আধুনিকতার অন্তিম পর্যায়ের যেসব পরীক্ষা ও বিপর্যয়, মুসলিম বিশ্বও তার কিছুটা ভাগীদার: জীবনের অর্থ ও দিকনির্দেশনা হারানো, নীরবে অনুপ্রবেশকারী শূন্যতাবাদ বা নৈহিলিজম, মূল্যবোধের সামগ্রীকরণ বা হাতিয়ারে পরিণত করা, রাজনীতির মৃত্যু, সত্যের বহুমুখী দাবির সংঘাত, বাণিজ্যবাদ ও ভোক্তাবাদের প্রলোভন, প্রগতিশীলতাবাদ ইত্যাদি। একশ বছর আগে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের সময় এবং মুসলিম উম্মাহর ধারণা যখন তার অর্থ ও প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছিল, তখনও এই কলামের শিরোনামটি অনায়াসে ব্যবহার করা যেত। এরপর থেকে, কিংবা বলা যায় এর আগে থেকেই, সংকট মুসলিম বিশ্বকে আর ছেড়ে যায়নি। জামালুদ্দিন আফগানি, মুহাম্মদ আবদুহ, নামিক কামাল, মুহাম্মদ ইকবালসহ আরও অনেক মুসলিম পণ্ডিত, চিন্তাবিদ ও কর্মী বারবার একই সমস্যার কথা উত্থাপন করেছেন। কেন? কারণ সংকটটি বাস্তব, আর এটাকে না থাকার ভান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
কিন্তু এটা কি সব সভ্যতার ক্ষেত্রেই সত্য নয়? বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে স্পেংলারের ‘দ্য ডিক্লাইন অফ দ্য ওয়েস্ট’ (পশ্চিমের পতন)-এর কত রকম ব্যাখ্যা বা রূপভেদ প্রকাশিত হয়েছে? নিটশের বুদ্ধিবৃত্তিক বংশধররা পশ্চিমা সভ্যতার সংকট নিয়ে যন্ত্রণা পেয়েছেন এবং হয়তো এতে এক ধরনের আনন্দও পেয়েছেন। চীনা ও ভারতীয়দের জিজ্ঞেস করলে, তারাও সম্ভবত তাদের সভ্যতার আধুনিক যাত্রাপথ সম্পর্কে অনুরূপ কথাই বলবেন।
সুতরাং, প্রশ্ন এটা নয় যে সংকট আছে কি না, বা কেন সব সময় একটা না একটা সংকট থাকতেই হয়। প্রশ্ন হলো, একটি সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের সংকট অতিক্রম করার জন্য সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া তৈরি করার সামর্থ্য আছে কি না। টয়নবি সভ্যতার স্থিতিস্থাপকতা ও টিকে থাকার প্রকৃত পরীক্ষা হিসেবে ‘চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’ বা ‘আহ্বান ও প্রতিক্রিয়া’ প্রক্রিয়ার যে কথা বলেছিলেন, তা একদম সঠিক। কোনো সংস্কৃতি বা জাতিকে সংকট অতিক্রম করতে সক্ষম করে তোলে তার জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়; বরং আহ্বান ও প্রতিক্রিয়ার চক্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই তাদের সাহায্য করে। এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই তারা সদ্য উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে এবং নতুন শক্তির সঞ্চার করে।
আজ মুসলিম বিশ্বে ঠিক এই সামর্থ্যটিই অনুপস্থিত। শুধু ইসলামের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস থাকাই সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। ফিডেইজম বা ‘কেবল বিশ্বাসই যথেষ্ট’—এই ধারণার বিভিন্ন রূপও কোনো প্রতিকার হতে পারে না। বিশ্বাসীকে নিজের কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে এবং নিজের পবিত্র গ্রন্থের বাণীকে সময়ের বাস্তবতার সাথে সমন্বয় করে তুলতে হবে। কুরআন পৃথিবীতে মানবজাতির ভাগ্য নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছে এবং ব্যাখ্যা করেছে যে, এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আসা পরীক্ষা ও দুঃখকষ্ট মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করতে পারে। ঈমান বা বিশ্বাস হলো জ্ঞান, সাহস ও দৃঢ়তার এক অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু এর কারণে ধর্মতাত্ত্বিক অহংকার বা বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা দেখা দেওয়া উচিত নয়। এমনটি ঘটলে, বিশ্বাস ইহজাগতিক আমাদের সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান দিতে পারে না।
