এবং বেনারস সংস্কৃত কলেজ হেস্টিংস দ্বারা চালু করা ওরিয়েন্টালিস্ট শিক্ষা কৌশলকে প্রতিনিধিত্ব করেছিল যা ভারতে ব্রিটিশ আধিপত্য বজায় রাখতে সহায়তা করার জন্য একটি সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেছিল।২১ কলকাতা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ঔপনিবেশিক ভারতের শিক্ষাগত পরিবেশে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন চিহ্নিত করেছিল, যা অঞ্চলজুড়ে তাদের উপস্থিতি এবং নিয়ন্ত্রণ সমন্বিত করার জন্য ব্রিটিশদের দ্বারা নিযুক্ত বিভিন্ন কৌশলকে প্রতিফলিত করেছিল। এই জরুরি প্রয়োজনের প্রতিক্রিয়ায়, কলকাতার একটি দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে অনুরোধ করেছিল, যার ফলে অক্টোবর ১৭৮০ সালে মাদরাসা-ই-আলিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে, কলেজটি সিয়ালদহের একটি ভাড়া করা সুবিধায় ৪০ জন শিক্ষার্থী থাকার ক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলার মুসলিম জনসংখ্যাকে ইসলামী শিক্ষা প্রদান করা।২২

নির্দিষ্ট গ্রাম থেকে রাজস্ব বরাদ্দ করে মাদরাসার অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা এর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছিল। হেস্টিংসের সমর্থনে, মাদরাসাটি রাজকোষ থেকে বার্ষিক ভর্তুকি পেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিল, যা এর সম্প্রসারণ এবং অগ্রগতি সক্ষম করেছিল। সময়ের সাথে সাথে, ১৮২১ সালে পরীক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং ১৮২৬ সালে এর শিক্ষা কর্মসূচিতে ইংরেজির সমন্বয়সহ মাদরাসাটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল।২৩ ভারত বিভাগ এবং ঢাকায় পরবর্তী স্থানান্তরের মতো কঠিনাইগুলোর সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, মাদরাসাটি অব্যাহত ছিল, এর সুবিধা এবং একাডেমিক প্রোগ্রামগুলো উন্নত করেছিল। বর্তমানে, সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ইসলামী শিক্ষার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের একটি স্পষ্ট প্রতিনিধিত্ব হিসেবে কাজ করে। এটি তার লাইব্রেরিতে মূল্যবান বইয়ের সংগ্রহ করে এবং আসন্ন প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশে পণ্ডিত ব্যক্তিদের বিকাশে নিবেদিত রয়েছে। কলকাতা আলিয়া মাদরাসার ভিত্তি ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক ছিল। এটি সরকার-পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশে এবং অঞ্চলটিতে ইসলামী জ্ঞান রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় প্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়া মাদরাসাই হলো সেই স্থান যেখান থেকে বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার উৎপত্তি হয়েছে।২৪ বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে, এই ব্যবস্থাটি সময়ের সাথে সাথে উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত এবং পাঠ্যক্রমগত পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, শিক্ষাদানকে আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে একীভূত করার লক্ষ্যে।

১৮৮২ সালের হান্টার কমিটি ছিল অঞ্চলে মাদরাসা শিক্ষা উন্নত করার প্রথম এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে একটি, যা একটি আরও ব্যাপক শিক্ষা প্রদানের জন্য ইসলামী শিক্ষাকে অধর্মীয় বিষয়গুলোর সাথে একত্রিত করে একটি সুষম পাঠ্যক্রমের উপর জোর দিয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করা এবং স্থানীয় ভাষায় শেখানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক কর্তৃত্ব স্থানীয় সত্ত্বায় অর্পণ করার পরামর্শ দিয়ে, এটি শাসন এবং শিক্ষার মান উন্নত করার পাশাপাশি শিক্ষায় প্রবেশাধিকার এবং মান উন্নত করার লক্ষ্য রেখেছিল। কমিটিটি প্রচলিত অধ্যয়নের পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা এবং কৃষির মতো ব্যবহারিক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার এবং মহিলা শিক্ষার মূল্যের উপর জোর দেওয়ার লক্ষ্যও রেখেছিল। এই সংস্কারগুলো পরে ১৯২৭ সালে শামসুল হুদা কমিটি দ্বারা আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যা প্রশাসনিক তত্ত্বাবধান উন্নত করতে এবং পাঠ্যক্রম আপডেট করতে ইসলামী অধ্যয়নের পাশাপাশি সমসাময়িক শাস্ত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত করে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার পরামর্শ দিয়েছিল। এই কমিটিগুলো একসাথে পরবর্তী সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেছিল যা ধীরে ধীরে মাদরাসা শিক্ষাকে বৃহত্তর জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একীভূত করেছিল, শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় দায়িত্বের বাইরে উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন কর্মসংস্থানের বিকল্প অনুসরণ করতে সক্ষম করেছিল।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান এবং সুসংগতি উন্নত করার জন্য মানসম্মত পরীক্ষা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম তৈরির পরামর্শ দিয়ে ১৯৩১ সালের মোমেন কমিটি আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার মধ্যে সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, মোস্তফা বিন কাসেম কমিটি ১৯৭৮ সালে ঐতিহাসিক সংস্কার প্রবর্তন করেছিল, যা ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অধ্যয়নের পাশাপাশি একটি জাতীয় পাঠ্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করে আলিয়া মাদরাসা পাঠ্যক্রমকে আরও আধুনিক করেছিল। কমিটির সুপারিশগুলো শিক্ষাদানকে পেশাদার করে এবং ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ অধ্যয়নকে একত্রিত করে একটি আরও সুসংগত শিক্ষাগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে আলিয়া মাদরাসার একাডেমিক মান উন্নত করার লক্ষ্য রেখেছিল। মাদরাসার যোগ্যতা এবং সাধারণ শিক্ষা সনদপত্রের মধ্যে আরও ভাল সমতা এবং সামঞ্জস্য সুবিধার্থে, এই কমিটি মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারার স্কুলগুলোর কাছাকাছি আনার জন্য ব্যাপক পাঠ্যক্রম তৈরি করার উপর জোর দিয়েছিল। এই সংস্কারগুলো শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় খাতের বাইরে আরও শিক্ষা এবং বিভিন্ন কর্মসংস্থানের বিকল্প অনুসরণ করার অনুমতি দিয়ে তাদের একাডেমিক দিগন্ত প্রসারিত করার লক্ষ্য রেখেছিল এবং পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন, মানকরণ এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সমন্বয় উৎসাহিত করে, মোমেন এবং মোস্তফা বিন কাসেম কমিটি যৌথভাবে বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।২৫

ঐতিহ্যবাহী ইসলামী অধ্যয়নের সাথে বিজ্ঞান, গণিত এবং মানবিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে, বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারগুলো পাঠ্যক্রমকে উল্লেখযোগ্যভাবে আধুনিক করেছে, যা শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ক্ষেত্রের বাইরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনুসরণ করতে সক্ষম করেছে। উচ্চশিক্ষা, পাবলিক সার্ভিস এবং অন্যান্য পেশাদার খাতসহ ক্যারিয়ারের পথের একটি বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশাধিকার প্রদান করে, এই পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করেছে এবং তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে। মাদরাসা এবং মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে, এই সংস্কারগুলো জাতীয় সমন্বয়েও অবদান রেখেছে এবং বাংলাদেশে একটি আরও সমন্বিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাগত কাঠামো গড়ে তুলেছে। অপর্যাপ্ত তহবিল এবং দুর্বল বাস্তবায়নের মতো বাধাগুলো সত্ত্বেও, এই পরিবর্তনগুলো দেখায় যে আলিয়া মাদরাসাগুলো ঐতিহ্যবাহী এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করার পাশাপাশি আধুনিক একাডেমিয়া এবং ধর্মীয় শিক্ষার চাহিদা মেটাতে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। এই দ্বৈত জোর এমন সুষম ব্যক্তিদের বিকাশে সহায়তা করে যাদের ইসলামী শিক্ষার বোঝার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমসাময়িক দক্ষতা রয়েছে।২৬ ফলস্বরূপ, আলিয়া মাদরাসার সংখ্যায় ধারাবাহিক বৃদ্ধি হয়েছে, যা মূলধারার শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রাপ্যতা উন্নত করেছে।২৭

বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে যা ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত ফিরে যায়। বখতিয়ার খিলজি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলো এই ব্যবস্থাটি গঠন করেছিল।২৮ মসজিদ এবং খানকাহসহ এই প্রতিষ্ঠানগুলো আঠারো শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যাকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ছিল; তবে এরপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন পরিস্থিতি পরিবর্তন করেছিল। ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সেবা করবে এমন ব্যক্তিদের উৎপাদনের দিকে মনোযোগ স্থানান্তরিত হয়েছিল। এর ফলে ১৭৮০ সালে কলকাতা ‘আলিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।২৯ এটি দরসে নিযামি ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে একটি পাঠ্যক্রমের দিকে একটি রূপান্তর নির্দেশ করেছিল, যা ফারসি ভাষা, ব্যাকরণ, যুক্তি, দর্শন, গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং কুরআনের অধ্যয়নের উপর মনোযোগ হ্রাস করেছিল।৩০

১৮৩০ এর দশকে ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা ‘আলিয়া মাদরাসার স্নাতকদের সরকারি পদ পূরণের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করেছিল। পরিবর্তনশীল শিক্ষাগত এবং শ্রম বাজারের প্রয়োজনীয়তার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ অধ্যয়নকে একত্রিত করে একটি নতুন ধরনের মাদরাসার বিবর্তন ঘটেছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো ‘আলিয়া মাদরাসায়’ রূপান্তরিত হয়েছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) একটি উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।৩১ ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা এবং সমসাময়িক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার সমন্বয় বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। ১৬ বছর এবং পাঁচটি স্তর জুড়ে, এই পাঠ্যক্রমে ইংরেজি, বাংলা, বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস এবং ইসলামী শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকার এই কলেজগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, এবং তাদের ডিগ্রিগুলো প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রির মতো একই গুরুত্ব বহন করে।৩২

পাকিস্তান একটি স্বায়ত্তশাসিত এবং স্বশাসিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, এটি নির্ধারণ করা হয়েছিল যে মাদরাসার আরবি বিভাগটি ঢাকায়, পূর্ব পাকিস্তানের নতুন মনোনীত রাজধানীতে (বর্তমানে বাংলাদেশ নামে পরিচিত) স্থানান্তরিত হবে। তৎকালীন অধ্যক্ষ খান বাহাদুর এম. জিয়াউল হকের নির্দেশনায় এবং তার কর্মীদের সহায়তায়, মাদরাসাটি, এর বিস্তৃত লাইব্রেরি, আসবাবপত্র এবং অফিসের রেকর্ডসহ, কার্যকরভাবে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল এবং ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে সংরক্ষিত হয়েছিল। মাদরাসা এবং এর ছাত্রাবাসগুলো ঢাকার বকশী বাজারের একটি আরও বিশিষ্ট স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান সরকার উপযুক্ত ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল অনুমোদন করেছিল, যার আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছিল ৩৩,০০,০০০ টাকা। ১৯৫৮ সালে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান নতুন মাদরাসা ভবন এবং এর হোস্টেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নির্মাণ কাজ ১৯৬০ সালে শেষ হয়েছিল এবং ১৯৬১ সালে মাদরাসাটি তার বর্তমান প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত হয়েছিল।৩৩ আলিয়া মাদরাসাগুলো বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে, যা বিভিন্ন চিন্তাধারাকে নির্দেশ করে। যদিও ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পরিমাণ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, তাদের সম্প্রসারণ এবং উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি তাদের একটি নির্দিষ্ট স্তরের গ্রহণযোগ্যতা এবং তাদের প্রতি চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অনুপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলিয়া মাদরাসার স্নাতক।

বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ারের অধীনে আলিয়া মাদরাসাগুলো সরকারি তত্ত্বাবধান এবং উন্নয়ন উদ্যোগের অধীনে রয়েছে। যদিও শিক্ষার্থীরা মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করে, তারা মূলধারার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তুলনায় গণিত এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষায় কঠিনাইয়ে ভোগে।৩৪

শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় চাহিদা মেটাতে এবং জাতির শিক্ষাগত পরিবেশে যথেষ্ট অবদান রাখতে, বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষার সাথে সমসাময়িক একাডেমিক শাস্ত্রগুলোকে কার্যকরভাবে মিশ্রিত করে। এই ব্যবস্থাটি পদার্থবিদ্যা, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)-এর মতো আধুনিক বিষয়গুলোকে কুরআন, হাদিস, ইসলামী আইন এবং আরবির মতো মৌলিক ধর্মীয় অধ্যয়নের সাথে একত্রিত করে। ধর্মীয় জ্ঞান এবং সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক বোঝার উভয়ই তৈরি করতে, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা, উদাহরণস্বরূপ, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান এবং গণিত অধ্যয়ন করে, কুরআনের অধ্যয়ন এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের পাশাপাশি। এই মাদরাসার শিক্ষাগত স্তরগুলো সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা শিক্ষার্থীদের কারিগরি শাস্ত্র, প্রকৌশল, চিকিৎসা এবং কৃষি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে সক্ষম করে।৩৫ ইসলামী উত্তরাধিকার এবং বিশ্বাস সংরক্ষণ করার পাশাপাশি, এই দ্বৈত পদ্ধতিটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং সামাজিক দায়িত্বকে উৎসাহিত করে শিক্ষার্থীদের পাবলিক এবং প্রাইভেট উভয় খাতের পদের মতো বিভিন্ন কর্মসংস্থানের বিকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং দক্ষতা দিয়ে সজ্জিত করে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড দ্বারা তত্ত্বাবধানে ব্যবস্থাটির আনুষ্ঠানিক প্রবিধান এবং পাঠ্যক্রম উন্নয়ন মানসম্মত শিক্ষা এবং স্বীকৃতি নিশ্চিত করে, এইভাবে দেশের শিক্ষাগত এবং কর্মসংস্থান কাঠামোর মধ্যে মাদরাসার স্নাতকদের একীভূত করে। আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং আধুনিক একাডেমিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে, পুরনো পাঠ্যক্রম এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতার মতো বাধাগুলো সত্ত্বেও আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি সামাজিক সমন্বয় এবং জাতীয় অগ্রগতি প্রচার করে। উভয় ধর্মীয় পণ্ডিত এবং দক্ষ পেশাদার হিসেবে শিক্ষার্থীরা একটি পরিবর্তনশীল সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হয় এই দ্বৈত ফোকাসের কারণে।৩৬ সুতরাং, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সমসাময়িক শিক্ষাগত প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার ফলে এমন সুষম ব্যক্তির জন্ম হয় যারা তাদের ধর্মীয় পরিচয় সংরক্ষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

মাদরাসা-ই-আলিয়া উপমহাদেশের একটি অসাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা জাতীয় এবং বিশ্ব খ্যাতিমান বেশ কয়েকজন ইসলামী পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবী লালন করার জন্য পরিচিত। এর প্রতিষ্ঠার পর থেকে, মাদরাসাটি রক্ষণশীল, পদ্ধতিগত, আধুনিক এবং প্রগতিশীল ইসলামী শিক্ষা এবং মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি যন্ত্রের ভূমিকা পালন করেছে। এর লক্ষ্য হলো পশ্চিমা এবং কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির মাদরাসা এবং তাদের শিক্ষাগত অনুশীলন সম্পর্কে ভুল ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা। তারা বিজ্ঞান-ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় বিষয়গুলোকে একত্রিত করে, এটি একটি ব্যাপক শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা খোঁজা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পছন্দের বিকল্প করে তোলে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড দ্বারা স্বীকৃত আলিয়া মাদরাসাগুলো বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি এবং বাংলা সহ বিস্তৃত পরিসরের শাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত করে একটি নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে। এই মাদরাসাগুলো এমএ পর্যায় পর্যন্ত একটি ব্যাপক শিক্ষা প্রদান করে।

বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থাতে প্রায় ১০,৪৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত দুই মিলিয়নেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে।৩৭ এই শিক্ষা ব্যবস্থাটি দক্ষ স্নাতকদের বিকাশে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। এটি শিক্ষার পাঁচটি স্তর প্রদান করে: ইবতেদায়ী (প্রাথমিক), দাখিল (মাধ্যমিক), আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক), ফাজিল (বি.এ ডিগ্রি/সম্মান) এবং কামিল (মাস্টার্স)। প্রতিটি স্তরে আর্টস, মুজাব্বিদ, বিজ্ঞান এবং বিজনেস স্টাডিজের মতো ক্ষেত্রগুলোতে নির্দিষ্ট অধ্যয়নের ট্র্যাক রয়েছে। ফাজিল দুটি ডিগ্রি প্রোগ্রাম বিকল্প অফার করে: একটি তিন বছরের প্রোগ্রাম এবং একটি চার বছরের ফাজিল-সম্মান প্রোগ্রাম। অন্যদিকে, কামিল (মাস্টার্স) তাফসির, হাদিস, আরবি এবং ফিকহে বিশেষজ্ঞতা প্রদান করে, শিক্ষার্থীদের একটি ব্যাপক শিক্ষাগত পথ প্রদান করে।৩৮

