আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর স্মরণে
আব্দুল্লাহ আল মামুন
ইমাম ও খতীব, দারুল জান্নাহ ইসলামিক সেন্টার ও মাসজিদ, বার্মিংহাম, ইউকে || সাবেক শিক্ষার্থী, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী
بِسْمِ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللهِ
কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁদের শিক্ষা, ভালোবাসা, আদর্শ ও স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকে। আমার জীবনের এমনই একজন মহান ব্যক্তি ছিলেন আমার প্রিয় উস্তায, শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তাঁর স্নেহ ও দিকনির্দেশনা লাভ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি ফেনী ফালাহীয়া মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণি থেকে দাখিল পর্যন্ত পড়াশোনা করি। এরপর যখন জামিয়া কাসেমিয়াতে আলেম পড়তে যাই, তখন সেখানেও আমার প্রিয় উস্তাযের ব্যাপক সুনাম শুনতে পাই। সেখানে তিনি সকলের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে “হাজী হুজুর” নামে পরিচিত ছিলেন।
জামিয়া কাসেমিয়াতেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। ইলমে দ্বীনের প্রসার, ছাত্রদের গঠন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ইলম, প্রজ্ঞা, আন্তরিকতা ও দ্বীনের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাঁকে সকলের কাছে সম্মানিত করে তুলেছিল।
আমার প্রতি তাঁর স্নেহ ছিল একজন পিতার মতো। তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং সবসময় পড়াশোনার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। ইলম অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর উৎসাহ ও নসিহত আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর স্নেহময় আচরণ ও ভালোবাসার কথা কখনো ভোলার নয়।
মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক নিয়োগের সময় তিনি আমাদের ক্লাসকে প্র্যাকটিক্যাল ইন্টারভিউর জন্য প্রাধান্য দিতেন। বিশেষ করে আমাকে এবং আমাদের সহপাঠীদের বিভিন্ন প্রশ্ন করতে বলতেন। আর তিনি ক্লাসের পেছনে বসে সব পর্যবেক্ষণ করতেন। এর মাধ্যমে তিনি আমাদের জ্ঞান যাচাই করতেন, চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করতেন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের মতো তিনি ছাত্রদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতেন এবং নতুন শিক্ষকের যোগ্যতা দেখতেন। এটি ছিল তাঁর ইউনিক আইডিয়া, যা বর্তমান বিশ্বে এ ধরনের সেটিংসে প্রয়োগ করা হয়।
শিক্ষা সফরের এক অমলিন স্মৃতি
আমার জীবনের একটি বিশেষ স্মৃতি হলো একটি শিক্ষা সফরের ঘটনা। তখন আমি বয়সে অনেক ছোট ছিলাম। সফরটি অনেক দূরের হওয়ায় আমার আব্বু প্রথমে রাজি হননি। তাঁর স্বাভাবিক চিন্তা ছিল—এত অল্প বয়সে আমি কীভাবে এত দূরের সফরে যাব, কীভাবে থাকব।
তখন আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ) আব্বুকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতো দেখাশোনা করবেন এবং সবসময় তাঁর সঙ্গে রাখবেন। উস্তাযের সেই আশ্বাসে আব্বু রাজি হয়েছিলেন।
সফরের পুরো সময়জুড়ে তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। তিনি আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে আলাদা করেননি। এমনকি বাসেও তাঁর নিজের সিটের পাশের সিটে আমাকে বসিয়েছিলেন, যাতে আমার কোনো অসুবিধা না হয় এবং তিনি সবসময় আমার খেয়াল রাখতে পারেন।
একজন বড় আলেম ও অধ্যক্ষ হয়েও একজন ছোট ছাত্রের প্রতি তাঁর এই স্নেহ, মায়া-মমতা ও দায়িত্ববোধ ছিল সত্যিই বিরল। তাঁর সেই ভালোবাসা ও অভিভাবকসুলভ আচরণের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে অঙ্কিত হয়ে আছে। একজন উস্তায কীভাবে ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে পারেন, তিনি ছিলেন তার জীবন্ত উদাহরণ।
আমার শ্রদ্ধেয় আব্বুর সঙ্গেও তাঁর ছিল অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক সম্পর্ক। তাঁদের মধ্যে ছিল ভালোবাসা, সম্মান ও দ্বীনি বন্ধনের এক সুন্দর উদাহরণ। তাঁদের সম্পর্ক আমাদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আমার জীবনের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত হলো—যখন আমি মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে অনার্স সম্পন্ন করার পর ২০০৫ সালের শেষের দিকে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (IIUM)-তে মাস্টার্স পড়ার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই সময় আমি আমার প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সঙ্গে দেখা করতে যাই।
সেদিনের স্মৃতি আমার জীবনে কখনো ভোলার নয়। আমাকে দেখে তিনি যে আনন্দ ও আবেগ প্রকাশ করেছিলেন, তা আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। তিনি আমাকে স্নেহভরে জড়িয়ে ধরেছিলেন এবং তাঁর চোখেমুখে যে খুশি ও গর্বের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছিল, তা ছিল একজন পিতার মতো। মনে হচ্ছিল, আমার এই অর্জন যেন তাঁর নিজেরই অর্জন, আমার সফলতাই যেন তাঁর গৌরব।
