মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ)-এর সঙ্গে কিছু স্মৃতিকথা
এ জি এম বদরুদ্দোজা
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও রাজনীতিবীদ
মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবের ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভক্ত, ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীরা তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ জীবনকে সংরক্ষণ ও অনুসরণের লক্ষ্যে “অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশন“ গঠন করেছেন। এটি সময়োপযোগী ও যথাযথ উদ্যোগ। তাদের এই উদ্যোগের জন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও মুবারকবাদ জানাচ্ছি।
পত্রিকার মাধ্যমে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জেনে আমি ভেবেছি, মরহুমের জীবনের ওপর দুই-চারটি কথা লিখতে পারলে নবীন শিক্ষার্থীদের জীবনও অনুপ্রাণিত হবে। তাই আমি আমার দুর্বলতা সত্ত্বেও এই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছি মাত্র।
মরহুম মাওলানার সঙ্গে আমার পরিচয় আনুমানিক ৪০ বছর পূর্বে, যখন আমি দাখিলের ছাত্র ছিলাম। আমার সম্মানিত উস্তাদ মরহুম মাওলানা নুরুল আমিন সাহেব (সোনাগাজী সিনিয়র মাদ্রাসার মঈন সাহেব হুজুর)-এর দ্বিতীয় জামাতা হিসেবে তাঁর নামের সঙ্গে আমি পরিচিত হই। গভীরভাবে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায় ১৯৮১ সালে।
সমগ্র বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার নির্বাচিত প্রায় ২৫০ জন আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষককে নিয়ে ৪৫ দিনের আধুনিক আরবি ভাষা শিক্ষাদান-পদ্ধতির ওপর আন্তর্জাতিক মানের একটি ট্রেনিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি। ট্রেনিংটি পরিচালনা করেন মক্কা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ও জেদ্দার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকদের যৌথ উদ্যোগে আগত প্রশিক্ষকবৃন্দ।
৯০-এর দশকে বাংলাদেশে আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান সমভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে—একটি তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা এবং অন্যটি জামেয়ায়ে কাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসা, নরসিংদী।
মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার সিনিয়র শিক্ষক এবং হোস্টেল সুপার। আমি বিভিন্ন সময় আমার অভিভাবকত্বের সুবাদে জামেয়ায়ে কাসেমিয়ায় গিয়ে তাঁর দায়িত্বে ছাত্রদের ভর্তি করিয়ে দিতাম। এভাবে আমাদের যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়।
জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার অবস্থান, পরিবেশ, শিক্ষার মান, শিক্ষাদান-পদ্ধতি ও হোস্টেল পরিচালনা দেখে আমি আকৃষ্ট হই এবং ফেনীতে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকি। ১৯৮২-৮৩ সালে ফেনী মডেল মাদ্রাসার নাম পরিবর্তন করে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া নামকরণ করা হয়। মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে ফালাহিয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে ফেনীতে নিয়ে আসতে রাজি করানো হয়।
প্রতিষ্ঠান গড়ার নেশা এবং নিজ এলাকার প্রতি ভালোবাসার টানে তিনি ফেনীতে চলে আসেন।
মরহুম আবুল হাশেম সাহেব যোগদান করার পর আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়ার অগ্রযাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমি তাঁকে যতটুকু কাছ থেকে দেখেছি, সেই ৩০-৪০ বছরের মধ্যে এক মাসের ট্রেনিং, একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা এবং একসঙ্গে সাংগঠনিক কাজ করতে গিয়ে তাঁর যে বিস্তৃত কর্মজীবন দেখেছি, তার বিস্তারিত বিবরণ এই স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।
তাই নবীন পাঠকদের অবগতি ও অনুপ্রেরণা দানের উদ্দেশ্যে আমি শুধু তাঁর কয়েকটি মৌলিক গুণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব।
১। বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন
একজন আলেমে দ্বীনের কার্যাবলি ও তৎপরতার ওপর ইসলামের মৌলিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। যোগ্য ও বিজ্ঞ আলেমে দ্বীনকে অনুসরণ করে সাধারণ মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রত্যেক স্তরে একজন বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন হিসেবে আমি দেখেছি। শুধু তাই নয়, তিনি আলেম সমাজের জন্যও একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ইসলামপ্রিয় মানুষ অবশ্যই তাঁর এই চরিত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হবেন এবং তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করবেন। কারণ সমাজে আলেমের অভাব নেই, কিন্তু প্রকৃত আলেমে দ্বীন অত্যন্ত বিরল।
২। আদর্শ শিক্ষক
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর বাধ্যতামূলক। জ্ঞানই হচ্ছে প্রজ্জ্বলিত আলোকবর্তিকা। উপরোক্ত হাদিস ও চিরন্তন বাণীগুলো জাতীয় জীবনে শিক্ষার প্রতি মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। সুতরাং এসব আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সমাজে আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজন। যদিও শিক্ষকতার পেশায় অনেককেই পাওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত আদর্শ শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখার মানুষের সংখ্যা নিতান্তই কম।
