ভূমিকা
তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন কেবল পাঠদান বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মের চরিত্র নির্মাণ, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে আজীবন নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে একাধিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বিকশিত হয়েছে, অসংখ্য শিক্ষার্থী সুশিক্ষা ও আদর্শের দীক্ষা লাভ করেছে এবং বহু শিক্ষকের কর্মজীবন অনুপ্রাণিত হয়েছে।
সভ্যতার ইতিহাস মূলত জ্ঞান ও অজ্ঞতার, আলো ও অন্ধকারের, নৈতিকতা ও অবক্ষয়ের মধ্যকার অবিরাম সংগ্রামের ইতিহাস। যুগে যুগে কিছু মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ, আরাম-আয়েশ কিংবা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাঁরা প্রচারের আলোয় নয়, কর্মের আলোয় ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) ছিলেন তেমনই একজন নীরব স্থপতি।
ইসলামের আবির্ভাবও ছিল মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোয় নিয়ে আসার আহ্বান। মহান আল্লাহ বলেন—
“এটি এমন একটি কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসেন।”
— সূরা ইবরাহিম, ১৪:১
আবার আল্লাহ তাআলা বলেন—
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?”
— সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“নিশ্চয়ই আলেমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।”
— সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৪১
এই কুরআনিক ও নববী শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ছিল মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন। তিনি জ্ঞানকে কখনো ব্যক্তিগত মর্যাদা অর্জনের উপায় হিসেবে দেখেননি; বরং ইবাদত, আমানত এবং সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল একটি আলোকিত, নৈতিক ও আদর্শ সমাজ গঠনের অবিরাম সাধনা।
জন্ম ও পারিবারিক পরিবেশ
মানুষের চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয় হলো পরিবার। ইসলামী শিক্ষায় পরিবারকে নৈতিকতা, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.) ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ শিশুশিক্ষা সম্পর্কে বলেন—
“শিশুর হৃদয় একটি নির্মল ও মূল্যবান রত্নের মতো; তাকে যে আদর্শে গড়ে তোলা হবে, সে সেই আদর্শেই বিকশিত হবে।”
এই আদর্শেই শৈশব থেকে তাঁর মধ্যে কুরআন শিক্ষা, ইবাদত, শৃঙ্খলা, বিনয় ও অধ্যবসায়ের ভিত্তি নির্মিত হয়। পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্বে যে নৈতিক দৃঢ়তা, আত্মসংযম, জ্ঞানপিপাসা এবং মানবিকতা পরিলক্ষিত হয়, তার বীজ নিহিত ছিল এই পারিবারিক পরিবেশে।
শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা
১৯৫০ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জন তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এই অর্জন তাঁর অসাধারণ মেধা, অধ্যবসায় এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার স্বীকৃতি বহন করে। শৈশব থেকেই তিনি নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যয়নের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় দিয়েছিলেন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর সাফল্যের দৃঢ় ভিত্তি হয়ে ওঠে।
মাদ্রাসা শিক্ষায় প্রবেশ
সমকালীন মুসলিম চিন্তাবিদ অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকী তাঁর Islamization of Knowledge: General Principles and Workplan গ্রন্থে লিখেছেন—
“Knowledge in Islam is never value-neutral; it is intimately connected with moral responsibility and civilization-building.”
অর্থাৎ, ইসলামে জ্ঞান কখনো মূল্যবোধনিরপেক্ষ নয়; বরং তা নৈতিক দায়িত্ব এবং সভ্যতা নির্মাণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত।
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সমগ্র শিক্ষাজীবন এবং পরবর্তী কর্মধারা এই দর্শনেরই এক উজ্জ্বল বাস্তব প্রতিফলন।
শিক্ষাজীবন: মেধা, অধ্যবসায় ও ইলমসাধনার অভিযাত্রা
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন ছিল ধারাবাহিক সাফল্য, কঠোর অধ্যবসায় এবং জ্ঞানসাধনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং আত্মনিবেদিত অধ্যয়নের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা পরবর্তী জীবনে তাঁকে দেশের অন্যতম কৃতী ইসলামী শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি বাটইয়া নূরুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানেই আরবি ভাষা, কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ বিকশিত হতে থাকে। শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁকে অল্প সময়েই একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
ইসলামী শিক্ষাদর্শে জ্ঞানকে কেবল তথ্য অর্জনের উপায় হিসেবে দেখা হয় না; বরং আত্মশুদ্ধি, নৈতিক বিকাশ এবং সমাজ নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকী তাঁর Islamization of Knowledge গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ইসলামে জ্ঞান কখনো মূল্যবোধনিরপেক্ষ নয়; বরং তা নৈতিক দায়িত্ব ও সভ্যতা নির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সমগ্র শিক্ষাজীবন এই দর্শনেরই এক বাস্তব প্রতিফলন।
এরপর তিনি নোয়াখালী ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসা-এ ভর্তি হন এবং ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। তিনি ১৯৫৫ সালে দাখিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে আলিম, ১৯৬১ সালে প্রথম বিভাগে ফাজিল এবং সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে কামিল পরীক্ষায়ও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান লাভ করেন। এই ধারাবাহিক সাফল্য তাঁর অসাধারণ মেধা, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং জ্ঞানপিপাসার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে।
তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ কৃতিত্ব আসে এরও আগে। উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামেয়া-ই-আরাবিয়া কুরআনিয়া, লালবাগ-এ দাওরায়ে হাদীসে ভর্তি হন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির মুহতামিম ছিলেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী। তাঁর সৌভাগ্য হয় সে যুগের বরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্যে শিক্ষা গ্রহণের। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হাফেজ্জী হুজুর মাওলানা মুহাম্মদ উল্লাহ, মুফতি আব্দুল মুয়ীজ এবং আল্লামা আজিজুল হক।
এই শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে তিনি শুধু পাঠ্যবিষয়ে পারদর্শী হননি; বরং ইলমের সঙ্গে আমল, নৈতিকতা এবং শিক্ষকসুলভ ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ও অর্জন করেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর ছাত্ররা যে আদর্শিক ও নৈতিক শিক্ষার কথা স্মরণ করেছেন, তার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল এই সময়েই।
১৯৬৪ সালের দাওরায়ে হাদীসে প্রথম স্থান: শিক্ষাজীবনের শীর্ষ অর্জন

১৯৬৪ সালে তিনি দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এটি ছিল তাঁর শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ একাডেমিক সাফল্য এবং তৎকালীন মাদ্রাসা শিক্ষাঙ্গনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি অর্জন।
দাওরায়ে হাদীস ইসলামী উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরগুলোর একটি। এখানে কেবল হাদীস নয়; কুরআন, উসূলুল হাদীস, উসূলুল ফিকহ, ফিকহ, তাফসির, আরবি সাহিত্য, বালাগাত ও যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে গভীর দক্ষতার প্রয়োজন হয়। এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন তাঁর অসাধারণ মেধা, আরবি ভাষায় দখল, হাদীসশাস্ত্রে পারদর্শিতা এবং দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি বহন করে।
এই অর্জন পরবর্তী কর্মজীবনের ভিত্তি রচনা করে। পরবর্তীকালে তিনি যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকতা, প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অসামান্য অবদান রাখেন, তার পেছনে ছিল এই সুদৃঢ় শিক্ষাগত ভিত্তি এবং গভীর ইলমি প্রস্তুতি।
কর্মজীবনের সূচনা: ইলম থেকে আমলের পথে
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট অত্যন্ত অপছন্দনীয়।”
(সূরা আস-সাফ, ৬১:২–৩)
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্যকে কখনো ব্যক্তিগত গৌরব হিসেবে দেখেননি। বরং অর্জিত ইলমকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর দৃঢ় প্রত্যয় থেকেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর জ্ঞানে নয়, সেই জ্ঞানের মাধ্যমে কতজন মানুষ গড়ে তুলতে পেরেছেন—সেখানে।
শাহজাদপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা

১৯৬৫ সালে নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শাহজাদপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনের প্রথম অধ্যায়।
সে সময় গ্রামীণ জনপদে দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত আলেম-শিক্ষকের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। ফলে একজন মেধাবী দাওরায়ে হাদীস-স্নাতকের শিক্ষক হিসেবে যোগদান স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে নতুন প্রাণসঞ্চার করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর গভীর পাঠদক্ষতা, সহজ-সরল উপস্থাপনা, শৃঙ্খলাবোধ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক আচরণ তাঁকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থাভাজন করে তোলে।
তিনি পাঠদানকে কেবল পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শিক্ষার্থীদের চরিত্র, নৈতিকতা ও আত্মশৃঙ্খলা গঠনের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর শিক্ষাদর্শের যে বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়, তার ভিত্তি এই সময়েই রচিত হয়।
নোয়াখালী ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষক

১৯৬৬ সালে তাঁকে নোয়াখালী ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এটি ছিল তাঁর পাণ্ডিত্য, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষক হিসেবে সুনামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
এই প্রতিষ্ঠানে তিনি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের পাঠদান করলেও তাঁর প্রভাব শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি অতিক্রম করেছিল। তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ভাষার সৌন্দর্য, ইসলামী জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য এবং গবেষণামনস্কতার প্রতি উৎসাহিত করতেন।
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রহ.) ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এর কিতাবুল ইলম-এ শিক্ষকতার মর্যাদা সম্পর্কে উল্লেখ করেন যে, মানুষের হৃদয় ও চরিত্র গঠনের কাজে নিয়োজিত হওয়াই শিক্ষকের সর্বোচ্চ সম্মান। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) তাঁর শিক্ষকতা জীবনে এই আদর্শকেই ধারণ করেছিলেন।
পাবনার পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস
১৯৬৮ সালে তিনি পাবনার পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। নিজ জেলা নোয়াখালী থেকে অনেক দূরে গিয়ে শিক্ষকতা করার সিদ্ধান্ত তাঁর জ্ঞান প্রচারের আন্তরিকতা ও পেশাগত নিষ্ঠারই বহিঃপ্রকাশ।