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার কাঠামো

ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ফারসি এবং আরবি ভাষা, ইসলামী আইন এবং বিচার বিভাগের প্রতি নিবেদিত অগ্রগামী ইনস্টিটিউট কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ১৭৮০ সালে ব্রিটিশরা ভারতে প্রতিষ্ঠা করেছিল। সুশিক্ষিত ভারতীয় মুসলমানদের অনুরোধে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যাইহোক, এর প্রাথমিক সাফল্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল, যার ফলে হেস্টিংস রাজা নব কৃষ্ণ দেবের কাছ থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছিলেন।৩৯ এই পদক্ষেপটির উদ্দেশ্য ছিল খরচগুলো উন্মুক্ত হিসাবে স্থানান্তর করার আগে মাদরাসার টেকসইতা নিশ্চিত করা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত, কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ভারতীয় উপমহাদেশে মাদরাসা শিক্ষার একটি পরিচিত কেন্দ্র ছিল। পাকিস্তান এবং ভারত স্বাধীনতা লাভের পর, স্কুলটি ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় এবং এখন সরকারি স্কুল হিসেবে পরিচিত। মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা। মোহসিন ওয়াকফ ফান্ডের সহায়তায়, মাদরাসা ব্যবস্থাটি সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং হুগলি মাদরাসার মতো সংগঠনগুলো কলকাতা আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস ব্যবহার করতে শুরু করেছিল। মাদরাসা শিক্ষার বিকাশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে ১৯০৭-০৮ সালে আর্ল কমিটির সংস্কার প্রস্তাবের মাধ্যমে। ফলস্বরূপ, একটি ১১ বছরের পাঠ্যক্রম তৈরি করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ৩ বছরের টাইটেল কোর্স অন্তর্ভুক্ত ছিল যা কলকাতা আলিয়া মাদরাসার হাদিস এবং তাফসির বিভাগের উপর কেন্দ্র করেছিল।৪০ এই পরিবর্তনটি শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল যাতে দেওবন্দ বা লখনৌয়ের মতো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর প্রয়োজন না হয়। মাদরাসা শিক্ষাগত কাঠামো তিনটি প্রধান স্তর নিয়ে গঠিত, যা সরকার অনুমোদিত আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা তৈরি করে। প্রথম স্তরটি হলো প্রথম শ্রেণি (ইবতেদায়ী), একটি মৌলিক স্তর যা পাঁচ বছর ব্যাপী, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। উচ্চ মাধ্যমিক (দাখিল এবং আলিম): এই পর্যায়টি সাত বছর বিস্তৃত, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। দাখিল (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) এবং আলিম (একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণি) যথাক্রমে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়। উপরের শ্রেণি (ফাজিল এবং কামিল): এই উন্নত পর্যায়টি, যা সম্মান এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অফার করে, প্রতিটি কোর্সের জন্য দুই বছর করে, চার বছরের জন্য সময় নেয়। সরকার এসএসসি, আলিমকে এইচএসসি, ফাজিলকে ডিগ্রি এবং কামিলকে মাস্টার্সের মর্যাদা প্রদান করে বাংলাদেশের একাডেমিক পরিবেশে মাদরাসা শিক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।৪১

আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থার পর্যায় এবং মেয়াদের কাঠামো ৪২

ক্রমিক নং

পর্যায়ের নাম

স্তর

পড়াশোনার মেয়াদ

১ দাখিল (সাধারণ, বিজ্ঞান এবং মুজাওয়্যিদ) মাধ্যমিক ৫ বছর

২ আলিম (সাধারণ, বিজ্ঞান এবং মুজাওয়্যিদ) উচ্চ মাধ্যমিক ২ বছর

৩ ফাজিল বিএ (পাস) বি.এ ডিগ্রি/স্নাতক ৩ বছর

৪ ফাজিল বিএ (সম্মান)

• আল-কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

• আল-হাদিস ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

• ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

• দাওয়াহ ও ইসলামিক স্টাডিজ

• আরবি ভাষা ও সাহিত্য বি.এ ডিগ্রি/স্নাতক ৪ বছর

৫ কামিল এম.এ

• কামিল (হাদিস গ্রুপ)

• কামিল (তাফসির গ্রুপ)

• কামিল (ফিকহ গ্রুপ)

• কামিল (আদব গ্রুপ) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা সমমান ২ বছর

৬ কামিল এম.এ

• আল-কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

• আল-হাদিস ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

• ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

• দাওয়াহ ও ইসলামিক স্টাডিজ

• আরবি ভাষা ও সাহিত্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা সমমান ১ বছর

সাধারণ এবং কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রধান উপাদান। ব্যবস্থাটি দুটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত: আলিয়া মাদরাসা, যা সরকারি প্রশাসনের অধীনে; এবং কওমি মাদরাসা, যা অসরকারি বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত।৪৩ এই মাদরাসাগুলোর উৎপত্তি প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায় যা প্রথমে বাংলায় আবির্ভূত হয়েছিল এবং পরে বাংলাদেশে একটি সংহত ব্যবস্থায় বিকাশ লাভ করেছিল। আইউব (১৯৮৩) যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতি প্রাচীন বাংলার মুসলমানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করত। আলিয়া মাদরাসা, যা “হাই মাদরাসা” নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের একটি সরকার-নিয়ন্ত্রিত মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি কামিল (মাস্টার্স) স্তর পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করে, উভয় ধর্মীয় এবং সমসাময়িক অধ্যয়ন একত্রিত করে। ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রথম সংগঠিত আলিয়া মাদরাসা তৈরি করেছিলেন।৪৪ এই প্রতিষ্ঠানটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে পাবলিক সার্ভিসের জন্য তরুণ মুসলমানদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রেখেছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার পর, কলকাতা আলিয়া মাদরাসার সম্পদ ঢাকায় (বর্তমানে ঢাকা) স্থানান্তরিত হয়েছিল, যেখানে তারা সরকারি গঠন করেছিল। মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা। এটি বাংলাদেশের প্রথম আলিয়া মাদরাসা হয়ে ওঠে।৪৫

বাংলাদেশ আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সমসাময়িক শাস্ত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাঠ্যক্রমটি বাংলা, গণিত, সাধারণ শিক্ষা এবং আরবি, কুরআন, হাদিস, আকাইদ, ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র) এবং তাজবীদের মতো আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো সহ বিভিন্ন কোর্স নিয়ে গঠিত। আলিম স্তরে, শিক্ষার্থীরা সাধারণ, বিজ্ঞান, ব্যবসায়িক শিক্ষা এবং মুজাব্বিদ সহ বিভিন্ন বিষয় গ্রুপ থেকে নির্বাচন করতে পারে। পাঠ্যক্রমটি ইসলামী সাহিত্যের উপর জোর দেয় এবং অন্যান্য ঐচ্ছিক বিষয় অফার করে (বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বিএমইবি))। মাদরাসা এবং কওমি মাদরাসার সহায়তার উৎস আলাদা। আলিয়া মাদরাসা বৃত্তি এবং শিক্ষার্থী ভাতার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পায়, কিন্তু কওমি মাদরাসা একচেটিয়াভাবে দাতব্য অবদান এবং অনুদানের উপর নির্ভর করে। আলিয়া মাদরাসা ভারীভাবে সরকারি অর্থায়নের উপর নির্ভর করে, যা অধ্যাপক এবং প্রশাসকদের বেতন দিতে ব্যবহৃত হয়।৪৬

শিক্ষাদান পদ্ধতি

আলিয়া মাদরাসা একটি শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যবহার করে যা তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক পদ্ধতিকে একত্রিত করে, ধর্মীয় এবং সমসাময়িক শাস্ত্রগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। শিক্ষকরা একটি লেকচার-ভিত্তিক নির্দেশমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করেন, ব্যবহারিক ডেমনস্ট্রেশন, বিতর্ক এবং ল্যাবরেটরি সেশন দ্বারা পরিপূরক। এই কৌশলটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যৌক্তিক যুক্তি এবং সৃজনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।৪৭

শিক্ষক নিয়োগ

আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকদের নির্বাচিত করা হয় সাধারণ এবং কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই ব্যবস্থাটি দুটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত: সরকারি প্রশাসনের অধীনে থাকা আলিয়া মাদরাসা এবং বেসরকারি ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থা দ্বারা পরিচালিত কওমি মাদরাসা।৪৩ এই মাদরাসাগুলোর উৎপত্তি প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে খুঁজে পাওয়া যায়, যা প্রথমে বাংলায় আবির্ভূত হয়েছিল এবং পরে বাংলাদেশে একটি আইনগত বা সংহত ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। আইয়ুব (১৯৮৩) যুক্তি দিয়েছেন যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুপস্থিতি প্রাচীন বাংলার মুসলমানদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করত। আলিয়া মাদরাসা, যা “হাই মাদরাসা” নামেও পরিচিত, বাংলাদেশের একটি সরকার-নিয়ন্ত্রিত মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় এবং সমসাময়িক উভয় বিষয়ের সমন্বয়ে কামিল (মাস্টার্স) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করে। ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রথম সংগঠিত আলিয়া মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।৪৪ এই প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে সরকারি চাকরির জন্য তরুণ মুসলমানদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ত্যাগ করলে, কলকাতা আলিয়া মাদরাসার সম্পদ ঢাকায় (তৎকালীন ডাকা) স্থানান্তর করা হয়, যেখানে এগুলো সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা গঠন করে। এটিই বাংলাদেশের প্রথম আলিয়া মাদরাসায় পরিণত হয়।৪৫

বাংলাদেশ আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রম পরিবর্তিত হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সমসাময়িক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের কোর্স রয়েছে, যার মধ্যে বাংলা, গণিত, সাধারণ শিক্ষা এবং আরবি, কুরআন, হাদিস, আকাইদ, ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) এবং তাজবীদের মতো আধ্যাত্মিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আলিম পর্যায়ে, শিক্ষার্থীরা সাধারণ, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা এবং মুজাব্বিদসহ বিভিন্ন বিষয় গোষ্ঠী থেকে বেছে নিতে পারে। পাঠ্যক্রমটি ইসলামী সাহিত্যের উপর জোর দেয় এবং অন্যান্য ঐচ্ছিক বিষয় অফার করে (বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড-বিএমইবি)। আলিয়া মাদরাসা এবং কওমি মাদরাসার সহায়তার উৎস ভিন্ন। আলিয়া মাদরাসা বৃত্তি এবং শিক্ষার্থী ভাতার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পায়, কিন্তু কওমি মাদরাসা একচেটিয়াভাবে দাতব্য অবদান এবং অনুদানের উপর নির্ভর করে। আলিয়া মাদরাসা ভারীভাবে সরকারি অর্থায়নের উপর নির্ভর করে, যা অধ্যাপক এবং প্রশাসকদের বেতন পরিশোধে ব্যবহৃত হয়।৪৬

শিক্ষাদান পদ্ধতি: আলিয়া মাদরাসা একটি শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যবহার করে যা তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক পদ্ধতির সমন্বয় করে, যেখানে ধর্মীয় এবং সমসাময়িক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। শিক্ষকরা বক্তৃতামূলক নির্দেশনামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যা ব্যবহারিক প্রদর্শন, বিতর্ক এবং ল্যাবরেটরি সেশন দ্বারা পরিপূরক। এই কৌশলটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যৌক্তিক যুক্তি এবং সৃজনশীলতা বিকাশের লক্ষ্য রাখে।৪৭

শিক্ষক নিয়োগ: আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকদের একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়, যা মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) দ্বারা তত্ত্বাবধান করা হয়।৪৮ সম্ভাব্য শিক্ষকদের শিক্ষকতার পদের জন্য যোগ্য হওয়ার জন্য অবশ্যই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।৪৯ সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার কাঠামো সরকারের আর্থিক সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনুসরণের মাধ্যমে ধর্মীয় এবং আধুনিক শিক্ষাকে একত্রিত করে। বাংলাদেশের মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদানে এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষায় সংস্কার উদ্যোগ

মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯১৫ সালে ‘নিউ স্কিম মাদরাসা’ প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কার নিয়ে আসে। এটি ১৮৩৭ সালে ইংরেজিকে ভারতের সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসির স্থান দেওয়ার পর সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদরাসার স্নাতকদের চাহিদা হ্রাস পাওয়ার পরে ঘটেছিল।৫০ নিউ স্কিমের মধ্যে ইংরেজি এবং সীমিত সংখ্যক অন্যান্য সমসাময়িক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মাদরাসার পাঠ্যক্রম সংশোধন করা জড়িত ছিল। পাকিস্তান আমলে, নিউ স্কিম মাদরাসাগুলো হাই স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছিল, যেগুলো সাধারণ শিক্ষার উপর বেশি মনোযোগ দিত এবং এর ধর্মীয় বিষয়বস্তু ছিল নগণ্য। নিউ স্কিমে অংশগ্রহণ না করা মাদরাসাগুলো পরে ‘আলিয়া মাদরাসা’ নামে পরিচিত হয়, যার ভবিষ্যতে আরও সংস্কারের প্রত্যাশা করা হচ্ছিল। ১৯৩৮ সালে, অবিভক্ত বাংলার একজন বিশিষ্ট মুসলিম নেতা এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি মাদরাসা শিক্ষা (মৌলা বখশ) কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে কলকাতায় (বর্তমান কলকাতা) একটি ইসলামী শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির নিউ স্কিম এবং ওল্ড স্কিম উভয় মাদরাসার উপর কর্তৃত্ব থাকত। এছাড়াও, কমিটি একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরির পরামর্শ দিয়েছিল। সর্বপরি, কমিটি প্রাথমিক শিক্ষা আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সাথে মাদরাসাগুলোর ঐতিহ্যবাহী মকতব/ইবতেদায়ী পর্যায়ের শিক্ষাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব করেছিল।৫১

উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা শিক্ষা কমিটি এবং ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত কাজ করা মৌলানা আকরাম খান কমিটির মতো সংস্থাগুলো পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ের উপর মনোযোগ দিয়েছিল।৫২ আতাউর রহমান খান (১৯৫৭), এয়ার মার্শাল এম. নূর খান (১৯৬৯) এবং শামসুল হক (১৯৭০)-এর নেতৃত্বাধীন কমিটিগুলো আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। মাদরাসার পাঠ্যক্রমে ইসলামী শিক্ষা, ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞানের মতো বিষয় প্রবর্তনের মাধ্যমে তারা ইসলামী এবং সাধারণ শিক্ষাকে একত্রিত করার লক্ষ্য রেখেছিলেন।৫৩ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণের জন্য কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়েছিল, ফলে ন্যূনতম পরিবর্তন হয়েছিল। পরিবর্তনের মধ্যে কারিগরি কোর্স, মাদরাসার ডিগ্রির স্বীকৃতি এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় এর সমন্বয়ের পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত ছিল।৫৪

সমসাময়িক সংস্কার উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ২০০৩ সালে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন। এই কমিশনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সাধারণ এবং ইসলামী শিক্ষাকে সমন্বিত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং উচ্চতর মাদরাসা ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেওয়া।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ফাজিল এবং কামিল ডিগ্রিকে বিএ এবং এমএ-এর সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে মাদরাসার স্নাতকদের জন্য চাকরির সুযোগ খোঁজা এবং শিক্ষক কর্মীর মান উন্নয়ন করা সহজ হবে।৫৫

বিশেষ করে আলিয়া মাদরাসাগুলোতে মাদরাসা শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করা বাংলাদেশের পরপর সরকারগুলোর জন্য শীর্ষ অগ্রাধিকার ছিল। আগ্রহী মনোযোগ এবং অসংখ্য পরামর্শ সত্ত্বেও, তাৎপর্যপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়েছে। পাঠ্যক্রম পুনর্গঠনের তুলনায় প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন কম কঠিন কাজ ছিল। তা সত্ত্বেও, কিছু আলিয়া মাদরাসা ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার এবং অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যা তাদের শিক্ষার মান উন্নত করেছে। লিঙ্গ সমতার প্রচারণার ফলে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের উপস্থিতি বেড়েছে।৫৬ তবে, এই উদ্যোগগুলো মহিলা মাদরাসাগুলোতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। শিক্ষাগত বৈষম্য মোকাবেলায় সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক মাদরাসায় পাটিগণিত, ইংরেজি এবং কম্পিউটার শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন প্রদান করেছে। নাগরিক শিক্ষা কর্মসূচিগুলো ব্যক্তিদের মধ্যে গণতান্ত্রিক নীতিগুলোর গভীর উপলব্ধি জাগানোর লক্ষ্য রাখে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং কম্পিউটার দক্ষতার প্রশিক্ষণসহ বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচি এবং বৃত্তি প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আলিয়া মাদরাসাগুলো জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনেও অবদান রাখে।৫৭ বাধা উপেক্ষা করে, বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণ এবং উন্নত করার জন্য ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে আলিয়া মাদরাসাগুলোর সম্মুখীন বাধাসমূহ

বাংলাদেশের শিক্ষাগত কাঠামোর মধ্যে আলিয়া মাদরাসাগুলোর অবস্থান অনন্য, যারা ধর্মীয় শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ের সাথে একীভূত করার চেষ্টা করছে। এগুলো একটি বড় জনসংখ্যাগত গোষ্ঠীর, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার একটি সাশ্রয়ী পথ প্রদান করে। তবে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন কিছু সাংগঠনিক বাধার সম্মুখীন হয় যা তাদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করে।৫৮ জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আলিয়া মাদরাসাগুলোকে আরও কার্যকরভাবে একীভূত করার জন্য এই অসুবিধাগুলো সমাধান করা অপরিহার্য।