নিজেদের সৃষ্ট সংকটের জন্য অন্যদের দোষারোপ করার প্রবণতার ক্ষেত্রেও একই নীতি খাটে। হ্যাঁ, বাইরে মহাশক্তিগুলোর খেলা অনেক চলছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যে ক্রমাগত কারসাজি চলছে, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে অনেক কিছুর জন্য দোষ দেওয়া যায়; এটি ন্যায়বিচার, শান্তি বা সমতা তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এই সত্যটি বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মধ্যে সমাধান নেই, বরং সৃজনশীল ও গঠনমূলক উপায়ে এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করার মধ্যেই সমাধান নিহিত। কেউই মুসলিম দেশগুলোর সমস্যার সমাধান করে দেবে না; তাদের নিজেদের সমস্যার দায়িত্ব নিতে হবে এবং বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে সাধ্যমতো নিজেদের শর্তে উদ্যোগ নিতে হবে।
সিরিয়া ও ইয়েমেন থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে—কয়েকটি সম্মানজনক ব্যতিক্রম ছাড়া—মুসলিম দেশগুলো খেলার নিয়ম নির্ধারণে খুব কমই নেতৃত্ব দেখাতে পেরেছে। নির্ভরশীলতা, বৈধতার সংকট, স্বল্পমেয়াদি চিন্তাভাবনা, হীনম্মন্যতা এবং গভীর চিন্তাধারা, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব—এসব বিষয় মুসলিম বিশ্বকে সামগ্রিকভাবে এক নিষ্ক্রিয় দর্শকে পরিণত করেছে। এখন প্রয়োজন সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজ্ঞা ও সাহসী নেতৃত্ব। আর এর প্রয়োজন কালকের চেয়ে আজই বেশি।
আধুনিকতার অন্তিম পর্যায়ের যেসব পরীক্ষা ও বিপর্যয়, মুসলিম বিশ্বও তার কিছুটা ভাগীদার: জীবনের অর্থ ও দিকনির্দেশনা হারানো, নীরবে অনুপ্রবেশকারী শূন্যতাবাদ বা নৈহিলিজম, মূল্যবোধের সামগ্রীকরণ বা হাতিয়ারে পরিণত করা, রাজনীতির মৃত্যু, সত্যের বহুমুখী দাবির সংঘাত, বাণিজ্যবাদ ও ভোক্তাবাদের প্রলোভন, প্রগতিশীলতাবাদ ইত্যাদি। আমি জানি, অনেকেই মানতে চান না যে এই সমস্যাগুলো মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিন্তু এটা আদৌ সত্য নয়। এই সমস্যাগুলো বাস্তবেই রয়েছে, আর এই সহজ সত্যটি স্বীকার করেই আমাদের যাত্রা শুরু করতে হবে।
নিজেদের মানবীয়, প্রাকৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে মুসলিম বিশ্ব বর্তমানে যা করছে, তার চেয়ে অনেক ভালো করতে পারে। মুসলিম জাতিগুলো সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে শান্তি, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং করতেই হবে। তারা সব সময় অন্যদের দোষারোপ না করেই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারে এবং করতেই হবে। নৈতিক গতানুগতিকতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা আমাদের এক মিথ্যা আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারে, কিন্তু সমস্যা সমাধানে কোনো সাহায্য করতে পারে না। আর বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে পিঠ ফিরিয়ে না নিয়েই এটি করা সম্ভব।
লেখক পরিচিতি: ইব্রাহিম কালিন বর্তমানে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমআইটি)-এর প্রধান। প্রশাসনিক পদের বাইরে তিনি একজন দার্শনিক ও গবেষক। ইসলামী দর্শন, বিশেষত মোল্লা সদরার অস্তিত্ববাদ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক চিন্তাধারার সমালোচনা এবং অস্তিত্বের গভীরতর বিশ্লেষণই তার দার্শনিক লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের সাবেক মুখপাত্র ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
[সূত্রঃ প্রবন্ধটি Daily Sabah পত্রিকায় ২০ অক্টোবর, ২০১৮তারিখে প্রকাশিত]
মূল প্রবন্ধের লিংক- Crisis in the Muslim World | Daily Sabah