একজন শিক্ষক তাঁর মেধা, চরিত্র, যোগ্যতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে জাতির সন্তানদের আপন সন্তানের মতো গড়ে তোলেন এবং তাদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিক্ষকতা পেশায় তেমনি এক আদর্শ শিক্ষকের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম। তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন এই সত্যেরই উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে।
একজন আদর্শ শিক্ষকের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, তার সবই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তাই তো তিনি ছিলেন শত শত শিক্ষকেরও শিক্ষক। তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
৩। মানুষ গড়ার কারখানা
কারখানার ধর্মই হচ্ছে উৎপাদন করা বা বৃদ্ধি করা। শিক্ষা জীবনে বা বাস্তব জীবনে সামান্যতম দুর্বলতা বা অবহেলার কারণে অগণিত বনী আদম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুর্বিষহ ও অবহেলিত জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে, যথাযথ নির্দেশনা পেয়ে এবং সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্তর অতিক্রম করেছে। তাদের মধ্যে আদর্শ মানুষ, মহামানব, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন বিভাগের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন।
শুধু বাংলাদেশের সর্বত্রই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে তাঁর হাতে গড়া মানুষগুলো সমাজের নেতৃত্ব দান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তেমনি এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব। তিনি হাজার হাজার মানুষ তৈরি করেছেন। সত্যিই তাঁকে মানুষ গড়ার কারখানা বলাটাই যথার্থ ও যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই মহান দায়িত্ব পালন করেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
৪। সচেতন ও দায়িত্বশীল
সকাল ৭টায় কিংবা রাত ৯টায়—যখনই ফালাহিয়ার অফিসে গিয়েছি, দেখেছি অধ্যক্ষ কাজে ব্যস্ত। অনেক সময় রাতেও তাঁকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করেছি, ‘বাসায় যাবেন না?’ তিনি শান্তভাবে উত্তর দিতেন, ‘হাতে কিছু কাজ বাকি আছে, তা শেষ করে যাব।’
কোনো কোনো দিন যেতে যেতে বলতেন, ‘একটু কাজ বাকি থেকে গেলে আবার এসে তা শেষ করতে হবে।’
শুধু মাদ্রাসা পরিচালনার দায়িত্ব পালনে তিনি অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন তা-ই নয়; বরং লক্ষ করেছি, সামাজিক কাজ, সাংগঠনিক কাজ, শিক্ষা সফরের দায়িত্ব—যখনই যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে, অন্য সব কাজ বন্ধ করে হলেও তিনি অত্যন্ত সচেতনতা, সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দিয়েছেন।
বাস্তব জীবনে আমরা লক্ষ্য করেছি, খুব কম লোকই শতভাগ সচেতন থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।
সুতরাং মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবনের শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত নিজেকে অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৫। ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক
ইসলামী রেনেসাঁ বা ইসলামী জাগরণ, ইকামতে দ্বীন বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা, খিলাফতের দায়িত্ব পালন কিংবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা—এসব পরিভাষা আল-কুরআনের পরিভাষা। গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং সঠিক ইসলামী জ্ঞান না থাকলে বিষয়গুলোর মর্ম ও তাৎপর্য উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন।
অনেক বড় বড় আলেম, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরকেও আমরা দেখেছি, যারা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারেন না। মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে দেখেছি—তিনি এসব বিষয় উপলব্ধি করেছেন, বুঝেছেন এবং পুরো জীবন তা বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
ইকামতে দ্বীনের কাজ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। যার বুকের পাটা বিশাল, সাহস ও হিম্মত বেশি, যে সতর্ক ও ধৈর্যশীল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি যার অকৃত্রিম আস্থা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা সুদৃঢ়, মানুষের রক্তচক্ষু যার কাছে মূল্যহীন, আকাশের ন্যায় উদার যার মনোবল, পাহাড়ের মতো দৃঢ় যার সংকল্প—একমাত্র সেই ব্যক্তিই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর মাধ্যমে ইসলামী রেনেসাঁর পতাকাবাহী হতে পারেন।
মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল ছিলেন। মুখের জড়তার কারণে অনেক সময় ভাব প্রকাশে বিলম্ব হতো। কিন্তু তাঁর সমগ্র জীবন ছিল ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক বা সিপাহসালারের জীবন।