শিক্ষা পাঠ্যক্রম এবং মান

একটি প্রধান সমস্যা হলো সকল আলিয়া মাদরাসায় একটি একই পাঠ্যক্রমের অনুপস্থিতি। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড পাঠ্যক্রম তৈরির তত্ত্বাবধান করে, তবে এর বাস্তবায়নে তারতম্য রয়ে গেছে। তদুপরি, ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রায়ই গভীরতার অভাব থাকে, যা উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির বাজারে শিক্ষার্থীদের কম প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে।

অবকাঠামো এবং সম্পদ

অনেক আলিয়া মাদরাসার অপর্যাপ্ত অবকাঠামো রয়েছে, যার মধ্যে অপর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি এবং ল্যাবরেটরি অন্তর্ভুক্ত। সমসাময়িক শিক্ষা সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির অভাব সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রায়শই এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুবিধাদি উন্নত করতে পারে না।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার উন্নয়ন

আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকদের মাঝে মাঝে পেশাদার উন্নয়নের সুযোগ থাকে না। সমসাময়িক শিক্ষাদান কৌশলে অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের কারণে রটনমূলক শিক্ষার উপর নির্ভরতা তৈরি হয়, যা শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সামাজিক ধারণা এবং কলঙ্ক

আলিয়া মাদরাসাগুলো প্রায়ই সামাজিক কলঙ্কের সম্মুখীন হয় এবং প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অধস্তন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধারণাটি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মনোবল কমিয়ে দেয় এবং সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে মাদরাসা শিক্ষার আকর্ষণীয়তা সীমিত করে।

আর্থিক সম্পদ এবং ব্যবস্থাপনা

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আলিয়া মাদরাসা অনুদান এবং সরকারি তহবিলের উপর নির্ভর করে, যা প্রায়ই অপর্যাপ্ত এবং অনিয়মিত হয়। একটি টেকসই অর্থায়ন মডেলের অভাব এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরী দক্ষতা এবং অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।

নীতি এবং প্রশাসন সংক্রান্ত উদ্বেগ

আলিয়া মাদরাসা নিয়ন্ত্রণকারী নীতিগুলোর অস্পষ্টতার কারণে প্রশাসনিক অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। বিভিন্ন সরকারি সত্তার মধ্যে দায়িত্বের ওভারল্যাপিং (একাধিক জায়গায় দায়িত্ব পড়া) নীতি বাস্তবায়ন এবং তত্ত্বাবধানে অসুবিধা তৈরি করে।

উপসংহার

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বলা যায়, বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার উৎপত্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় এবং মক্কায় দারুল আরকাম এবং মদিনায় সুফফা রেসিডেনশিয়াল মাদরাসার মতো প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সাথে যুক্ত। কালের পরিক্রমায়, হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত আলী (রা.)-এর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে, মাদরাসাগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হয়, বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করে। বাংলায় সুলতানি শাসনামলে, মাদরাসা শিক্ষা বিকাশ লাভ করেছিল, যা আরবি এবং দর্শনের মতো বিষয় সম্বলিত একটি ব্যাপক পাঠ্যক্রম প্রদান করত। মোগল আমলে, জ্যোতির্বিদ্যা এবং গণিতের মতো উন্নত কোর্সগুলো সহ একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্প্রসারণ ঘটেছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বখতিয়ার খিলজি দ্বারা বাংলায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা সমসাময়িক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ব্রিটিশ আধিপত্যের আগ পর্যন্ত, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল মুসলমানদের জন্য শিক্ষার প্রধান প্রদানকারী। ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাকে আধুনিক বিষয়ের সাথে একত্রিত করে একটি পাঠ্যক্রমের দিকে একটি পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা এই মডেলের বিকাশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা ধর্মীয় এবং সমসাময়িক উভয় শিক্ষাকে একীভূত করেছে। বর্তমানে, আলিয়া মাদরাসাগুলো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে, স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রদান করছে। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড দ্বারা পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পায় এবং কর্মী নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদদের সমালোচনা সত্ত্বেও, ধর্মনিরপেক্ষ স্কুলগুলোর সাথে একটি দ্বৈত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রদান করে মাদরাসাগুলো অব্যাহতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টা ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সময় পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। ১৯৩৮ সালে মাদরাসা শিক্ষা (মৌলা বখশ) কমিটি কর্তৃক উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান বিকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় ব্যবস্থায় একীভূত করার লক্ষ্য রেখেছিল। পরবর্তী সুপারিশগুলো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা এবং জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে আলিয়া মাদরাসাগুলোর সামগ্রিক মান এবং সমন্বয় উন্নত করার লক্ষ্য রাখে:

প্রথমত, ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাকে একত্রিত করে একটি একই পাঠ্যক্রম তৈরি করা, যাতে শিক্ষার্থীরা একাধিক বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক শিক্ষামানের সাথে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে পাঠ্যক্রমের পদ্ধতিগত মূল্যায়ন এবং সংশোধন করা, এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো আধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা, যেগুলো বর্তমানে অনেক মাদরাসায় ঘাটতিপূর্ণ।

তৃতীয়ত, মাদরাসার অবকাঠামো আপগ্রেড করতে সরকারি এবং বাণিজ্যিক সংস্থা থেকে বর্ধিত আর্থিক সহায়তার অনুপ্রেরণা দেওয়া। এর মধ্যে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ ও অবকাঠামো নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত। মাদরাসাগুলোকে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগের মতো সমসাময়িক শিক্ষা সরঞ্জাম প্রদান করা এবং শিক্ষার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা, যাতে শিক্ষার্থীদের একটি ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা যায়।

চতুর্থত, শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যা সমসাময়িক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের দক্ষতার উপর জোর দেয়, বিশেষ করে বিজ্ঞান এবং গণিতের ক্ষেত্রে, এবং শিক্ষকদের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং পেশাদার বৃদ্ধি উন্নত করতে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা বাড়ানো।

পঞ্চমত, আলিয়া মাদরাসাগুলোর সামাজিক উপকারিতা তুলে ধরার প্রচেষ্টা শুরু করা, সুষম ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার উপর জোর দেওয়া এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে এবং মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কে সামাজিক মতামত পরিবর্তন করতে বিশিষ্ট প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অর্জনকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা।

ষষ্ঠত, দক্ষতা বাড়াতে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যাবলী স্পষ্ট করতে মাদরাসার ভেতরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো পরিমার্জন করা, এবং কর্মক্ষমতা ও শিক্ষামান মেনে চলার ওপর নজরদারি করার পদ্ধতি তৈরি করা, যাতে মাদরাসাগুলো তাদের একাডেমিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।

বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসাগুলো শিক্ষা বিস্তার এবং ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল শিক্ষা পরিবেশে তাদের অব্যাহত বৃদ্ধি এবং প্রাসঙ্গিকতার জন্য তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগ এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রেষ্ঠত্বের কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে, যা সুষম ব্যক্তিত্বের একটি প্রজন্ম তৈরি করবে যারা সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য প্রস্তুত। উপরোক্ত সুপারিশগুলো গ্রহণ করে, আলিয়া মাদরাসাগুলো বর্তমান বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে, শিক্ষাগত ফলাফল উন্নত করতে এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে অধিকতর সমন্বয় অর্জন করতে পারে। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত দক্ষ স্নাতক প্রদান করে শিক্ষার্থী এবং সমাজ উভয়েরই উপকৃত করবে।

গবেষণা ও তথ্যসূত্র সংক্রান্ত নোট:

লেখায় ব্র্যাকেটে দেওয়া নম্বরগুলো মূল ইংরেজি গবেষণাপত্রের তথ্যসূত্র নির্দেশ করছে। ওয়েবসাইটে স্থান সাশ্রয়ের জন্য বিস্তারিত রেফারেন্স তালিকা এখানে প্রকাশ করা হয়নি। তথ্যসূত্রগুলোর বিস্তারিত তালিকা দেখতে অনুগ্রহ করে নিচের লিংকে প্রদত্ত মূল প্রবন্ধটি দেখুন:

http://dx.doi.org/10.20414/ujis.v29i1.1321

লেখক পরিচিতি

১। আব্দুল মোমেন

 জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং ইউটিএম, মালয়েশিয়া থেকে পিএইচডি

২। মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এবং ঢাবি, বাংলাদেশ থেকে পিএইচডি

যোগাযোগের ইমেইল: abdulmomen@ihc.jnu.ac.bd

কপিরাইটঃ কপিরাইট © ২০২৫_উলুমুনা_এই প্রকাশনাটি সিসি বাই-এসএ (CC BY-SA) লাইসেন্সের অধীনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত।

ইলম বা জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নারীদের ভ্রমণ

প্রাচীন এবং পরবর্তী যুগে হজ্জব্রত পালন ছিল আলেমদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। এর একটি দৃষ্টান্ত হলেন মারিয়াম বিনত নূরুদ্দীন আল-হূরিমিয়্যাহ [মৃ. ৮৭১ হি.]। তাঁর মাতামহ তাঁর শিক্ষার বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে যান, সেখানে তিনি ʿআফীফুদ্দীন আন-নাশাওয়ারী, আবুল আব্বাস ইবনে আবদিল মুতী, শিহাবুদ্দীন যাহিরাহ এবং মুহিবুদ্দীন আত-ত্বাবারীর কাছে হাদীস অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি মিসরে গিয়ে তাঁর শিক্ষা অব্যাহত রাখেন।

উচ্চ ইসনাদের (বর্ণনাসূত্রের) জন্য ব্যাপকভাবে কাঙ্ক্ষিত হাদীসের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ শায়খা কারীমাহ আল-মারওয়াজিয়্যাহ [মৃ. ৪৬৩ হি.] জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে সারাখস, ইসফাহান, বাইতুল মুকাদ্দাস এবং পরবর্তীতে মক্কায় ভ্রমণ করেন। ইমাম যাহাবী বলেন: “তাঁর পিতা ছিলেন কুশমীহানের অধিবাসী। অতঃপর তিনি কন্যাকে নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসে যাত্রা করেন এবং পরে তাঁকে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। তিনি আবুল হাইসাম আল-কুশমীয়ানীর কাছে সহীহ আল-বুখারী অধ্যয়ন করেন; এছাড়া তিনি যাহির ইবনে আহমদ আস-সারাখসী এবং আব্দুল্লাহ ইবনে ইউসুফ ইবনে বামুয়াহ আল-আসবাহানীর কাছেও জ্ঞান অর্জন করেন।”

আরেকজন উচ্চ ইসনাদের অধিকারী শায়খা হলেন উম্মু ʿআবদিল কারীম ফাতিমা বিনত সাʿদ আল-খাইর আল-আন্দালুসিয়্যাহ আল-বালানসিয়্যাহ (৫২৫-৬০০ হি.)। মোঙ্গলদের আক্রমণে এই অঞ্চল যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, তার আগে বাগদাদ এবং ইসলামী পূর্বাঞ্চলের জ্ঞানভাণ্ডারকে সুসংহত ও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে তাঁর জীবনের কাজ ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে। ক্রুসেডারদের ধ্বংসযজ্ঞ ও দখলদারিত্বের ফলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য বড় বড় আলেমরা সিরিয়া ও লেভান্ট (শাম অঞ্চল) হয়ে পশ্চিম দিকে মিসর পর্যন্ত ‘জ্ঞান’ পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণকারী।

(তথ্যসূত্র: আল-মুহাদ্দিসাত: দ্য উইমেন স্কলারস ইন ইসলাম, লেখক: মুহাম্মদ আকরাম নদভী, পৃষ্ঠা: ৭৫)

Women Travelling in Pursuit of ʿIlm…

মুসলিম বিশ্বে সংকট

আধুনিকতার অন্তিম পর্যায়ের যেসব পরীক্ষা ও বিপর্যয়, মুসলিম বিশ্বও তার কিছুটা ভাগীদার: জীবনের অর্থ ও দিকনির্দেশনা হারানো, নীরবে অনুপ্রবেশকারী শূন্যতাবাদ বা নৈহিলিজম, মূল্যবোধের সামগ্রীকরণ বা হাতিয়ারে পরিণত করা, রাজনীতির মৃত্যু, সত্যের বহুমুখী দাবির সংঘাত, বাণিজ্যবাদ ও ভোক্তাবাদের প্রলোভন, প্রগতিশীলতাবাদ ইত্যাদি। একশ বছর আগে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সময় এবং মুসলিম উম্মাহর ধারণা যখন তার অর্থ ও প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছিল, তখনও এই কলামের শিরোনামটি অনায়াসে ব্যবহার করা যেত। এরপর থেকে, কিংবা বলা যায় এর আগে থেকেই, সংকট মুসলিম বিশ্বকে আর ছেড়ে যায়নি। জামালুদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আবদুহ, নামিক কামাল, মুহাম্মদ ইকবালসহ আরও অনেক মুসলিম পণ্ডিত, চিন্তাবিদ ও কর্মী বারবার একই সমস্যার কথা উত্থাপন করেছেন। কেন? কারণ সংকটটি বাস্তব, আর এটাকে না থাকার ভান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

কিন্তু এটা কি সব সভ্যতার ক্ষেত্রেই সত্য নয়? বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে স্পেংলারের ‘দ্য ডিক্লাইন অফ দ্য ওয়েস্ট’ (পশ্চিমের পতন)-এর কত রকম ব্যাখ্যা বা রূপভেদ প্রকাশিত হয়েছে? নিটশের বুদ্ধিবৃত্তিক বংশধররা পশ্চিমা সভ্যতার সংকট নিয়ে যন্ত্রণা পেয়েছেন এবং হয়তো এতে এক ধরনের আনন্দও পেয়েছেন। চীনা ও ভারতীয়দের জিজ্ঞেস করলে, তারাও সম্ভবত তাদের সভ্যতার আধুনিক যাত্রাপথ সম্পর্কে অনুরূপ কথাই বলবেন।

সুতরাং, প্রশ্ন এটা নয় যে সংকট আছে কি না, বা কেন সব সময় একটা না একটা সংকট থাকতেই হয়। প্রশ্ন হলো, একটি সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের সংকট অতিক্রম করার জন্য সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া তৈরি করার সামর্থ্য আছে কি না। টয়নবি সভ্যতার স্থিতিস্থাপকতা ও টিকে থাকার প্রকৃত পরীক্ষা হিসেবে ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’ বা ‘আহ্বান ও প্রতিক্রিয়া’ প্রক্রিয়ার যে কথা বলেছিলেন, তা একদম সঠিক। কোনো সংস্কৃতি বা জাতিকে সংকট অতিক্রম করতে সক্ষম করে তোলে তার জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়; বরং আহ্বান ও প্রতিক্রিয়ার চক্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই তাদের সাহায্য করে। এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই তারা সদ্য উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে এবং নতুন শক্তির সঞ্চার করে।

আজ মুসলিম বিশ্বে ঠিক এই সামর্থ্যটিই অনুপস্থিত। শুধু ইসলামের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস থাকাই সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। ফিডেইজম বা ‘কেবল বিশ্বাসই যথেষ্ট’—এই ধারণার বিভিন্ন রূপও কোনো প্রতিকার হতে পারে না। বিশ্বাসীকে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে এবং নিজের পবিত্র গ্রন্থের বাণীকে সময়ের বাস্তবতার সাথে সমন্বয় করে তুলতে হবে। কুরআন পৃথিবীতে মানবজাতির ভাগ্য নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছে এবং ব্যাখ্যা করেছে যে, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আসা পরীক্ষা ও দুঃখকষ্ট মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করতে পারে। ঈমান বা বিশ্বাস হলো জ্ঞান, সাহস ও দৃঢ়তার এক অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু এর কারণে ধর্মতাত্ত্বিক অহংকার বা বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা দেখা দেওয়া উচিত নয়। এমনটি ঘটলে, বিশ্বাস ইহজাগতিক আমাদের সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান দিতে পারে না।

নিজেদের সৃষ্ট সংকটের জন্য অন্যদের দোষারোপ করার প্রবণতার ক্ষেত্রেও একই নীতি খাটে। হ্যাঁ, বাইরে মহাশক্তিগুলোর খেলা অনেক চলছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে ক্রমাগত কারসাজি চলছে, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে অনেক কিছুর জন্য দোষ দেওয়া যায়; এটি ন্যায়বিচার, শান্তি বা সমতা তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এই সত্যটি বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মধ্যে সমাধান নেই, বরং সৃজনশীল ও গঠনমূলক উপায়ে এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করার মধ্যেই সমাধান নিহিত। কেউই মুসলিম দেশগুলোর সমস্যার সমাধান করে দেবে না; তাদের নিজেদের সমস্যার দায়িত্ব নিতে হবে এবং বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে সাধ্যমতো নিজেদের শর্তে উদ্যোগ নিতে হবে।

সিরিয়া ও ইয়েমেন থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে—কয়েকটি সম্মানজনক ব্যতিক্রম ছাড়া—মুসলিম দেশগুলো খেলার নিয়ম নির্ধারণে খুব কমই নেতৃত্ব দেখাতে পেরেছে। নির্ভরশীলতা, বৈধতার সংকট, স্বল্পমেয়াদি চিন্তাভাবনা, হীনম্মন্যতা এবং গভীর চিন্তাধারা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব—এসব বিষয় মুসলিম বিশ্বকে সামগ্রিকভাবে এক নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছে। এখন প্রয়োজন সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজ্ঞা ও সাহসী নেতৃত্ব। আর এর প্রয়োজন কালকের চেয়ে আজই বেশি।

