১৯৯৬ সালের ১৯ আগস্ট। ফালাহিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের উদ্দেশ্যে লিখিত ও মৌখিক সাক্ষাৎকার দিতে যাই। সেদিনই অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ।
মৌখিক পরীক্ষায় তিনি আমাকে একটি মূল কিতাব এর মাঝখান খুলে পড়তে বললেন। এরপর অনুবাদ করতে বললেন। অনুবাদ শেষ হলে তিনি বললেন, ‘এবার অর্থটি বিশুদ্ধ বাংলায় প্রকাশ করুন।’ আমি যথাসাধ্য তা করার চেষ্টা করলাম। আমার অনুবাদে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ ভাঙা অথচ আন্তরিক কণ্ঠে বললেন, ‘মারহাবা।’ তাঁর সেই একটি শব্দেই আমার সমস্ত সংকোচ দূর হয়ে গেল। তাঁর কিতাবি দক্ষতা, গভীর পর্যবেক্ষণ এবং উৎসাহব্যঞ্জক আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। এভাবেই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
পরবর্তীতে ২৩ আগস্ট যখন ক্লাসে যোগদান করি, তখনও তাঁর আন্তরিকতা আমাকে অভিভূত করে। অফিসে নতুন একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সহযোগিতা করেন। তাঁর আচরণে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না; ছিল না কোনো কৃত্রিমতা বা দূরত্ব। নতুন মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল।
প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও বিচক্ষণ। পুরো প্রতিষ্ঠান যেন তাঁর নখদর্পণে ছিল। কোথাও কোনো ঘাটতি বা সমস্যা দেখা দিলে, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত হতো। পাঠদান, অফিস পরিচালনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী তদারকি কিংবা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শৃঙ্খলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সমানভাবে সক্রিয় ও সচেতন ছিলেন। তাঁর এই নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বই ফালাহিয়ার প্রশাসনিক কাঠামোকে সুসংহত ও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও দরদী। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুশিক্ষার ভিত্তি যত মজবুত হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ততই সমৃদ্ধ হবে। তাই শিশুদের কীভাবে পাঠদান করতে হবে, কীভাবে তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে শিক্ষা দিতে হবে—এসব বিষয়ে তিনি শিক্ষকদের অত্যন্ত সুন্দর ও গঠনমূলক পরামর্শ দিতেন। তাঁর সংশোধন ছিল আন্তরিক, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং শিক্ষকদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক।
প্রাচীন ধারার আলেম হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর ছিল অসাধারণ আগ্রহ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, যুগের প্রয়োজন মেটাতে দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি গণিত, বিজ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান এবং চিত্রাঙ্কনের মতো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা জরুরি। এ উপলব্ধি থেকেই তিনি এসব বিষয় সিলেবাসে সংযোজন ও গুরুত্ব প্রদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসের একটি ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান। একদিন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের খতিব সাহেবকে একটি অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে গিয়েছিলাম। দাওয়াত শেষে ফেরার পথে উদয়ন এক্সপ্রেসে একটি আসন খালি দেখে আমি তাঁর সঙ্গে একই আসনে বসে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তখন তিনি হাসিমুখে বললেন, “যুবক মানুষ, এত তাড়াতাড়ি দুর্বল হলে কীভাবে হবে? আসুন, চট্টগ্রাম সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে কিছু জানি।”
এরপর পুরো পথজুড়ে তিনি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে আলোচনা করলেন। সারা বাংলাদেশের ভূগোল, জনপদ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল বিস্ময়কর। এমনকি মানচিত্র দেখে বিভিন্ন সড়কের গতিপথ, মোড়, বাঁক এবং ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। শিক্ষাসফর বা ভ্রমণের পরিকল্পনায় তাঁর মতামত প্রায় সব সময়ই বাস্তবসম্মত ও নির্ভুল প্রমাণিত হতো। তাঁর এই বিস্তৃত জ্ঞান, পর্যবেক্ষণশক্তি এবং স্মৃতিশক্তি আমাদের সকলকেই মুগ্ধ করত।
অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) সামাজিকতা ও মেহমানদারির ক্ষেত্রে ছিলেন সত্যিই অতুলনীয়। তাঁর তালিবে-খিদমত (খেদমতকারী) হিসেবে থাকার সুবাদে তাঁর এ গুণগুলো খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আত্মীয়-স্বজনের হক আদায়ের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনকে তিনি ইবাদতের অংশ মনে করতেন। তাঁর সদালাপ, আন্তরিক ব্যবহার এবং অমায়িক আচরণ ছিল ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আমার কাকা হুজুরের একজন বিয়াই একবার তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “এমন বিয়াই আমি আর দেখিনি, আর কোনো দিন পাব বলেও মনে হয় না।” এই একটি মন্তব্যই তাঁর চরিত্রের উজ্জ্বল দিকগুলোর অনেকটাই তুলে ধরে।
প্রশাসনিক দায়িত্বে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি কিতাব পাঠদানে কখনো অবহেলা করতেন না। বিশেষ করে কামিল শ্রেণিতে মুসলিম শরীফ অত্যন্ত দক্ষতা, সাবলীলতা ও গবেষণামূলক পদ্ধতিতে পাঠদান করতেন। কিতাবি ইলমে তাঁর গভীর দখল এবং পাঠদানের স্বকীয় পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল।
সর্বোপরি, তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই শিক্ষকদের শিক্ষক—একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, দক্ষ সংগঠক, আন্তরিক অভিভাবক, নিরহংকার, সাদাসিধে এবং কর্মনিষ্ঠ মানুষ। তাঁর ইন্তিকালে জাতি হারিয়েছে একজন দক্ষ মানুষ গড়ার কারিগরকে। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।