বয়সে তিনি প্রবীণ ছিলেন; কিন্তু নবীনদের সব সময় উৎসাহ দিতেন এবং অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতেন। মাঠে-ময়দানে যারা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাদের প্রতি তিনি গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন এবং নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতেন।
কবি নজরুলের ভাষায়, সৈনিক বা মুজাহিদ হওয়ার জন্য বয়সই মাপকাঠি নয়; বরং মনোবল, সাহস, হিম্মত, নির্ভীকতা এবং জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতাই প্রকৃত পরিচয়।
মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি চলনে-বলনে, কৌশলে, প্রজ্ঞায় এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমে ইসলামী রেনেসাঁর সৈনিকদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের ভবিষ্যৎ নতুন প্রজন্মের শিরায়-উপশিরায় তিনি জাগরণের আগুন প্রজ্বলিত করে দিতেন। তাই আমি তাঁকে ইসলামী জাগরণের অগ্রপথিক বা সিপাহসালার বলেই মনে করি।
আল্লাহ তাআলা তাঁর এই মহান অবদান কবুল করুন।
৬। ইসলামী সংস্কৃতির লালনকারী
১৯৮০-৮১ সালে বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির সূচনা হয়। প্রচলিত গান, বাজনা, নাটক ও সিনেমার পরিবর্তে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী সংস্কৃতিচর্চার কাজ শুরু করেন দুইজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। গান, গজল, জারি, কাওয়ালি, সংগীত ও দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন মরহুম কবি মতিউর রহমান মল্লিক। আর নাটক, নাটিকা, কৌতুক, বিভিন্ন ধরনের হাস্যরস ও চিত্তবিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের প্রবর্তক ছিলেন জনাব সিদ্দিক জামাল। এ ক্ষেত্রে তাঁর সহযোগী ছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকার শাহ আলম নূর।
ইসলামী সংস্কৃতির অঙ্গনের প্রথম সারির যেসব কণ্ঠশিল্পী রয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই জামেয়ায়ে কাসেমিয়ার ছাত্র, অর্থাৎ তাঁরা তাঁরই ছাত্র।
বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিলেন। আমি নিজেও তাঁর সঙ্গে ইসলামী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময়, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার সুযোগ পেয়েছি।
ব্যক্তিগতভাবেও তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এক কথায় বলতে হয়, মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ইসলামী সংস্কৃতির প্রবক্তা, রূপকার ও লালনকারীদের অন্যতম।
৭। ইলমে দ্বীনের গবেষক
মরহুম মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব ছাত্রজীবন থেকেই একজন স্কলার ছিলেন। শিক্ষকজীবনে এসে তিনি বহু উচ্চমানের প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।
আমাদের সমাজে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত আলেমের কোনো অভাব নেই। কিন্তু একটি বিষয়ে অভাব লক্ষ করা যায়। তা হলো—কুরআন-হাদিসের গবেষক এবং দ্বীনি ইলমচর্চায় যোগ্য আলেমের।
মাওলানা আবুল হাশেম সাহেব একদিকে ইলমে দ্বীনের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষক, অন্যদিকে তিনি একজন মেধাবী গবেষক ছিলেন। ইসলামী আইনের জটিল বিষয়গুলোর সমাধানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যোগ্য ও পারদর্শী।
আরবিতে একটি প্রবাদ আছে—
“মাউতুল আলিমি মাউতুল আলাম।“
অর্থাৎ, একজন যোগ্য আলেমে দ্বীনের মৃত্যু যেন একটি জগতের মৃত্যু।
সত্যিই, কোনো কোনো আলেমের মৃত্যুতে জাতীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়। মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবের অনুপস্থিতিতে আমাদের এ অঞ্চলের আলেম সমাজের একটি প্রজ্বলিত মুকুট যেন ঝরে পড়েছে।
যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের মধ্য থেকে এ অভাব পূরণের যোগ্য উত্তরসূরি সৃষ্টি হবে—এটাই আমাদের কামনা।
শেষ কথা
উপরোক্ত বিশেষ গুণাবলি ছাড়াও তিনি সামাজিকভাবে ছিলেন একজন সমাজসেবক। আচরণ ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, আন্তরিক ও সদাচারী। সফরেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল।
লেনদেন ও আমানতদারির ব্যাপারে তিনি ছিলেন পরীক্ষিত একজন আমানতদার।
আমি মনে করি, মরহুমের জীবনী আমাদের জন্য শুধু স্মৃতিই হয়ে থাকবে না; বরং নবীন-প্রবীণ সবার জন্যই তাঁর জীবনী একটি উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে অনুপ্রেরণা জাগ্রত করবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল ভালো কাজ কবুল করে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন—এই দোয়াই করি।
তাঁর পরিবারের সবাই যেন মরহুমের আদর্শ অনুসরণ করে জান্নাতবাসী হন—এটাই একান্ত কামনা।
Related Posts
View Allমানুষটি চলে গেছেন, আলোটি রয়ে গেছেঃ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর স্মৃতিতে
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
পিএইচডি গবেষক || মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
মানুষ গড়ার কারিগর: প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম
ফারুক আহমাদ
অধ্যক্ষ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.): একজন প্রকৃত আলিমের জীবন, কর্ম ও উত্তরাধিকার
ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার
নির্বাহী সম্পাদক, দ্বিমাসিক আল মাকতাব, ঢাকা