আধুনিকতার অন্তিম পর্যায়ের যেসব পরীক্ষা ও বিপর্যয়, মুসলিম বিশ্বও তার কিছুটা ভাগীদার: জীবনের অর্থ ও দিকনির্দেশনা হারানো, নীরবে অনুপ্রবেশকারী শূন্যতাবাদ বা নৈহিলিজম, মূল্যবোধের সামগ্রীকরণ বা হাতিয়ারে পরিণত করা, রাজনীতির মৃত্যু, সত্যের বহুমুখী দাবির সংঘাত, বাণিজ্যবাদ ও ভোক্তাবাদের প্রলোভন, প্রগতিশীলতাবাদ ইত্যাদি। আমি জানি, অনেকেই মানতে চান না যে এই সমস্যাগুলো মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু এটা আদৌ সত্য নয়। এই সমস্যাগুলো বাস্তবেই রয়েছে, আর এই সহজ সত্যটি স্বীকার করেই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে।

নিজেদের মানবীয়, প্রাকৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে যা করছে, তার চেয়ে অনেক ভালো করতে পারে। মুসলিম জাতিগুলো সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে শান্তি, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং করতেই হবে। তারা সব সময় অন্যদের দোষারোপ না করেই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং করতেই হবে। নৈতিক গতানুগতিকতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা আমাদের এক মিথ্যা আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে, কিন্তু সমস্যা সমাধানে কোনো সাহায্য করতে পারে না। আর বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে পিঠ ফিরিয়ে না নিয়েই এটি করা সম্ভব।

লেখক পরিচিতি: ইব্রাহিম কালিন বর্তমানে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমআইটি)-এর প্রধান। প্রশাসনিক পদের বাইরে তিনি একজন দার্শনিক ও গবেষক। ইসলামী দর্শন, বিশেষত মোল্লা সদরার অস্তিত্ববাদ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক চিন্তাধারার সমালোচনা এবং অস্তিত্বের গভীরতর বিশ্লেষণই তার দার্শনিক লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের সাবেক মুখপাত্র ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

[সূত্রঃ প্রবন্ধটি Daily Sabah পত্রিকায় ২০ অক্টোবর, ২০১৮তারিখে প্রকাশিত]

মূল প্রবন্ধের লিংক-  Crisis in the Muslim World | Daily Sabah

আমরা যা হারিয়েছি: উপনিবেশিত মস্তিষ্ক এবং ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার পতন

ভূমিকা

পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে।

২০০৯ সালে সিএনএনের ‘জেনারেশন ইসলাম’ (Generation Islam) নামক একটি প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তানের ইসলামি শিক্ষা নিয়ে একটি অংশে বলা হয়েছিল: “অনেক মাদরাসা ইসলামের এমন একটি সংস্করণ শেখায় যা অতীতে আটকে আছে। শিক্ষার্থীদের কমই গণিত বা বিজ্ঞান শেখানো হয়…” এরপর প্রামাণ্যচিত্রটি একজন এনজিও কর্মীর প্রশংসা করে তাকে বর্ণনা করে “…পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোকে আধুনিকীকরণের লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী” হিসেবে। মাদরাসাগুলোকে প্রাক-আধুনিক মুসলিম সংস্কৃতির একটি অবশিষ্টাংশ হিসেবে চিত্রিত করা, যা সময়ের সাথে আপডেট হয়নি, বর্তমান বিশ্বের সাথে সংযোগহীন এবং কখনো কখনো আধুনিক বিশ্বের সাথে সংঘাতে লিপ্ত— প্রামাণ্যচিত্রটির এই চিত্রায়ন মিডিয়া আউটলেট, থিংক ট্যাংক, বুদ্ধিবৃত্তিক মহল এবং সরকারি সংস্থাগুলোতে প্রচলিত একটি ব্যাপক প্রচলিত আলোচনার প্রতিফলন ঘটায়, যা মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জগুলোকে “আধুনিকীকরণের” অভাবের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করতে না পারার কারণকে আধুনিকতার দিকে অগ্রসর হতে না পারার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়।

“ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা” এই বর্ণনাটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং একাডেমিকদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে, যারা ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মুসলিম সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতিতে খুবই সীমিত ভূমিকা রাখা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তবে, ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন মাদরাসা) এমন একটি চিত্রায়ন—যেগুলোকে মধ্যযুগের অতীতের পুরোনো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখা হয়—প্রচলিত আলোচনায় এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও, বছরের পর বছর ধরে এই বর্ণনাটি অনেক অন্যান্য ঐতিহাসিক, বুদ্ধিজীবী এবং পণ্ডিতদের দ্বারা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। পূর্ববর্তী গবেষক এবং বুদ্ধিজীবীদের কাজের ওপর ভিত্তি করে, এই প্রবন্ধটি দেখানোর চেষ্টা করবে যে, মুসলিম বিশ্বে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা প্রাচীন মুসলিম সভ্যতার কোনো অবশিষ্টাংশ নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক যুগে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহেরই একটি উপজাত।

মুসলিম বিশ্বে শিক্ষার বর্তমান অবস্থা অতীতের কোনো নিদর্শন নয়, বরং এটি আধুনিক—এই প্রমাণ পেশ করার জন্য, আমি মুসলিম বিশ্বে স্কুলিং বা শিক্ষার দার্শনিক ভিত্তি এবং এই শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর ওপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাব পর্যালোচনা করব। প্রেক্ষাপট হিসেবে বলা যায়, মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন স্কুল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল একটি ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির (worldview) ওপর ভিত্তি করে। আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ), নবুওয়া এবং আখিরাত—এই তিনটি বিষয় ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গড়ে তুলতে এবং টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল। ১৮তম শতাব্দী থেকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার উত্থানের সাথে সাথে, মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা মুসলিম বিশ্বে এমন শিক্ষাতত্ত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেয়, যার ভিত্তি ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্যারাডাইমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই নতুন শিক্ষাতত্ত্ব এবং স্কুলিং ব্যবস্থার সাথে পরিচিত হওয়ার ফলে, মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে পুরনো শিক্ষার ধারণাগুলো সরে যেতে শুরু করে। তবে একটি সমস্যা দেখা দেয়, আর তা হলো—এই নতুন স্কুল ব্যবস্থাগুলো এমন একটি জ্ঞানতত্ত্ব (epistemology) এবং বিশ্বদৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যা ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির জন্য সম্পূর্ণ বিদেশী ছিল, যা পরবর্তীতে মুসলিম বিশ্বে এমন একটি শিক্ষাগত সংকট তৈরি করে যা আজও বিদ্যমান।

এই প্রবন্ধে আমি তিনটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ফোকাস করব:

১) মুসলিম বিশ্বে স্কুলিংয়ের দার্শনিক ভিত্তি;

২) মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাব;

৩) মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা সংস্কারের একটি অনুসন্ধান।

মুসলিম বিশ্বে স্কুলিংয়ের দার্শনিক ভিত্তি

ইকরা! ঐশী নির্দেশ এবং জ্ঞান

ইসলামে শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করার সময় মুসলিম ঐতিহাসিকরা প্রায়ই নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি ওহী হিসেবে কুরআনের প্রথম আয়াতগুলো দিয়ে শুরু করেন। কুরআনে প্রথম যে শব্দটি ওহী হিসেবে নাজিল হয়েছে তা হলো ‘ইকরা!’ (পড়ো) নির্দেশ। পরবর্তী কয়েকটি আয়াত থেকে অনুমান করা যায় যে, ইসলাম তার শুরু থেকেই পড়ার (৯৬:১) ঐশী নির্দেশের মাধ্যমে জ্ঞান অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দিয়েছে; কলম (আল-কালাম)-কে মানুষকে শেখানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে সাক্ষরতাকে উন্নত করার ওপর জোর দিয়েছে (৯৬:৪); ‘আলাক’ (৯৬:২) থেকে মানুষের উৎপত্তির বিষয়টি উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণযোগ্য জগতের অনুসন্ধান করতে বলেছে; এবং অবশেষে, জ্ঞান অর্জনের সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎকার বা চেনার বিষয়টি যুক্ত করেছে (৯৬:১-৫)।

জ্ঞান অর্জনের আহ্বান কুরআন জুড়ে একটি পুনরাবৃত্ত বিষয়। প্রকৃতপক্ষে কুরআনে জ্ঞানের জন্য ব্যবহৃত শব্দ—’ইলম’—এবং এর উদ্ভূত শব্দগুলো কুরআনে ৮০০ বারেরও বেশি ব্যবহৃত হয়েছে এবং ‘আল্লাহ’ শব্দের পর এটি কুরআনে দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ। কুরআনের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত জ্ঞান কেবল এমন কিছু তথ্য বা উপাত্ত নয় যা মানুষ, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকরী হতে পারে; বরং প্রকৃত জ্ঞান তা-ই, যা মানুষকে রূপান্তরিত করে এবং তাদের অস্তিত্বের উৎস ও উদ্দেশ্যের সাথে সংযুক্ত করে এবং তাদের সৃষ্টির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। একটি ইসলামি কাঠামোর মধ্যে, জ্ঞান অর্জনের চেষ্টাকে ঐশী নির্ধারিত নৈতিকতা এবং মানবজীবনের অধীনস্থ অতীন্দ্রিয় বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না। প্রকৃত জ্ঞান অবশ্যই মানুষকে আবার আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনবে।

প্রাতিষ্ঠানিক রূপে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে, আরবি ভাষা এবং মুসলিম সভ্যতায় শিক্ষার জন্য তিনটি পরিভাষা ব্যবহৃত হতো:

১) ‘তালীম’ (ta’lim), যার মূল অর্থ জানা, সচেতন হওয়া, উপলব্ধি করা, শেখা;

২) ‘তারবিয়্যাহ’ (tarbiyya), যার মূল অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, বড় হওয়া, লালন-পালন করা;

৩) ‘তাআদিব’ (taadib), যার মূল অর্থ সংস্কৃতিবান, পরিশীলিত এবং শিষ্টাচারী হওয়া।

এই ধারণাগুলো থেকে, ইসলামি বিশ্বদৃষ্টিতে শিক্ষা প্রক্রিয়ার লক্ষ্যগুলোর অংশ হিসেবে সচেতনতা, প্রবৃদ্ধি এবং পরিশোধনের ধারণাগুলো পাওয়া যায়।

মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ

নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় প্রথম প্রজন্মের মুসলমানদের শিখতে এবং জ্ঞান অন্বেষণ করতে উৎসাহিত করা হতো। জ্ঞান অর্জনের ওপর এত বেশি জোর দেওয়া হতো যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রথম প্রধান যুদ্ধ, বদর যুদ্ধের পর মক্কাবাসীদের পরাজিত হলে, নবী (সা.) কিছু মক্কার যুদ্ধবন্দীর ওপর একটি শর্ত আরোপ করেন যে, তারা ১০ জন শিশুকে পড়তে ও লিখতে শেখাতে পারলে তারা মুক্তি পাবে। প্রথম মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য, শিক্ষাদান এবং শেখা প্রথমে মুসলমানদের ব্যক্তিগত বাড়িতে, যেমন ইবনে আরকামের বাড়িতে শুরু হয়েছিল এবং পরে তা মসজিদগুলোর (মসজিদের বহুবচন ‘মাসাজিদ’) দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেহেতু মসজিদগুলো মুসলিম বিশ্বে শিক্ষাগত উন্নয়নের সূচনা লগ্ন চিহ্নিত করেছিল, শেষ পর্যন্ত আরও জটিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ঘটে। সময়ের সাথে সাথে এবং ধার্মিক ধর্মীয় এনডাউমেন্ট বা ‘ওয়াকফ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে মাদরাসার জন্ম হয়, যা সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ প্রশস্ত করেছিল। ১১তম শতাব্দীর (খ্রিস্টাব্দ) সেলজুক সাম্রাজ্যের ওয়াজির নিযামুল মুলকের অধীনে মাদরাসা ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করে এবং শতাব্দী পরে উসমানীয়দের আগমনের সাথে সাথে এটি আরও সম্প্রসারিত হয়।

স্কুলগুলো মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে প্রচলিত হয়ে ওঠে এবং সাধারণত সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য ছিল। নথিপত্রে দেখা যায় যে, মামলুক শাসনামলে কায়রো এবং দামেস্কে মহিলাদের শিক্ষার জন্য স্কুল ছিল এবং ১৩তম শতাব্দীতে বয়স্ক, বিবাহবিচ্ছিন্ন এবং বিধবা নারীদের জন্যও শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। স্পেনে মুসলিম শাসনের সময়, শুধুমাত্র কর্ডোবায়ই ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং লক্ষ লক্ষ বই সম্বলিত ৭০টি পাবলিক লাইব্রেরি ছিল বলে জানা যায়। ১৪ এবং ১৫ শতাব্দীতে জানা যায় যে, শুধুমাত্র দিল্লিতেই প্রায় এক হাজার মাদরাসা ছিল এবং দাসদের সহ সমাজের সব শ্রেণীর জন্য শিক্ষা অ্যাক্সেসযোগ্য ছিল। মোগল আমলে ভারতের অনেক অমুসলিম মাদরাসা এবং মকতব (maktab, শিশুদের এক ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়, যার বহুবচন ‘মাকাতিব’)-এ ভর্তি হতো। ১৮৫৭ সালে একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা পাঞ্জাব অঞ্চলে মুসলিম-পরিচালিত স্কুলগুলোতে হিন্দুদের উপস্থিতির সংখ্যা দেখে তার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। ১৮তম শতাব্দীতে, কায়রোর মতো জায়গা পরিদর্শনকারী ইউরোপীয় পর্যটকরা জনসংখ্যার বিশাল শতাংশ সাক্ষর দেখে তাদের অবাক হওয়ার কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ১৯ শতাব্দীর শুরুতে আলজেরিয়ায় ফরাসি দখলের সময় ফরাসি গবেষকদের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আলজেরিয়াতে সাক্ষর মানুষের অনুপাত ফ্রান্সের চেয়ে বেশি ছিল। এগুলো মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে প্রচলিত বিশাল স্কুল নেটওয়ার্কের কেবল কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। তবে, প্রশ্ন ওঠে: এই স্কুলগুলোতে ঠিক কী শেখানো হতো?

আল-মাকূল এবং আল-মানকূল: যৌক্তিক এবং প্রাপ্ত (সরবরাহকৃত) জ্ঞান

মুসলিম বিশ্বের মাদরাসা এবং অন্যান্য স্কুলগুলোতে যা শেখানো এবং পড়ানো হতো, তার পাঠ্যক্রম নিয়ে আলোচনা করার সময় এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, পশ্চিমা বিশ্বকে চিহ্নিত করা ধর্ম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যকার বিভাজনের বিপরীতে, ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজ জ্ঞানকে এভাবে বিভক্ত করতো না। মুসলিম সভ্যতায়, ধর্মকে বাস্তবতার একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা হতো, যেখানে যুক্তি এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনাকে পবিত্র জ্ঞানের সাথে একীভূত করা হয়েছিল। মুসলিম বিশ্বের মাদরাসা এবং অন্যান্য স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রম সাধারণত ‘উলূমুল মাকূল’ (যৌক্তিক বিজ্ঞান) এবং ‘উলূমুল মানকূল’ (প্রাপ্ত বিজ্ঞান)—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। আধুনিক যুগে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ অনেক বিষয়—যেমন গণিত, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি—ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজে সাধারণত ‘উলূমুল মাকূল’-এর অধীনে পড়ত। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, যদিও ‘উলূমুল মাকূল’-এর অনেক বিষয়কে (যেমন গণিত, চিকিৎসা ইত্যাদি) সমসাময়িক সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞান হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়, এই বিষয়গুলো মুসলিম বিশ্বে একটি ইসলামি প্যারাডাইমের মধ্যে শেখানো হতো। মুসলিম সমাজ কখনো বিষয়গুলোকে ধর্ম থেকে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি; তাই ‘উলূমুল মাকূল’-কে ধর্মীয় শিক্ষার একটি উপ-শাখা হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং মুসলিম চিন্তাবিদরা বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ধর্মীয় সত্যগুলো অনুসন্ধান এবং আল্লাহর সৃষ্টি চিন্তা করার একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন।

চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা বা অন্যান্য বিজ্ঞানের অধ্যয়নকে ইসলামি প্যারাডাইমের ওপর ভিত্তি করে বলা কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে, তবে এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো বিষয়ই কোনো প্যারাডাইম এবং বিশ্বদৃষ্টির বাইরে শেখানো যায় না। যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়ন ও শেখানো অনেক বিষয়ই সার্বজনীনতা দাবি করে, গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেগুলো বিভিন্ন প্যারাডাইম এবং বিশ্বদৃষ্টির (যেমন- পজিটিভিজম, রিডাকশনিজম, রিলেটিভিজম, হিস্টোরিসিজম ইত্যাদি) ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

মুসলিম সভ্যতার বিকাশের সময় বাস করা বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের জীবন এবং কাজের দিকে একবার চোখ দিলেই অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে যা দেখায় যে, মুসলিম সমাজ কীভাবে ধর্ম, যুক্তি, বিজ্ঞান, নৈতিকতা এবং অতীন্দ্রিয় বিষয়গুলোকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত জ্ঞানের পদ্ধতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