একজন প্রকৃত শিক্ষকের হৃদয় এমনই হয়—ছাত্রের সফলতায় তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পান। আমার প্রতি তাঁর সেই ভালোবাসা, দোয়া ও গর্বের অনুভূতি আমার জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে।
এরপর যখনই আমি ফেনীতে আসতাম, আমার প্রিয় উস্তাযের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ছিল আমার জন্য এক বিশেষ আনন্দ ও প্রশান্তির বিষয়। তিনি সবসময় অত্যন্ত আন্তরিকতা ও স্নেহের সঙ্গে আমার খোঁজখবর নিতেন।
বিশেষ করে তিনি তাঁর প্রিয় সন্তান নোমানের বিষয়ে আমার সঙ্গে বিভিন্ন কথা বলতেন। একজন অভিভাবকের মতো তিনি তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর কথাবার্তার মধ্যে যেমন ছিল একজন পিতার ভালোবাসা, তেমনি ছিল আমার প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ও আপন ভাব।
তাঁর সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল আমার জন্য শিক্ষা, ভালোবাসা ও স্মৃতির এক অমূল্য অধ্যায়। আজ সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে হৃদয় আবেগে ভরে ওঠে।
এতিম ও অসহায় ছাত্রদের প্রতি তাঁর মমতা
ফেনী ফালাহীয়া মাদ্রাসার এতিমখানার জন্য অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অবদান কারও অজানা নয়। এতিম ও অসহায় ছাত্রদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর দরদ ও মমতা। তিনি শুধু একজন প্রশাসক বা শিক্ষক ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন অসহায় ছাত্রদের একজন অভিভাবক।
গরিব ও অসচ্ছল ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যাপারে তিনি সবসময় আন্তরিক ছিলেন। কোনো দরিদ্র ছাত্রের ফি মওকুফ বা আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হলে কেউ তাঁর কাছে গিয়েছেন অথচ কোনো না কোনো সমাধান পাননি—এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাঁর এই দয়া, উদারতা ও ছাত্রপ্রেমই প্রমাণ করে যে তিনি শুধু ইলমের শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মমতাময় অভিভাবক, যিনি মানুষের প্রয়োজনকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন।
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন ইলমে দ্বীনের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি শুধু জ্ঞান বিতরণ করেননি; বরং তাঁর চরিত্র, আখলাক ও আমলের মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে একজন প্রকৃত আলেম ও আদর্শ মানুষ হতে হয়।
তাঁর সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপন
অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবনের আরেকটি অনুকরণীয় দিক ছিল তাঁর অত্যন্ত সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপন। একজন বড় আলেম, সম্মানিত অধ্যক্ষ ও অসংখ্য ছাত্রের উস্তায হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কোনো অহংকার বা জাঁকজমকের ভাব ছিল না।
তিনি অত্যন্ত সাধারণভাবে জীবন পরিচালনা করতেন। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ছিল বিনয় ও সরলতার প্রকাশ। তিনি ইলম, আমল ও উত্তম চরিত্রকে জীবনের মূল সৌন্দর্য মনে করতেন।
তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন এবং দ্বীন, শিক্ষা, সমাজসেবা ও বিভিন্ন সম্মানজনক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাতে গড়া এসব ছাত্রই তাঁর জীবনের বড় সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করছে। একজন শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর ছাত্রদের মাঝেই বেঁচে থাকে।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর নসিহত, তাঁর ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ আমাদের মাঝে চিরজীবী থাকবে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর ইলমের আলো বহু প্রজন্মকে আলোকিত করবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলার দরবারে আমাদের বিনীত দোয়া—
হে আল্লাহ! আমাদের প্রিয় উস্তায অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সকল দ্বীনি খেদমত কবুল করুন। তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন। তাঁর সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন। তাঁর ইলম, শিক্ষা ও আদর্শকে তাঁর জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।
হে আল্লাহ! তাঁর পরিবার, ছাত্র ও সকল শুভাকাঙ্ক্ষীকে সবরে জামিল দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁর দেখানো ইলম ও আমলের পথে চলার তাওফিক দান করুন।
آمين يا رب العالمين
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
Related Posts
View Allমানুষটি চলে গেছেন, আলোটি রয়ে গেছেঃ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর স্মৃতিতে
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
পিএইচডি গবেষক || মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
মানুষ গড়ার কারিগর: প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম
ফারুক আহমাদ
অধ্যক্ষ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.): একজন প্রকৃত আলিমের জীবন, কর্ম ও উত্তরাধিকার
ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার
নির্বাহী সম্পাদক, দ্বিমাসিক আল মাকতাব, ঢাকা