১০ম এবং ১১তম শতাব্দীতে বাস করা বিখ্যাত মুসলিম বহুমুখী প্রতিভা ইবনে সিনা পদার্থ এবং গতির সাথে সম্পর্কিত তাত্ত্বিক দর্শনকে তিন ধরনের বিজ্ঞানে বিভক্ত করেছিলেন: প্রাকৃতিক, গাণিতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক/অতীন্দ্রিয়। তিনি এই বিজ্ঞানগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় হিসেবে দেখেননি; বরং, তিনি এগুলোকে একটি বৃহত্তর জ্ঞানের কাঠামোর মধ্যে বিভক্ত হিসেবে দেখেছিলেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, যদিও ইবনে সিনা বিশ্বাস করতেন যে ধর্মতাত্ত্বিক/অতীন্দ্রিয় বিজ্ঞান সর্বোচ্চ এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সর্বনিম্ন, এটি তার প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রতি অনুসরণে বাধা দেয়নি, তার লেখা চিকিৎসাবিদ্যার বই (কানুন ফিল-তিব্ব)—কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপে চিকিৎসাবিদ্যার একটি প্রমিত পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

ইবনে সিনার ঠিক এক প্রজন্ম পরে বাস করা বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক আল-গাজ্জালি চিকিৎসাবিদ্যা এবং গণিতের অধ্যয়নের প্রশংসা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে একটি সম্প্রদায়ের কিছু লোকের জন্য এই বিজ্ঞানগুলো অধ্যয়ন করা একটি সামষ্টিক বা সাম্প্রদায়িক দায়িত্ব। আল-গাজ্জালির কাছে, সম্প্রদায়ের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো বিষয়ের অধ্যয়ন—যেমন চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, কৃষি ইত্যাদি—ধর্মতাত্ত্বিকভাবে একটি সামষ্টিক ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হতো এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের কমপক্ষে কিছু সদস্যকে এই ধরনের বিজ্ঞানে দক্ষ হতে হতো।

১৪তম শতাব্দীর ঐতিহাসিক এবং সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তার ‘আল মুকাদ্দিমা’য় তার সময়ে মুসলিম বিশ্বে অধ্যয়নরত বিভিন্ন বিজ্ঞান সম্পর্কে লিখেছেন এবং উল্লেখ করেছেন যে, ‘উলূমুল মাকূল’-এর অন্তর্ভুক্ত বিজ্ঞানগুলো ছিল যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, জ্যামিতি, পাটিগণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, বীজগণিত, আলোকবিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ে গণিতের প্রতি বিশেষ সম্মান ছিল এবং ছোট বয়স থেকেই শিশুদের এই বিষয়টি শেখানো হতো। এটিও লক্ষণীয় যে, মুসলিম বিশ্বে অধ্যয়নরত বিভিন্ন বিজ্ঞানের রূপরেখা তৈরি করার পাশাপাশি, ইবনে খালদুন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, সমগ্র মুসলিম সভ্যতাজুড়ে কুরআন শিশুদের শিক্ষায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত। মুসলিম বিশ্বে কুরআনের শিক্ষার কেন্দ্রীয়তা এবং প্রভাবের একটি উদাহরণ দেখা যায় ইংল্যান্ডের রয়াল আফ্রিকান কোম্পানির কর্মচারী ফ্রান্সিস মুরের একটি বিবরণে, যিনি ১৭৩০-এর দশকে উল্লেখ করেছিলেন যে, সেনেগাম্বিয়া অঞ্চলে স্থানীয় জনগণ কুরআনের ভাষা আরবিতে ইউরোপীয়দের লাতিন ভাষার চেয়ে বেশি পণ্ডিত ছিল। ইবনে খালদুনের মুসলিম বিশ্বে শেখানো বিভিন্ন বিষয়ের রূপরেখা, পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় কুরআনের কেন্দ্রীয়তার বিবরণ, দেখায় যে মুসলিম সভ্যতা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং বিজ্ঞান, যুক্তি এবং ওহির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব দেখেনি এবং তারা এমন একটি সভ্যতা গড়ে তুলেছিল যা জ্ঞানকে একটি একীভূত ব্যবস্থায় একত্রিত করেছিল, যা ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় বিভাজনে বিভক্ত ছিল না।

মুসলিম সমাজে যুক্তি, বিজ্ঞান এবং ওহির প্রতি যে সমন্বিত পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল, তা জ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। ৯ম এবং ১২তম শতাব্দীর মধ্যে, আরবি ভাষায় অন্য যেকোনো ভাষার তুলনায় বেশি দার্শনিক, চিকিৎসাবিদ্যাগত, ঐতিহাসিক, জ্যোতির্বিদ্যাগত এবং ভৌগোলিক রচনা লেখা হয়েছিল। আব্বাসীয় শাসনামলে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রায়ই সরকার দ্বারা সমর্থিত ছিল এবং ‘বাইতুল হিকমাহ’ (জ্ঞানের ঘর) ছিল একটি বিখ্যাত মানমন্দির, গবেষণা এবং শিক্ষা কেন্দ্র। সেলজুক যুগে, মাদরাসার পাশে হাসপাতাল এবং জ্যোতির্বিদ্যামূলক মানমন্দির পাওয়া যেত। উসমানীয়দের অধীনে, চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য নিবেদিত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যেমন সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট (১৪৯৪-১৫৬৬) প্রতিষ্ঠিত ‘সুলাইমানিয়ে মেডিকেল মাদরাসা’। মোগল শাসক আকবরের অধীনে, ডিক্রি জারি করা হয়েছিল যে প্রতিটি ছেলেকে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি পাটিগণিত, কৃষি, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা এবং যুক্তিবিদ্যা শিখতে হবে। ‘দারসে নিযামী’, যা ১৮তম শতাব্দীর পণ্ডিত মুল্লা নিজামুদ্দিন সাহলাভি তৈরি করেছিলেন এবং সমসাময়িক সময়ে শত শত মাদরাসা এর সাথে যুক্ত, এর মূল পাঠ্যক্রমে প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসাবিদ্যা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাব

মুসলিম সভ্যতার বিকাশ বিশ্বের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটেনি; বরং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া মুসলিম সভ্যতাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায়, মুসলিম সভ্যতা বিশ্বের বৃহত্তর অংশকেও প্রভাবিত করেছিল। এই প্রভাব ইউরোপে অনুভূত হয়েছিল এবং ঔপনিবেশিকতার আগে ব্যাপক সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় ঘটেছিল। এর একটি উদাহরণ মধ্যযুগের ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশের মধ্যে দেখা যায়, যা মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে মুসলিম স্পেনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। মন্টপেলিয়ে, পাদুয়া এবং পিসার মতো জায়গায় ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল স্কুলগুলো কর্ডোবার মুসলিম মেডিকেল স্কুলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীর গবেষণা এবং লেখা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপে অনুবাদ এবং অধ্যয়ন করা হয়েছিল। ৮ম শতাব্দীর জাবির ইবনে হাইয়ানের রসায়ন বিষয়ক কাজ; ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত লেখা; ১০ম শতাব্দীর আল-জাহরাভির সার্জারি সম্পর্কিত লেখা; এবং ১৩তম শতাব্দীর আল-বাইতারের ফার্মাকোলজি সম্পর্কিত কাজ হলো মুসলিম বিজ্ঞানীদের কাজের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র, যা অনুবাদ করা হয়েছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপে প্রভাবশালী ছিল। তবে, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা পারস্পরিক বিনিময়ের এই পরিবেশকে আধিপত্য এবং চাপিয়ে দেওয়ার পরিবেশে পরিণত করে, যেখানে ঔপনিবেশিকতা মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধান পরিবর্তনের একটি কারণ হয়ে ওঠে।

ঔপনিবেশিকতা এবং এপিস্টেমিসাইড (জ্ঞান-হত্যা)

১৫ শতাব্দীর শেষের দিকে, আল-আন্দালুস/মুসলিম স্পেন ক্যাথলিক রাজতন্ত্রের বিজয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল এবং আল-আন্দালুসের জনসংখ্যার শারীরিক গণহত্যার সাথে সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা, বা যাকে গ্রোসফোগুয়েল ‘এপিস্টেমিসাইড’ বলেছেন, তা ঘটেছিল। মুসলমান এবং ইহুদিদের একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকে হত্যা এবং দমন করার পাশাপাশি, লাইব্রেরিগুলোর ব্যাপক পোড়ানোর কাজ করা হয়েছিল। আল-আন্দালুসে লাইব্রেরিগুলোর এই ব্যাপক অগ্নিসংযোগ ঔপনিবেশিক যুগের রাজনৈতিক বিজয়ের পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদের প্রাথমিক পর্যায়ের ইঙ্গিত দেয়।

পশ্চিম ইউরোপ ধর্মনিরপেক্ষকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এটি অবশেষে একটি বৈশ্বিক সমন্বয়বাদী শক্তিতে পরিণত হয় এবং অগ্রগতির নামে বিশ্বজুড়ে সংস্কৃতি ও সমাজের ওপর তার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য চাপিয়ে দেয়। আলোকজ্জ্বল যুগের (Enlightenment era) মূলে থাকা ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানতত্ত্ব অন্যান্য সংস্কৃতি এবং সমাজের জ্ঞান ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করার একটি চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, যেন রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের পাশাপাশি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদের প্রক্রিয়া চলছিল। আলোকজ্জ্বল যুগে পশ্চিমা বিশ্বে বিজ্ঞান যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষ করা হচ্ছিল এবং বিকাশ করা হচ্ছিল, প্রাকৃতিক দর্শনের সাথে একসাথে, তাকে সার্বজনীন এবং বিশ্ব বিশ্লেষণের একমাত্র বৈধ উপায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পশ্চিমা বিজ্ঞানী ঔপনিবেশিক প্রকল্পের জন্য সামরিক কর্মকর্তার মতোই অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। পশ্চিমা বিশ্ব বিশ্বের অন্যান্য সকল জ্ঞান ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম একটি জ্ঞান ব্যবস্থা তৈরি করেছে—এই দাবিটি বিশ্বের বাকি অংশের বিশাল রাজনৈতিক বিজয় এবং অধীনস্থ করার জন্য ব্যবহৃত ন্যায্যতাগুলোর মধ্যে একটি ছিল। অন্যান্য সংস্কৃতি এবং সমাজ থেকে আসা জ্ঞান উৎপাদন এবং বিজ্ঞানকে যখন পৌরাণিক করা হচ্ছিল, তখন পশ্চিম থেকে আসা বিজ্ঞানকে সার্বজনীন বলা হচ্ছিল; ফলে, বিজ্ঞান বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়। মুসলিম বিশ্বে, বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদ ধীরে ধীরে জ্ঞানের একটি সমন্বিত এবং সামগ্রিক পদ্ধতিকে একটি খণ্ডিত, হ্রাসমূলক (reductionist) এবং ভৌতবাদী ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞান ব্যবস্থা দ্বারা প্রতিস্থাপন করে।

অগ্রগতির আবরণে, ঔপনিবেশিকতা কেবল অন্যান্য সমাজের বিজয়ই ন্যায্যতা দেয়নি, বরং এই হ্রাসমূলক এবং ভৌতবাদী বিজ্ঞান প্রকৃতির শোষণ এবং সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী এবং কবি মুহাম্মদ ইকবাল ইউরোপ দ্বারা উৎপাদিত এবং বিশ্বের বাকি অংশে রপ্তানি করা বিজ্ঞানের বিপর্যয়কর প্রকৃতি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি রূপকের মাধ্যমে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন:

“এটি ঠিক অনেকগুলো শকুনের মতো, যারা প্রকৃতির মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রত্যেকে এর মাংসের একটি টুকরো নিয়ে পালিয়ে যায়। বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রকৃতি একটি অত্যন্ত কৃত্রিম বিষয়, এবং এই কৃত্রিমতা হলো সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ফল, যা বিজ্ঞানকে নির্ভুলতার স্বার্থে প্রকৃতিকে বশীভূত করতে হয়।”

বিজ্ঞান এবং ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের এই উপলব্ধিটি মুসলিম বিশ্বে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে আমদানি করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থাগুলো ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের দ্বারা মুসলিম বিশ্বে স্থাপন করা হয়েছিল এবং একইসাথে এটি এমন মুসলিম রাজনীতিবিদদের দ্বারা গৃহীত হয়েছিল, যারা শিক্ষাকে রাষ্ট্র গঠনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।

ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতি

১৮৩৫ সালে, ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকাউলে সারা ভারতের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করেছিলেন, যাতে ‘আধুনিক বিজ্ঞান’ এবং ইংরেজি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঔপনিবেশিক সরকার ম্যাকাউলের পাঠ্যক্রমকে সমর্থন করেছিল এবং ঔপনিবেশিক যুগের আগে ভারতে প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোতে শেখানো পাঠ্যক্রমকে দুর্বল করার কাজ করেছিল। ১৮৫৭ সালের বিখ্যাত বিদ্রোহের আগ পর্যন্ত এই পাঠ্যক্রম শেখানো হয়েছিল, এরপর শিক্ষাকে ঔপনিবেশিক শাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নতুন নীতিমালা প্রবর্তন করা হয়েছিল।

মিশরে, নেপোলিয়নের অধীনে তিন বছরের দখলের সময়, মিশরীয়দের শিল্প ও বিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলো ফরাসি ভাষায় শেখানোর জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে তাদের ফরাসি পরিচালিত একটি মেডিকেল স্কুলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করা যায়। এছাড়াও মামলুক অভিজাত শ্রেণীর জন্য একটি সামরিক প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যাতে একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী তৈরি করা যায়, যা মিশরে ফরাসি শাসনের প্রক্সি হিসেবে কাজ করবে।

উসমানীয় সাম্রাজ্যে, সাম্রাজ্যের শক্তি হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশ ক্যাপিটুলেশন (capitulations) ব্যবস্থার মাধ্যমে সাম্রাজ্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল।

পশ্চিম আফ্রিকায়, ফরাসি ঔপনিবেশিক সরকার জনসংখ্যার ওপর ইসলামি শিক্ষার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং হ্রাস করতে চেয়েছিল। ১৮৫৭ সাল থেকে, ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রশাসক এবং জেনারেল লুই লিওন সেজার ফাইদারব একটি সিরিজ আইনি ডিক্রি এবং শিক্ষানীতি শুরু করেছিলেন, যা পরবর্তী দশকগুলোতে অন্যান্য ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা অনুসরণ করেছিলেন, যারা সেনেগাম্বিয়া অঞ্চলে ইসলামি শিক্ষাকে সিস্টেম্যাটিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ৯০০ বছর ধরে অঞ্চলটিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী কুরআনের স্কুলগুলোর প্রভাব কমাতে চেয়েছিলেন।

নতুন স্কুল ব্যবস্থা চালু করার এই প্রক্রিয়াটি সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে ঘটেছিল এবং এর তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল ছিল। প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল ছিল এই যে, জাতিরাষ্ট্র গঠন এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা এবং স্কুলিং মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করেছিল। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর প্রবর্তন একটি ধীরগতির প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিল, যা ঔপনিবেশিক যুগের আগে মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলোর স্বায়ত্তশাসন এবং প্রভাবকে দুর্বল করেছিল পাশাপাশি মুসলমানদের দ্বারা উন্নত ঔপনিবেশিক-পূর্ব জ্ঞান ব্যবস্থাগুলোকেও ক্ষুণ্ন করেছিল। অবশেষে, এই স্কুলগুলোর উদ্দেশ্য প্রায়ই ছিল দেশীয় অভিজাতদের নিজেদের দিকে টানা এবং তাদের ঔপনিবেশিক কর্মচারী হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যার ফলে মুসলিম সমাজে একটি নতুন অভিজাত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল যারা ঔপনিবেশিক প্রকল্পের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। এই দিক থেকে, যেখানে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদ থামিয়েছিলেন, সেখানে সংস্কারকরা, যারা প্রায়ই দেশীয় অভিজাত শ্রেণী থেকে আসতেন, আধুনিকীকরণের প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যেতেন।

সংস্কারক, সামরিক বাহিনী এবং আধুনিকীকরণ

উসমানীয় সাম্রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকীকরণের প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ১৭৩৪ সালের দিকে, যখন সুলতান মাহমুদ প্রথম প্রথম আধুনিক সামরিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আসন্ন বছরগুলোতে আরও বেশি স্কুল অনুসরণ করেছিল, যা মূলত একটি আধুনিক সামরিক বাহিনী তৈরি করার ইচ্ছার সাথে যুক্ত ছিল, যা পরে ১৯ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া ‘তানজিমাত’ সংস্কারের অধীনে ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ পায়। উসমানীয় সাম্রাজ্যে শিক্ষায় প্রধান পরিবর্তনগুলো পূর্ণ শক্তিতে আসে যখন ১৭৮৯ সালে সুলতান সেলিম তৃতীয় ‘নিজাম-ই জাদিদ’ প্রোগ্রাম শুরু করেন। অনেকগুলো এই শিক্ষা সংস্কারের বৈশিষ্ট্য—পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ—জামাল উদ্দিন আল-আফগানির মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিল।

পশ্চিম আফ্রিকায়, ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট-লুইসের ‘মাদরসা’ ফরাসি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির একটি প্রচেষ্টা চিহ্নিত করেছিল, যা ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থার উপাদানগুলোকে ইসলামি শিক্ষার সাথে একত্রিত করেছিল। এই ধরনের স্কুলের পেছনের যুক্তি ছিল একটি দেশীয় অভিজাত শ্রেণী তৈরি করা, যারা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ‘লা মিশন সিভিলিসাত্রিস’ (la mission civilisatrice – সভ্যতার অভিযান)-এর প্রক্সি হিসেবে কাজ করবে।

মিশরে, আল-জাবারতি এবং হাসান আল-আত্তারের মতো আজহারি আলেমদের লিখিত নথি দেখায় যে, ফরাসিরা যখন মিশর শাসন করছিল তখন তারা ফরাসিদের সামরিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনের প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে, একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ আলী মিশরের মকতব এবং মাদরাসা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিদ্যমান থাকার জন্য একটি সমান্তরাল সরকার-নিয়ন্ত্রিত স্কুল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে সাহায্য করার জন্য, মুহাম্মদ আলী শিক্ষার্থীদের ইউরোপে, মূলত ফ্রান্সে পাঠিয়েছিলেন এবং ১৮৪৪ সালে তিনি পাঠানো শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রান্সে মিশরীয় মিলিটারি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

মুহাম্মদ আলীর পরে, আরেকজন বিখ্যাত মিশরীয় সংস্কারক আলী মুবারক, ফ্রান্সে ভ্রমণ করে এবং সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা অধ্যয়ন করার পর মিশরের শিক্ষাব্যবস্থাকে রূপান্তর এবং আধুনিকীকরণ করার কাজ করেছিলেন। মুবারক মিশরের দীর্ঘতম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-আজহারের মতো পুরনো স্কুলগুলোর সমালোচনা করে বলেছিলেন: “তারা ইতিহাস, ভূগোল এবং দর্শনের কোনো ধারণা রাখে না,” যা ফ্রান্স থেকে আসা শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাতত্ত্বের সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত নতুন জ্ঞানের ধারণাগুলোর ইঙ্গিত দেয়। মুবারকের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং সমসাময়িক ছিলেন রিফাআ আল-তাহতাভি, যিনিও ফ্রান্সে কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন; তিনি বলেছিলেন যে প্রতিটি গ্রামে একজন সরকারি শিক্ষক থাকা উচিত যিনি গ্রামবাসীদের “সরকারের নীতিগুলো” শেখাবেন, তাদের ‘হুবুল ওয়াতান’ (রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা) শেখাবেন। যে আল-তাহতাভির শিক্ষার ধারণাটি সরাসরি রাষ্ট্র গঠনের সাথে যুক্ত ছিল, তা দেখায় যে পশ্চিমা শিক্ষার মডেলটি মুসলিম সমাজের কিছু অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল; জাতীয় পরিচয় একত্রিত করার জন্য স্কুল ব্যবহারের তার ধারণাটির সাথে ফ্রান্স তখন তার নিজস্ব গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর গৃহীত নীতিগুলোর সাথে লক্ষণীয় মিল রয়েছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে, সৈয়দ আহমাদ খান ১৯ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘মুহাম্মাডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ’ (এমএও) (পরে আলিগড়h বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি তার স্কুলের জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ব্রিটেনের উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থা আহমাদ খানকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি একবার ব্রিটেন সম্পর্কে একজন সহকর্মীকে বলেছিলেন: “আপনি যদি এখানে আসেন… তবে দেখতে পাবেন কীভাবে শিক্ষা পরিচালিত হয়, কীভাবে শিশুদের শেখানো হয়, কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা হয় এবং একটি সম্প্রদায় সম্মান অর্জন করে।” এমএও কলেজের পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রে, এটি ঔপনিবেশিক-পূর্ব মাদরাসাগুলোতে অধ্যয়ন করা দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা ‘মাকূল’-এর উপ-বিভাগটিকে তাদের ইউরোপীয় সমতুল্য দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছিল। এই পদক্ষেপটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল এই কারণে যে, এটি ভারতে মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা করেছিল, যেখানে ইউরোপে উন্নত জ্ঞানের আলোচনাগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল এবং যা ঔপনিবেশিক-পূর্ব জ্ঞানের আলোচনাগুলোকে প্রতিস্থাপন করেছিল। এই ধরনের পদক্ষেপটি এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল যে, ইউরোপে উন্নত বিজ্ঞানগুলো মুসলিম বিশ্ব এবং অন্যান্য সমাজে বিদ্যমান বিজ্ঞানের উপলব্ধির চেয়ে অগ্রসর।

আহমেদ খানের শিক্ষা সংস্কারের সমান্তরালে, ১৮৬৬ সালে, একদল ভারতীয় আলেম ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলূম দেওবন্দের পাঠ্যক্রম মূলত ‘দারসে নিযামী’ পাঠ্যক্রমের একটি সংস্কার করা সংস্করণ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। ‘দারসে নিযামী’ পাঠ্যক্রমটি ১৮ শতাব্দীর পণ্ডিত মুল্লা নিজামুদ্দিন সাহলাভির সময়কার। ‘দারসে নিযামী’-এর বিষয়বস্তু বেশ ব্যাপক ছিল এবং নিজামুদ্দিনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করা যা ‘উলূমুল মানকূল’ এবং ‘উলূমুল মাকূল’ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করবে; প্রকৌশল, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসাবিদ্যা মূল পাঠ্যক্রমের অংশ ছিল। দেওবন্দি সংস্কারে ‘দারসে নিযামী’ পাঠ্যক্রমটি পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোর ‘মাকূল’ বিষয়গুলোর প্রধান অংশগুলো সরিয়ে দিয়েছিল এবং মনোযোগ মূলত ‘উলূমুল মানকূল’-এর দিকে সীমাবদ্ধ করেছিল। দেওবন্দী আন্দোলনের কিছু প্রতিষ্ঠাতার পক্ষ থেকে এর ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল যে, যারা ‘আধুনিক’ শিক্ষা চাইবে তারা মাদরাসা ব্যবস্থার বাইরের স্কুল এবং কলেজে যেতে পারে। এই মনোভাবটি দেখায় যে কীভাবে মুসলমানরা তাদের নিজস্ব ঐক্যবদ্ধ জ্ঞানের ঐতিহ্যকে বিভক্ত করতে শুরু করেছিল এবং ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে আসা ধর্মনিরপেক্ষ ফ্রেম এবং বিষয়গুলোর কাছে জায়গা করে দিয়েছিল। পশ্চিমা জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব আর কেবল ঔপনিবেশিকদের দাবি ছিল না, বরং এটি ঔপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর মনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল।

উসমানীয় সাম্রাজ্য, পশ্চিম আফ্রিকা, মিশর এবং ভারতীয় উপমহাদেশের প্রদত্ত উদাহরণগুলো থেকে দেখা যায় যে ঔপনিবেশিকতা মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথমে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাগুলোর দ্বারা মুসলিম সংস্কৃতির জন্য বিদেশী এমন ধর্মনিরপেক্ষ স্কুলগুলো সরাসরি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা ঔপনিবেশিক-পূর্ব শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছিল। তারপর মুসলিম সংস্কারকরা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ প্যারাডাইমের ওপর ভিত্তি করে স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছিলেন। নতুন স্কুলগুলো মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানের এমন ধারণা এবং জ্ঞানের আলোচনা প্রবর্তন করতে সাহায্য করেছিল, যা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপে উন্নত হয়েছিল এবং যা শেষ পর্যন্ত মুসলিম সমাজে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে উন্নত বৈজ্ঞানিক আলোচনা এবং জ্ঞান ব্যবস্থাগুলোকে দুর্বল করে এবং প্রতিস্থাপন করেছিল। যেহেতু পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ প্যারাডাইমের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন এমন সংস্কারকরা ছিলেন, অন্যদিকে দেওবন্দী আন্দোলনের মতো অন্যান্য প্রভাবশালী মুসলিম সংস্কার আন্দোলনগুলো কেবল ‘উলূমুল মানকূল’-এর ওপর ফোকাস করে একটি সংকীর্ণ পাঠ্যক্রম সহ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাঠ্যক্রমের এই সংকোচন এই গ্রহণযোগ্যতার ইঙ্গিত দেয় যে মাদরাসাগুলোর সমাজে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নে তাদের ঔপনিবেশিক-পূর্ব পূর্বসূরীদের তুলনায় আরও সীমিত ভূমিকা রাখা উচিত।

উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে, শিক্ষা সংস্কার কাঠামো এবং বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ স্কুলগুলোর অনুকরণের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, এবং এর সমান্তরালে সমাজে মাদরাসাগুলোর ভূমিকা সীমিত করা হয়েছিল। এই প্রবণতাগুলো শেষ পর্যন্ত মুসলিম সমাজে একটি শিক্ষাগত সংকটের দিকে নিয়ে গেছে।

মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা সংস্কারের একটি অনুসন্ধান

ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার শতাব্দী পূর্বে লেখা ইবনে খালদুন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, বিজয়ের স্বভাবই হলো বিজিতরা তাদের বিজেতাদের অনুকরণ করে। এটি ঘটে কারণ বিজিতরা হয় বিজেতাদের দ্বারা মুগ্ধ হয় অথবা ভুলভাবে তাদের নিজস্ব অধীনস্থতাকে বিজেতার পূর্ণত্ব বলে মনে করে, তাদের পরাজয়ের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হয়। বিজিত মানুষদের এই রোগ নির্ণয়টি ঠিকভাবেই মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান পরাজিত মানসিকতার বর্ণনা দেয়, যা ঔপনিবেশিকতার কারণে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পর থেকে বিদ্যমান এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে মুসলিম বিশ্বের অনেক উন্নয়নকে চিহ্নিত করা পশ্চিমা বিশ্বের অন্ধ অনুকরণের সাথে অব্যাহত রয়েছে।

সংস্কারক এবং সরকারগুলো দ্বারা পশ্চিম থেকে আসা স্কুল ব্যবস্থাগুলোকে অন্ধভাবে গ্রহণের পেছনের যুক্তি ছিল পশ্চিমের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক শক্তির প্রতি মুগ্ধতা এবং এই আশা ছিল যে ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল আমদানি করলে তা জাতিরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক শক্তি আনবে। এটি ঘটেনি বললেই চলে, বরং এটি বলা অত্যুক্তি হবে না যে, মুসলিম বিশ্বে তৈরি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাটি স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর বিঘ্ন, সংস্কৃতির ক্ষয় এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ব্যবস্থাগুলোর ধ্বংস করেছে। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা আমদানি করার ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আল যিরার দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে:

“ইসলামি সমাজগুলোর দুবিধার একটি অংশ এই যে, তারা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা আমদানি করেছে এবং সেগুলোকে ইসলামি ঐতিহ্যবাহী সমাজের হৃদয়ে রোপণ করেছে। আমার কাছে এটি ঠিক আলাস্কায় একটি খেজুর গাছ লাগিয়ে এর স্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ফল দেওয়া প্রত্যাশা করার মতো। ইসলামি সমাজের ধর্মীয় ভিত্তি এবং পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর মধ্যকার অমিল হলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্মুখীন হওয়া সমস্যাগুলোর একটি প্রধান কারণ।”

পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা এবং মুসলিম সমাজের মধ্যকার এই অমিল প্রায়ই এমন একটি শিক্ষিত শ্রেণীর জন্ম দিয়েছে, যারা তাদের নিজস্ব সমাজ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য থেকে সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে, এরা নব-উপনিবেশিক নীতিগুলোর বাহক হয়ে ওঠে, যারা পশ্চিমাকে অনুকরণ করে এবং বাস্তব, সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য সব কিছুর জন্য পশ্চিমাকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করে তাদের নিজস্ব সমাজকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল। এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঔপনিবেশবাদের প্রসার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে ইসলামকে কেবল তখনই বৈধতা দেওয়া হতো যদি এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গবেষণার পদ্ধতির মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া যায় এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে ইসলামের বৈধতা তখনই ছিল যখন এটি পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের তৈরি করা প্যারাডাইমের নিয়মের সাথে খাপ খায় বলে মনে হতো। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা কেবল ইসলামি বিশ্বদৃষ্টি থেকে আসা জ্ঞানের সামগ্রিক এবং সমন্বিত বোঝাপড়াকেই দুর্বল করেনি, বরং এটি সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে স্কুলের পাঠ্যক্রমে ধর্মকে একটি পৃথক বিষয় হিসেবে স্থান দিয়েছে, একে অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের সাথে সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ইসলামি প্যারাডাইমে, ধর্মকে সমস্ত ধরনের জ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করা হিসেবে দেখা হয়, যা প্রতিটি বিষয় এবং শিক্ষা প্রক্রিয়ার প্রতিটি দিকের জন্য অপরিহার্য। ইসলামি বিশ্বদৃষ্টি থেকে ধর্মের এমন একটি বোঝাপড়া ইকবাল বর্ণনা করেছেন: “ধর্ম কোনো বিভাগীয় বিষয় নয়; এটি কেবল চিন্তা নয়, কেবল অনুভূতি নয়, কেবল কাজ নয়; এটি সম্পূর্ণ মানুষের একটি প্রকাশ।” এছাড়াও, পৃথিবীকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং ধর্মীয়, পবিত্র এবং অপবিত্র—এই দুই ভাগে ভাগ করার ধারণাটি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পশ্চিমা বিশ্বকে চিহ্নিত করেছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা এবং জ্ঞান উৎপাদনের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে, তা ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। ইকবাল কাব্যিকভাবে এই বিষয়টির ইঙ্গিত করেছেন: “পার্থিব বা অপবিত্র জগৎ নামে কোনো কিছু নেই। পদার্থের এই বিশালতা আত্মার আত্ম-সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি করে।”

মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাগত সংকট মোকাবিলার জন্য গুরুতর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এবং বিশ্বজুড়ে একটি সমন্বয়বাদী শক্তি হিসেবে কাজ করা জ্ঞানের ধর্মনিরপেক্ষকরণের বিরুদ্ধে সচেতন প্রচেষ্টা না করা হলে, মুসলিম বিশ্ব কোনো প্রকৃত পদার্থ ছাড়াই তার পূর্বের অবস্থার একটি ছায়া হয়ে থেকে যাবে। পশ্চিমা বিশ্বের অন্ধ অনুকরণ মুসলিম বিশ্বকে তার নিজস্ব বিজ্ঞানের মডেল এবং জ্ঞান ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে বাধা দিয়েছে, যা মুসলিম সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রতিফলিত করে, তাদের সমাজের চাহিদা পূরণ করে এবং একটি ইসলামি বিশ্বদৃষ্টির প্রতি অনুগত। একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল ব্যবস্থা ব্যবহার করে রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্পটি ইসলামি শিক্ষার বিদেশী, কারণ আল্লাহ, নবুওয়ার শিক্ষা এবং পরকালের মাত্রা (আল-আখিরাহ) বোঝার প্রসঙ্গ ছাড়া একটি সত্যিকারের এবং ন্যায়সঙ্গত সমাজ তৈরি করা যায় না। জ্ঞানের একটি ধর্মনিরপেক্ষ বোঝাপড়ার ভুলটি এখান থেকেই আসে যে, মানব “সত্তা” কখনই বাস্তবতা পরিমাপ করার একমাত্র মাধ্যম হতে পারে না। কুরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলো এই বিষয়টি তুলে ধরেছে যে সমস্ত প্রকৃত জ্ঞানের উৎস আল্লাহর কাছ থেকে আসে; তাই, আল্লাহর সাথে সংযোগ না থাকা জ্ঞান অর্জন শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য ক্ষতি এবং পথভ্রষ্টতায় নিয়ে যাবে।

এই প্রেক্ষাপটে, জ্ঞানের পুনরায়-ইসলামীকরণ (re-Islamization) হলো কেবল অনেক শতাব্দী আগে বাস করা মহান মুসলিম চিন্তাবিদদের ঐতিহ্যকে গৌরবান্বিত করার একটি প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি এমন একটি ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের বিকাশ, যা জ্ঞানের একতা তৈরি করে, যেখানে শিক্ষার সকল শাখা আল্লাহর একত্ব (তাওহিদ)-এর মৌলিক বাস্তবতার সাথে পুনরায় সংযুক্ত হয়। ওয়ান মোহাম্মদ নর ওয়ান দাউদ এটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন ওয়ান মোহাম্মদ নর ওয়ান দাউদ জ্ঞানের ইসলামীকরণকে সবচেয়ে ভালোভাবে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: “…মূলত এটি অতীন্দ্রিয় বিশ্বদৃষ্টি, জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো এবং ইসলামের নৈতিক ও আইনি নীতিগুলোর দিকে প্রত্যাবর্তনের একটি প্রক্রিয়া।”

২০ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে, মুসলিম সমাজের চাহিদার প্রতি সহায়ক এবং একটি সত্যিকারের ইসলামি কাঠামোর মধ্যে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। নাকুইব আল-আত্তাস, সয়্যদ হোসেইন নসর, এবং ইসমাইল আল-ফারুকীর মতো বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞান এবং শিক্ষাব্যবস্থার পুনরায়-ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লিখেছেন। ১৯৭৭ সালে, মুসলিম বিশ্বে শিক্ষা ঘিরে সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য মক্কায় প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, এরপর মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অংশে এই বিষয়ে আরও কয়েকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও অনেক আলোচনা হয়েছে এবং তারপর থেকে মালেশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির মতো বেশ কয়েকটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবুও মুসলিম বিশ্বে প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম এমন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আরও অনেক কাজ করতে হবে। কেবল মুসলিম বিশ্বেই নয়, বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিকতার প্রেক্ষাপটে উৎপাদিত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা জ্ঞানের প্রভাব বিশ্লেষণ এবং বোঝার জন্য অনেক প্রজন্মের প্রয়োজন হবে।

উপসংহার

যদিও জ্ঞানের ইসলামীকরণ নিয়ে আলোচনাগুলো জ্ঞান উৎপাদন, শিক্ষা এবং জ্ঞানতত্ত্বে ইসলামের ভূমিকা সম্পর্কে বিতর্ক শুরু করতে সাহায্য করেছে, তবে এই বিষয়ে বর্তমান সাহিত্যের কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য এগুলো সমালোচিতও হয়েছে। এটি লক্ষ্য করা গেছে যে এই সাহিত্যের বেশিরভাগই প্রতিক্রিয়াবাদী ছিল, পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে মতবাদগত আক্রমণের ওপর ফোকাস করেছে, এর বদলে জ্ঞান উৎপাদন এবং শিক্ষার মধ্যে ইসলামীকরণের ধারণাগত কাঠামোগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার বাস্তবসম্মত উপায় প্রদান করেনি।

জ্ঞান, সমাজ এবং ব্যক্তিদের ধর্মনিরপেক্ষকরণ বিশ্বে বিভিন্নভাবে—পরিবেশগত, রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ইত্যাদি—বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করেছে। জ্ঞানের ইসলামীকরণের একটি সফল প্রকল্প আজকের বিশ্বের সম্মুখীন সমস্যাগুলোর সমাধান করবে এবং জ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘপ্রত্যাশিত সামগ্রিক পদ্ধতি ফিরিয়ে আনবে, যা আধ্যাত্মিক বাস্তবতা এবং অতীন্দ্রিয় সত্যগুলোকে এমন জ্ঞানের ক্ষেত্রের সাথে একীভূত করবে যেগুলো থেকে তাদের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ইকবাল এই বিষয়ে প্রারম্ভিক ২০ শতাব্দীতে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা জ্ঞানের ইসলামীকরণের প্রকল্পটিকে সবচেয়ে ভালোভাবে নির্দেশ করে, যদিও তিনি এই পরিভাষাটি প্রচলিত হওয়ার আগেই বেঁচে ছিলেন:

“মানবজাতির আজ তিনটি বিষয় প্রয়োজন—ব্রহ্মাণ্ডের একটি আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা, ব্যক্তির আধ্যাত্মিক মুক্তি, এবং মানব সমাজের বিবর্তনকে একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তিতে পরিচালনা করার জন্য সার্বজনীন গুরুত্বের মৌলিক নীতি।”

ঔপনিবেশিক যুগে ঘটে যাওয়া রূপান্তরগুলোর ওপর আলোকপাত করার মাধ্যমে, এই আশা করা হয় যে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাবিদরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারবেন এবং শিক্ষাক্রমে একটি ইসলামি বিশ্বদৃষ্টি, জ্ঞানতত্ত্ব এবং নৈতিকতা পুনরায় একীভূত করার প্রক্রিয়ায় অবদান রাখবেন। এছাড়াও, এই প্রবন্ধটি মনোবিজ্ঞান, ব্যবসা, শিল্প ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষার্থী এবং বিশেষজ্ঞদের তাদের নিজস্ব শাস্ত্রের ক্ষেত্রগুলো যে প্যারাডাইমের মধ্যে বিদ্যমান সেগুলো পুনর্বিবেচনা করতে এবং তাদের নিজস্ব জ্ঞানের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি ইসলামি স্পিরিট বা চেতনা একীভূত করতে অনুপ্রাণিত করবে বলেও আশা করা হয়। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদেরকে এমন জ্ঞানের দিকে পথ প্রদর্শন করুন যা আমাদের তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনে এবং যা আমাদের ইনশাআল্লাহ এই জীবনে এবং পরকালে আমাদের আত্মার কল্যাণ সাধন করতে সাহায্য করে।

গবেষণা ও তথ্যসূত্র সংক্রান্ত নোট:

লেখায় ব্র্যাকেটে দেওয়া নম্বরগুলো (যেমন: [৮৬], [৮৭]) মূল ইংরেজি গবেষণাপত্রের তথ্যসূত্র নির্দেশ করছে। ওয়েবসাইটে স্থান সাশ্রয়ের জন্য বিস্তারিত রেফারেন্স তালিকা এখানে প্রকাশ করা হয়নি। তথ্যসূত্রগুলোর বিস্তারিত তালিকা দেখতে অনুগ্রহ করে নিচের লিংকে প্রদত্ত মূল প্রবন্ধটি দেখুন:

[All That We Lost: The Colonized Mind and the Decline of the Islamic Education System]

লেখক পরিচিতি

ফাইসাল মালিক কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মে স্নাতক (বিএ) এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট/মধ্যপ্রাচ্যের সভ্যতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সম্মেলনে ঔপনিবেশিকতা ও শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। বর্তমানে তিনি আইসিএনএ রিলিফ কানাডার (ICNA Relief Canada) মার্কেটিং ও প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছেন।

কপিরাইট © ২০১৯। ইয়াকীন ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক রিসার্চ (Yaqeen Institute for Islamic Research)

জ্ঞান-সাধক (অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম স্মরণে)


বুকের ভেতর আস্ত একটা আকাশ রেখে
হেঁটে গেছেন অবলীলায় তিনি সংকীর্ণ সব অলি-গলি
কেউ তাঁকে থামাতে পারেনি তাঁর গন্তব্য থেকে
রাস্তার কুকুর, বিষধর সাপের ফনা এবং হায়নার চিৎকার! কেউ না…

তিনি হেঁটে গেছেন বিস্তির্ন জনপদ
আর মুমুর্ষ জ্ঞান-বৃক্ষের শেকড়ে ঢেলে দিলেন সঞ্জীবনী জল
অনুর্বর পরিত্যাক্ত জমিতে বুনে দিলেন ইলেমের বীজ
সেইসব চারা থেকে বেরিয়ে এলো যেন আল্লাহর পবিত্র নুরের ছটা
যা ছড়িয়ে গেল পৃথিবীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত!

কখনও তাঁকে মনেহত তিনি শাহ জালালদের উত্তরসূরী
কখনও জ্ঞান-সাধক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী
কখনও তিনি আল্লাহর পয়গম্বরদের একনিষ্ঠ অনুসারী
যাদের পদচারনায় ভেঙ্গে যায় পৌত্তলিকতার মুর্তি
এবং জাহেলিয়াতের পর্দা ছিঁড়ে নেমে আসে ঐশী আলো
যা কিনা অন্ধকার সমাজকে করে দেয় সুনসান পবিত্র এবং জমকালো।

কোন প্রসংশা ও স্তুতি গাঁথার অপেক্ষা ছিল না তাঁর
দুনিয়ার তুচ্ছ স্বীকৃতির দিকে তাকাবার সময় ছিল না
বৈষয়িক প্রাচুর্য্যের লোভ তিনি অগ্রাহ্য করে গেছেন তর্জনী উঁচিয়ে
তাঁর এই সাহসের মহীরুহ এত সুবিশাল যে, তা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়
খোলাফায়ে রাশেদার সোনালী মানুষদের পদচিহ্ন!

তিনি বহুকাল জ্ঞান-বৃক্ষের নিচে ধ্যানমগ্ন ছিলেন
কতটা বিস্তৃত হলো বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা?
কতটা গভীর হলো শেকড়ের কান্ড? এসব ভাবতে-ভাবতে
একদিন আল্লাহ’ র কাছে চলে গেলেন তিনি!
রূহের জগতে বসে মনে হয় এখনও তাকিয়ে আছেন
তাঁর রেখে যাওয়া বৃক্ষগুলোর দিকে
বৃক্ষের নিচে দাঁড়ালেই টের পাওয়া যায় তাঁর অবিশ্রান্ত উপস্থিতি!

আবৃত্তিঃ https://youtu.be/tT1NPS72B3M?si=SHM9zZ3ZtzLD7VQC

মরহুম হযরত মাওলানা আবুল হাশেম হুজুরের সাথে স্মৃতিময় দিনগুলো

ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নরসিংদী জামেয়া কাসেমিয়া ১৯৭৯ সালের জুন/জুলাইয়ে তারিখটি ঠিক মনে পড়ছে না। আমি ও মহিবুল ইসলাম আমার সিনিয়র এক ভাইকে নিয়ে জামেয়ায় ভর্তির উদ্দেশ্যে যাই। অফিস কক্ষে তখন জামেয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল মরহুম হযরত মাওলানা হাফেজ ফয়জুল্লাহ (রহ.) যাকে আমরা বড় হুজুর বলে ডাকতাম, তিনি আমার ইন্টারভিউ নিয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করলেন পাশাপাশি হোস্টেলে থাকার জন্য তৎকালীন সময়ের হোস্টেল ও ডাইনিং সুপার মরহুম হযরত মাওলানা আবুল হাশেম যাকে আমরা ‘‘হাজী হুজুর’’ হিসেবে চিনতাম তাকে তিনি বললেন এই ছেলেটিকে হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন।

তিনি সেই পরম শ্রদ্ধাভাজন আমার প্রিয় শিক্ষক যাকে নিয়ে আজকের স্মৃতি চারণ আমি দীর্ঘ সময়ে উনার সান্নিধ্যে ছিলাম। যিনি ছিলেন জামেয়ার অধ্যক্ষ সাইয়েদ কামাল উদ্দিন জাফরী (দাঃ), হুজুরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন ব্যক্তি। জামেয়াকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে আসার পিছনে শুরু থেকে যে কয়জন মহৎ ব্যক্তি কারিগরের ভূমিকা পালন করেছেন, যারা বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সার্বক্ষণিক অধ্যক্ষ মহোদয়ের পাশে ছিলেন তিনি (হাজী হুজুর) হলেন সকলের অন্যতম। সদা হাস্যোজ্জ্বল ছাত্র বান্ধব অমায়িক ও বিনয়ী স্বভাবের প্রজ্ঞাবান এই হুজুর আমাদেরকে ক্লাসে নাহু ছরফ, অত্যন্ত যত্ন সহকারে পড়াতেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত অতি মনোযোগের সাথে উনার ক্লাস শুনতাম।

হোস্টেল পরিচালনায় উনার দক্ষতা, দূরদর্শিতা চোখে পড়ার মত। হোস্টেলের ছাত্রদেরকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনায় তিনি ছিলেন খুবই দক্ষ, অভিজ্ঞ। সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ছাত্রদের পছন্দকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। হোস্টেলে ছাত্রদের পড়াশোনার পরিবেশ ও পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতা প্রতি তিনি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন।

ডাইনিং পরিচালনায়ও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। খাবারের মান ও গুণাগুণ রক্ষায় তিনি ছিলেন খুবই যত্নশীল। এক্ষেত্রে বাবুর্চিদের প্রতি তিনি সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন, যাতে কোন অবস্থায় খাবারের মান খারাপ হয়ে না যায়। খাবার রুচিশীল ও পছন্দনীয় করার জন্য ছাত্রদের মধ্য থেকে তিনি একটি অভিনব ও কার্যকরী কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন, যাতে করে তারা প্রতিদিনকার খাবারের মেন্যু ঠিক করে দিতে পারে।

এই ক্ষুদ্র পরিসরে হুজুরের প্রশংসনীয় কীর্তিগুলো তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমি পরিশেষে হুজুরের জন্য মহান মাবুদের কাছে কায়ো মনো বাক্যে এই প্রার্থনা করি তিনি যেন আমার প্রিয় হুজুরের ভাল কর্মগুলোর সঠিক জাযা প্রদান করেন। জীবনের যাবতীয় ত্রুটি, বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।

আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর স্মরণে

بِسْمِ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللهِ

কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের শিক্ষা, ভালোবাসা, আদর্শ ও স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকে। আমার জীবনের এমনই একজন মহান ব্যক্তি ছিলেন আমার প্রিয় উস্তায, শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)।

শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তাঁর স্নেহ ও দিকনির্দেশনা লাভ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি ফেনী ফালাহীয়া মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণি থেকে দাখিল পর্যন্ত পড়াশোনা করি। এরপর যখন জামিয়া কাসেমিয়াতে আলেম পড়তে যাই, তখন সেখানেও আমার প্রিয় উস্তাযের ব্যাপক সুনাম শুনতে পাই। সেখানে তিনি সকলের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে “হাজী হুজুর” নামে পরিচিত ছিলেন।

জামিয়া কাসেমিয়াতেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। ইলমে দ্বীনের প্রসার, ছাত্রদের গঠন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ইলম, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও দ্বীনের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে সকলের কাছে সম্মানিত করে তুলেছিল।

আমার প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল একজন পিতার মতো। তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং সবসময় পড়াশোনার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। ইলম অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর উৎসাহ ও নসিহত আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর স্নেহময় আচরণ ও ভালোবাসার কথা কখনো ভোলার নয়।

মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক নিয়োগের সময় তিনি আমাদের ক্লাসকে প্র্যাকটিক্যাল ইন্টারভিউর জন্য প্রাধান্য দিতেন। বিশেষ করে আমাকে এবং আমাদের সহপাঠীদের বিভিন্ন প্রশ্ন করতে বলতেন। আর তিনি ক্লাসের পেছনে বসে সব পর্যবেক্ষণ করতেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞান যাচাই করতেন, চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করতেন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের মতো তিনি ছাত্রদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতেন এবং নতুন শিক্ষকের যোগ্যতা দেখতেন। এটি ছিল তাঁর ইউনিক আইডিয়া, যা বর্তমান বিশ্বে এ ধরনের সেটিংসে প্রয়োগ করা হয়।

শিক্ষা সফরের এক অমলিন স্মৃতি

আমার জীবনের একটি বিশেষ স্মৃতি হলো একটি শিক্ষা সফরের ঘটনা। তখন আমি বয়সে অনেক ছোট ছিলাম। সফরটি অনেক দূরের হওয়ায় আমার আব্বু প্রথমে রাজি হননি। তাঁর স্বাভাবিক চিন্তা ছিল—এত অল্প বয়সে আমি কীভাবে এত দূরের সফরে যাব, কীভাবে থাকব।

তখন আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ) আব্বুকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখাশোনা করবেন এবং সবসময় তাঁর সঙ্গে রাখবেন। উস্তাযের সেই আশ্বাসে আব্বু রাজি হয়েছিলেন।

সফরের পুরো সময়জুড়ে তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। তিনি আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে আলাদা করেননি। এমনকি বাসেও তাঁর নিজের সিটের পাশের সিটে আমাকে বসিয়েছিলেন, যাতে আমার কোনো অসুবিধা না হয় এবং তিনি সবসময় আমার খেয়াল রাখতে পারেন।

একজন বড় আলেম ও অধ্যক্ষ হয়েও একজন ছোট ছাত্রের প্রতি তাঁর এই স্নেহ, মায়া-মমতা ও দায়িত্ববোধ ছিল সত্যিই বিরল। তাঁর সেই ভালোবাসা ও অভিভাবকসুলভ আচরণের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে অঙ্কিত হয়ে আছে। একজন উস্তায কীভাবে ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে পারেন, তিনি ছিলেন তার জীবন্ত উদাহরণ।

আমার শ্রদ্ধেয় আব্বুর সঙ্গেও তাঁর ছিল অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক। তাঁদের মধ্যে ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও দ্বীনি বন্ধনের এক সুন্দর উদাহরণ। তাঁদের সম্পর্ক আমাদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আমার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত হলো—যখন আমি মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে অনার্স সম্পন্ন করার পর ২০০৫ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (IIUM)-তে মাস্টার্স পড়ার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই সময় আমি আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে দেখা করতে যাই।

সেদিনের স্মৃতি আমার জীবনে কখনো ভোলার নয়। আমাকে দেখে তিনি যে আনন্দ ও আবেগ প্রকাশ করেছিলেন, তা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। তিনি আমাকে স্নেহভরে জড়িয়ে ধরেছিলেন এবং তাঁর চোখেমুখে যে খুশি ও গর্বের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছিল, তা ছিল একজন পিতার মতো। মনে হচ্ছিল, আমার এই অর্জন যেন তাঁর নিজেরই অর্জন, আমার সফলতাই যেন তাঁর গৌরব।

একজন প্রকৃত শিক্ষকের হৃদয় এমনই হয়—ছাত্রের সফলতায় তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান। আমার প্রতি তাঁর সেই ভালোবাসা, দোয়া ও গর্বের অনুভূতি আমার জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে।

এরপর যখনই আমি ফেনীতে আসতাম, আমার প্রিয় উস্তাযের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছিল আমার জন্য এক বিশেষ আনন্দ ও প্রশান্তির বিষয়। তিনি সবসময় অত্যন্ত আন্তরিকতা ও স্নেহের সঙ্গে আমার খোঁজখবর নিতেন।

বিশেষ করে তিনি তাঁর প্রিয় সন্তান নোমানের বিষয়ে আমার সঙ্গে বিভিন্ন কথা বলতেন। একজন অভিভাবকের মতো তিনি তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর কথাবার্তার মধ্যে যেমন ছিল একজন পিতার ভালোবাসা, তেমনি ছিল আমার প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ও আপন ভাব।

তাঁর সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল আমার জন্য শিক্ষা, ভালোবাসা ও স্মৃতির এক অমূল্য অধ্যায়। আজ সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে হৃদয় আবেগে ভরে ওঠে।

এতিম ও অসহায় ছাত্রদের প্রতি তাঁর মমতা

ফেনী ফালাহীয়া মাদ্রাসার এতিমখানার জন্য অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অবদান কারও অজানা নয়। এতিম ও অসহায় ছাত্রদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর দরদ ও মমতা। তিনি শুধু একজন প্রশাসক বা শিক্ষক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন অসহায় ছাত্রদের একজন অভিভাবক।

গরিব ও অসচ্ছল ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি সবসময় আন্তরিক ছিলেন। কোনো দরিদ্র ছাত্রের ফি মওকুফ বা আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হলে কেউ তাঁর কাছে গিয়েছেন অথচ কোনো না কোনো সমাধান পাননি—এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।

তাঁর এই দয়া, উদারতা ও ছাত্রপ্রেমই প্রমাণ করে যে তিনি শুধু ইলমের শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মমতাময় অভিভাবক, যিনি মানুষের প্রয়োজনকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন।

তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ইলমে দ্বীনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করেননি; বরং তাঁর চরিত্র, আখলাক ও আমলের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে একজন প্রকৃত আলেম ও আদর্শ মানুষ হতে হয়।

তাঁর সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপন

অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবনের আরেকটি অনুকরণীয় দিক ছিল তাঁর অত্যন্ত সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপন। একজন বড় আলেম, সম্মানিত অধ্যক্ষ ও অসংখ্য ছাত্রের উস্তায হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার বা জাঁকজমকের ভাব ছিল না।

তিনি অত্যন্ত সাধারণভাবে জীবন পরিচালনা করতেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ছিল বিনয় ও সরলতার প্রকাশ। তিনি ইলম, আমল ও উত্তম চরিত্রকে জীবনের মূল সৌন্দর্য মনে করতেন।

তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন এবং দ্বীন, শিক্ষা, সমাজসেবা ও বিভিন্ন সম্মানজনক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাতে গড়া এসব ছাত্রই তাঁর জীবনের বড় সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করছে। একজন শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর ছাত্রদের মাঝেই বেঁচে থাকে।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর নসিহত, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ আমাদের মাঝে চিরজীবী থাকবে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর ইলমের আলো বহু প্রজন্মকে আলোকিত করবে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলার দরবারে আমাদের বিনীত দোয়া—

হে আল্লাহ! আমাদের প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন। তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন। তাঁর সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন। তাঁর ইলম, শিক্ষা ও আদর্শকে তাঁর জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।

হে আল্লাহ! তাঁর পরিবার, ছাত্র ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীকে সবরে জামিল দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁর দেখানো ইলম ও আমলের পথে চলার তাওফিক দান করুন।

آمين يا رب العالمين

وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

শিক্ষাগুরু

(উৎসর্গ: শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাগুরু প্রিন্সিপাল আবুল হাশেম, মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন!)

কুরআন, হাদিস, গ্রন্থ, মানুষ-সবার কাছে শিখি,
দেখি, শুনি, পড়ি এবং মনের খাতায় লিখি।
রাসুল, নবি, মনীষীরা জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে-
বলে গেছেন, সফল হবো আলোর পথে গেলে।

ফুল আমাদের সুবাস বিলায়, পাখি শোনায় গান,
নিরবধি চলতে শেখায় নদীর কলতান।
পাহাড় দেখে তাহার মতো উঁচু করে শির-
সাহস পেলাম বুক চিতিয়ে হতে দ্রোহী-বীর।

ঝরনা, সাগর, সুনীলাকাশ, তারার ঝিকিমিকি,
তাদের বিশালতা দেখে উদার হতে শিখি।
সূর্য ছড়ায় আলোর জরি, জোছনা বিলায় চাঁদ,
বিকশিত মানুষ হতে মনে জাগায় সাধ!

মা-বাবা আর সমাজ কত শেখায় আচার-বিচার,
মানুষ হবার দীক্ষা দিলেন শিক্ষাগুরু-সুচার!
মানুষ হবার দীক্ষা দিলেন শিক্ষাগুরু-সুচার!

চায়নি গুরুদক্ষিণা কেউ দ্রোণাচার্যের মতো,
একলব্যের পরিণতি নইলে মানতে হতো।
যারা আমার শিক্ষাগুরু সবাই আমার প্রিয়,
তাঁদের পরম শ্রদ্ধা এবং সালাম পৌঁছে দিয়ো।

মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ)-এর সঙ্গে কিছু স্মৃতিকথা

মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবের ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভক্ত, ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ জীবনকে সংরক্ষণ ও অনুসরণের লক্ষ্যে “অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশন“ গঠন করেছেন। এটি সময়োপযোগী ও যথাযথ উদ্যোগ। তাদের এই উদ্যোগের জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও মুবারকবাদ জানাচ্ছি।

পত্রিকার মাধ্যমে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জেনে আমি ভেবেছি, মরহুমের জীবনের ওপর দুই-চারটি কথা লিখতে পারলে নবীন শিক্ষার্থীদের জীবনও অনুপ্রাণিত হবে। তাই আমি আমার দুর্বলতা সত্ত্বেও এই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছি মাত্র।

মরহুম মাওলানার সঙ্গে আমার পরিচয় আনুমানিক ৪০ বছর পূর্বে, যখন আমি দাখিলের ছাত্র ছিলাম। আমার সম্মানিত উস্তাদ মরহুম মাওলানা নুরুল আমিন সাহেব (সোনাগাজী সিনিয়র মাদ্রাসার মঈন সাহেব হুজুর)-এর দ্বিতীয় জামাতা হিসেবে তাঁর নামের সঙ্গে আমি পরিচিত হই। গভীরভাবে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় ১৯৮১ সালে।

সমগ্র বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার নির্বাচিত প্রায় ২৫০ জন আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষককে নিয়ে ৪৫ দিনের আধুনিক আরবি ভাষা শিক্ষাদান-পদ্ধতির ওপর আন্তর্জাতিক মানের একটি ট্রেনিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি। ট্রেনিংটি পরিচালনা করেন মক্কা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ও জেদ্দার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকদের যৌথ উদ্যোগে আগত প্রশিক্ষকবৃন্দ।

৯০-এর দশকে বাংলাদেশে আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান সমভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে—একটি তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা এবং অন্যটি জামেয়ায়ে কাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসা, নরসিংদী।

মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার সিনিয়র শিক্ষক এবং হোস্টেল সুপার। আমি বিভিন্ন সময় আমার অভিভাবকত্বের সুবাদে জামেয়ায়ে কাসেমিয়ায় গিয়ে তাঁর দায়িত্বে ছাত্রদের ভর্তি করিয়ে দিতাম। এভাবে আমাদের যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার অবস্থান, পরিবেশ, শিক্ষার মান, শিক্ষাদান-পদ্ধতি ও হোস্টেল পরিচালনা দেখে আমি আকৃষ্ট হই এবং ফেনীতে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকি। ১৯৮২-৮৩ সালে ফেনী মডেল মাদ্রাসার নাম পরিবর্তন করে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া নামকরণ করা হয়। মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে ফালাহিয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে ফেনীতে নিয়ে আসতে রাজি করানো হয়।

প্রতিষ্ঠান গড়ার নেশা এবং নিজ এলাকার প্রতি ভালোবাসার টানে তিনি ফেনীতে চলে আসেন।

মরহুম আবুল হাশেম সাহেব যোগদান করার পর আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়ার অগ্রযাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমি তাঁকে যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি, সেই ৩০-৪০ বছরের মধ্যে এক মাসের ট্রেনিং, একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা এবং একসঙ্গে সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে তাঁর যে বিস্তৃত কর্মজীবন দেখেছি, তার বিস্তারিত বিবরণ এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

তাই নবীন পাঠকদের অবগতি ও অনুপ্রেরণা দানের উদ্দেশ্যে আমি শুধু তাঁর কয়েকটি মৌলিক গুণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব।

১। বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন

একজন আলেমে দ্বীনের কার্যাবলি ও তৎপরতার ওপর ইসলামের মৌলিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যোগ্য ও বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনকে অনুসরণ করে সাধারণ মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রত্যেক স্তরে একজন বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন হিসেবে আমি দেখেছি। শুধু তাই নয়, তিনি আলেম সমাজের জন্যও একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ইসলামপ্রিয় মানুষ অবশ্যই তাঁর এই চরিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হবেন এবং তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করবেন। কারণ সমাজে আলেমের অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত আলেমে দ্বীন অত্যন্ত বিরল।

২। আদর্শ শিক্ষক

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর বাধ্যতামূলক। জ্ঞানই হচ্ছে প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা। উপরোক্ত হাদিস ও চিরন্তন বাণীগুলো জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। সুতরাং এসব আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সমাজে আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজন। যদিও শিক্ষকতার পেশায় অনেককেই পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখার মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম।

একজন শিক্ষক তাঁর মেধা, চরিত্র, যোগ্যতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে জাতির সন্তানদের আপন সন্তানের মতো গড়ে তোলেন এবং তাদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিক্ষকতা পেশায় তেমনি এক আদর্শ শিক্ষকের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম। তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এই সত্যেরই উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।

একজন আদর্শ শিক্ষকের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, তার সবই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তাই তো তিনি ছিলেন শত শত শিক্ষকেরও শিক্ষক। তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

৩। মানুষ গড়ার কারখানা

কারখানার ধর্মই হচ্ছে উৎপাদন করা বা বৃদ্ধি করা। শিক্ষা জীবনে বা বাস্তব জীবনে সামান্যতম দুর্বলতা বা অবহেলার কারণে অগণিত বনী আদম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুর্বিষহ ও অবহেলিত জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে, যথাযথ নির্দেশনা পেয়ে এবং সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্তর অতিক্রম করেছে। তাদের মধ্যে আদর্শ মানুষ, মহামানব, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন বিভাগের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন।

শুধু বাংলাদেশের সর্বত্রই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর হাতে গড়া মানুষগুলো সমাজের নেতৃত্ব দান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তেমনি এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব। তিনি হাজার হাজার মানুষ তৈরি করেছেন। সত্যিই তাঁকে মানুষ গড়ার কারখানা বলাটাই যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই মহান দায়িত্ব পালন করেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

৪। সচেতন ও দায়িত্বশীল

সকাল ৭টায় কিংবা রাত ৯টায়—যখনই ফালাহিয়ার অফিসে গিয়েছি, দেখেছি অধ্যক্ষ কাজে ব্যস্ত। অনেক সময় রাতেও তাঁকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করেছি, ‘বাসায় যাবেন না?’ তিনি শান্তভাবে উত্তর দিতেন, ‘হাতে কিছু কাজ বাকি আছে, তা শেষ করে যাব।’

কোনো কোনো দিন যেতে যেতে বলতেন, ‘একটু কাজ বাকি থেকে গেলে আবার এসে তা শেষ করতে হবে।’

শুধু মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন তা-ই নয়; বরং লক্ষ করেছি, সামাজিক কাজ, সাংগঠনিক কাজ, শিক্ষা সফরের দায়িত্ব—যখনই যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে, অন্য সব কাজ বন্ধ করে হলেও তিনি অত্যন্ত সচেতনতা, সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন।

বাস্তব জীবনে আমরা লক্ষ্য করেছি, খুব কম লোকই শতভাগ সচেতন থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।

সুতরাং মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবনের শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত নিজেকে অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

৫। ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক

ইসলামী রেনেসাঁ বা ইসলামী জাগরণ, ইকামতে দ্বীন বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা, খিলাফতের দায়িত্ব পালন কিংবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা—এসব পরিভাষা আল-কুরআনের পরিভাষা। গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং সঠিক ইসলামী জ্ঞান না থাকলে বিষয়গুলোর মর্ম ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন।

অনেক বড় বড় আলেম, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরকেও আমরা দেখেছি, যারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারেন না। মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে দেখেছি—তিনি এসব বিষয় উপলব্ধি করেছেন, বুঝেছেন এবং পুরো জীবন তা বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

ইকামতে দ্বীনের কাজ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। যার বুকের পাটা বিশাল, সাহস ও হিম্মত বেশি, যে সতর্ক ও ধৈর্যশীল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি যার অকৃত্রিম আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা সুদৃঢ়, মানুষের রক্তচক্ষু যার কাছে মূল্যহীন, আকাশের ন্যায় উদার যার মনোবল, পাহাড়ের মতো দৃঢ় যার সংকল্প—একমাত্র সেই ব্যক্তিই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মাধ্যমে ইসলামী রেনেসাঁর পতাকাবাহী হতে পারেন।

মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল ছিলেন। মুখের জড়তার কারণে অনেক সময় ভাব প্রকাশে বিলম্ব হতো। কিন্তু তাঁর সমগ্র জীবন ছিল ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক বা সিপাহসালারের জীবন।

বয়সে তিনি প্রবীণ ছিলেন; কিন্তু নবীনদের সব সময় উৎসাহ দিতেন এবং অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতেন। মাঠে-ময়দানে যারা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাদের প্রতি তিনি গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন এবং নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতেন।

কবি নজরুলের ভাষায়, সৈনিক বা মুজাহিদ হওয়ার জন্য বয়সই মাপকাঠি নয়; বরং মনোবল, সাহস, হিম্মত, নির্ভীকতা এবং জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতাই প্রকৃত পরিচয়।

মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি চলনে-বলনে, কৌশলে, প্রজ্ঞায় এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমে ইসলামী রেনেসাঁর সৈনিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের ভবিষ্যৎ নতুন প্রজন্মের শিরায়-উপশিরায় তিনি জাগরণের আগুন প্রজ্বলিত করে দিতেন। তাই আমি তাঁকে ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক বা সিপাহসালার বলেই মনে করি।

আল্লাহ তাআলা তাঁর এই মহান অবদান কবুল করুন।

৬। ইসলামী সংস্কৃতির লালনকারী

১৯৮০-৮১ সালে বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির সূচনা হয়। প্রচলিত গান, বাজনা, নাটক ও সিনেমার পরিবর্তে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী সংস্কৃতিচর্চার কাজ শুরু করেন দুইজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। গান, গজল, জারি, কাওয়ালি, সংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন মরহুম কবি মতিউর রহমান মল্লিক। আর নাটক, নাটিকা, কৌতুক, বিভিন্ন ধরনের হাস্যরস ও চিত্তবিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের প্রবর্তক ছিলেন জনাব সিদ্দিক জামাল। এ ক্ষেত্রে তাঁর সহযোগী ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকার শাহ আলম নূর।

ইসলামী সংস্কৃতির অঙ্গনের প্রথম সারির যেসব কণ্ঠশিল্পী রয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার ছাত্র, অর্থাৎ তাঁরা তাঁরই ছাত্র।

বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমি নিজেও তাঁর সঙ্গে ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময়, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার সুযোগ পেয়েছি।

ব্যক্তিগতভাবেও তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এক কথায় বলতে হয়, মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ইসলামী সংস্কৃতির প্রবক্তা, রূপকার ও লালনকারীদের অন্যতম।

৭। ইলমে দ্বীনের গবেষক

মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছাত্রজীবন থেকেই একজন স্কলার ছিলেন। শিক্ষকজীবনে এসে তিনি বহু উচ্চমানের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

আমাদের সমাজে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত আলেমের কোনো অভাব নেই। কিন্তু একটি বিষয়ে অভাব লক্ষ করা যায়। তা হলো—কুরআন-হাদিসের গবেষক এবং দ্বীনি ইলমচর্চায় যোগ্য আলেমের।

মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব একদিকে ইলমে দ্বীনের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষক, অন্যদিকে তিনি একজন মেধাবী গবেষক ছিলেন। ইসলামী আইনের জটিল বিষয়গুলোর সমাধানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যোগ্য ও পারদর্শী।

আরবিতে একটি প্রবাদ আছে—

“মাউতুল আলিমি মাউতুল আলাম।“

অর্থাৎ, একজন যোগ্য আলেমে দ্বীনের মৃত্যু যেন একটি জগতের মৃত্যু।

সত্যিই, কোনো কোনো আলেমের মৃত্যুতে জাতীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবের অনুপস্থিতিতে আমাদের এ অঞ্চলের আলেম সমাজের একটি প্রজ্বলিত মুকুট যেন ঝরে পড়েছে।

যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের মধ্য থেকে এ অভাব পূরণের যোগ্য উত্তরসূরি সৃষ্টি হবে—এটাই আমাদের কামনা।

শেষ কথা

উপরোক্ত বিশেষ গুণাবলি ছাড়াও তিনি সামাজিকভাবে ছিলেন একজন সমাজসেবক। আচরণ ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, আন্তরিক ও সদাচারী। সফরেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল।

লেনদেন ও আমানতদারির ব্যাপারে তিনি ছিলেন পরীক্ষিত একজন আমানতদার।

আমি মনে করি, মরহুমের জীবনী আমাদের জন্য শুধু স্মৃতিই হয়ে থাকবে না; বরং নবীন-প্রবীণ সবার জন্যই তাঁর জীবনী একটি উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে অনুপ্রেরণা জাগ্রত করবে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল ভালো কাজ কবুল করে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন—এই দোয়াই করি।

তাঁর পরিবারের সবাই যেন মরহুমের আদর্শ অনুসরণ করে জান্নাতবাসী হন—এটাই একান্ত কামনা।