হাদীসশাস্ত্রের শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল পাঠ্যবিষয় ব্যাখ্যা করতেন না; বরং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ, নৈতিকতা এবং সুন্নাহভিত্তিক জীবনবোধ শিক্ষার্থীদের অন্তরে ধারণ করানোর চেষ্টা করতেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
তাঁর অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা, গবেষণা এবং দ্বীনি খেদমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর মাধ্যমে তাঁর শিক্ষার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তৃত হতে থাকে।
স্বাধীনতার পর এক ভিন্ন অধ্যায়
কিন্তু ব্যবসা তাঁর জীবনের স্থায়ী পথ হয়ে ওঠেনি। শৈশব থেকেই পিতার নিকট তিনি যে শিক্ষা লাভ করেছিলেন—অর্জিত ইলমকে দ্বীনের খেদমতে ব্যয় করতে হবে—তা তাঁর জীবনের সিদ্ধান্তে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। আর্থিকভাবে অধিক লাভজনক পেশায় স্থায়ী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে আসেন।
এই প্রত্যাবর্তন ছিল কেবল পেশা পরিবর্তন নয়; বরং তাঁর জীবনের আদর্শিক অবস্থানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্পদ মানুষের জীবনকে স্বচ্ছল করতে পারে; কিন্তু জ্ঞানই সমাজকে আলোকিত করে।
তা’মিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় অবদান
১৯৭৫ সালে তিনি ঢাকার তা’মিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৭৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিষ্ঠানটি তখন বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। এই সময়ে তিনি একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় এবং শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যদিও তাঁর কর্মকাল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ছিল, তবুও প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক একাডেমিক ভিত্তি সুসংহত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে।
একটি নবীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক সময়ে দক্ষ শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেই সময়েই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসনিক ধারা এবং আদর্শিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) এই দায়িত্ব নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পালন করেছিলেন।
জামেয়া-ই-কাসেমিয়া, নরসিংদী: একজন নীরব স্থপতির নির্মাণগাঁথা
১৯৭৬ সালের ১ জুলাই মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী জামেয়া–ই–কাসেমিয়া–এ আরবি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময়—১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত—তিনি এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা, প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠান গঠনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায় শুধু একজন শিক্ষকের নয়; বরং একজন দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান–নির্মাতার পরিচয় বহন করে।
জামেয়া–ই–কাসেমিয়ার প্রতিষ্ঠাকাল ছিল সংগ্রাম, সীমিত সামর্থ্য এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময়। একটি নবীন শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে যেমন দক্ষ প্রশাসনের প্রয়োজন হয়, তেমনি প্রয়োজন আদর্শবান শিক্ষক, সুসংগঠিত শিক্ষা–পরিবেশ এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) এই তিনটি ক্ষেত্রেই অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের অন্যতম হিসেবে তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং শিক্ষা–ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন, শিক্ষকদের সমন্বয়, ছাত্রদের শৃঙ্খলা, আবাসিক ব্যবস্থাপনা, একাডেমিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই তাঁর বিচক্ষণতা ও কর্মদক্ষতার পরিচয় ফুটে ওঠে।
এই বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং জামেয়া–ই–কাসেমিয়ার সাবেক সহকারী অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ সোলায়মান আল–আজহারী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন—
“জামেয়া কাসেমিয়ার প্রতিষ্ঠালগ্নে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ পরিচালনা এবং ছাত্রদের আদর্শিক ও নৈতিক বিনির্মাণের গুরুদায়িত্ব বহন করেছিলেন মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং আন্তরিক নিষ্ঠার মাধ্যমে জামেয়ার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিলেন। তিনি যদি সূচনালগ্নে এভাবে আত্মনিয়োগ না করতেন, তাহলে আজ হয়তো প্রতিষ্ঠানটিকে এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে দেখতে পাওয়া যেত না। জামেয়া–ই–কাসেমিয়ার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও ঐতিহ্য নির্মাণে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য ও চিরস্মরণীয়।“
এই মূল্যায়ন কেবল একজন সহকর্মীর ব্যক্তিগত অভিমত নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের সূচনাপর্বে তাঁর বাস্তব অবদানের সাক্ষ্য বহন করে।
প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন অধ্যক্ষ মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরীও প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন দক্ষ শিক্ষকই ছিলেন না; বরং প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
একজন শিক্ষাপ্রশাসকের প্রকৃত সাফল্য তাঁর পদবিতে নয়; বরং তাঁর রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে নিহিত থাকে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী হলেও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল সমাজকে আলোকিত করে। তাই তিনি ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠার চেয়ে প্রতিষ্ঠান–প্রতিষ্ঠাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তাঁর প্রশাসনিক নেতৃত্বের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—
- দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ;
- শিক্ষা ও শৃঙ্খলার সমন্বিত পরিবেশ সৃষ্টি;
- শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠা;
- প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা;
- মানবসম্পদ গঠনে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান;
- প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বয়েই তিনি জামেয়া–ই–কাসেমিয়াকে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং আদর্শ মানুষ গঠনের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক বছরগুলোই তার ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণ করে। সেই অর্থে জামেয়া–ই–কাসেমিয়ার বিকাশের ইতিহাসে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নাম অন্যতম ভিত্তিনির্মাতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, দূরদর্শিতা এবং নীরব আত্মত্যাগ প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক শক্তিকে সুদৃঢ় করেছিল এবং পরবর্তী অগ্রযাত্রার ভিত্তি রচনা করেছিল।
এই সময়েই তাঁর মধ্যে যে প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং মানুষ গড়ার দর্শনের পূর্ণ বিকাশ ঘটে, পরবর্তী সময়ে ফেনীর আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার আরও পরিণত ও সফল প্রয়োগ দেখা যায়।
আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা: নেতৃত্বের পূর্ণ বিকাশ
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সর্বাধিক পরিণত প্রকাশ ঘটে ফেনীর আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা-তে। তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায় কেবল একজন শিক্ষকের নয়; বরং একজন দূরদর্শী শিক্ষানায়ক, দক্ষ প্রশাসক এবং প্রতিষ্ঠান-নির্মাতার উজ্জ্বল পরিচয় বহন করে।
১৯৮৭ সালে ফেনী জেলার বিশিষ্ট আলেম ও রাজনীতিবীদ মাওলানা বদরুদ্দোজা সাহেবের অনুরোধে তিনি ফেনীতে আগমন করেন এবং আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের আস্থা অর্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি ৩১ মার্চ ২০০৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির নিয়মিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁকে আরও প্রায় ১ (এক) বছর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল কেবল একটি চাকরির নয়; বরং একটি আদর্শ ও দায়িত্ববোধের সম্পর্ক।
একটি প্রতিষ্ঠানের রূপান্তরের ইতিহাস
অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া ছিল বিকাশমান একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ এবং একাডেমিক সম্প্রসারণের নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে একাডেমিক উৎকর্ষের পথে এগিয়ে যায়।
তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি দাখিল স্তরের স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীকালে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে আলিম, ফাজিল এবং কামিল শ্রেণির অনুমোদন অর্জন করে। এর ফলে আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এটি কেবল প্রশাসনিক সাফল্য ছিল না; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা-পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।
নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) বিশ্বাস করতেন, একটি শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানের উন্নতি কেবল ভবন নির্মাণ বা শিক্ষার্থী বৃদ্ধির মাধ্যমে হয় না; এর জন্য প্রয়োজন আদর্শবান শিক্ষক, সুশৃঙ্খল পরিবেশ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি—
- পাঠদানের মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেন;
- শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলেন;
- ছাত্রদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আত্মনির্ভরশীলতার ওপর জোর দেন;
- অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখেন;
- প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নয়, শিক্ষা–পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে।
সহকর্মীর মূল্যায়ন
তাঁর অবদান সম্পর্কে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা ফারুক আহমাদ বলেন—
“মানুষ গড়ার জন্য আজকের শিক্ষকেরা যে চেষ্টা করেন, সে ক্ষেত্রে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) ছিলেন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরলস পরিশ্রম করতেন। এর বিনিময়ে কী পাবেন, সে চিন্তা কখনো তাঁকে স্পর্শ করেনি। ফালাহিয়া মাদ্রাসার দাখিল থেকে কামিল শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদন লাভে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য তিনি সার্বক্ষণিক কাজ করেছেন।“
এই মূল্যায়ন থেকে স্পষ্ট হয়, তিনি প্রশাসক হিসেবে কেবল দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেননি; বরং প্রতিষ্ঠানকে নিজের জীবনের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
মানুষ গড়ার শিক্ষাদর্শ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৫০২৭)
এই হাদিসের আলোকে তিনি শিক্ষকতাকে ইবাদত এবং মানুষ গঠনকে জীবনের প্রধান মিশন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাঁর বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং পেশাজীবী অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের সাফল্যের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে একজন শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
কর্মজীবনের এক গৌরবময় অধ্যায়
তাঁর নেতৃত্বে ফালাহিয়া কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়নি; বরং এটি আদর্শ, নৈতিকতা এবং শিক্ষা-উৎকর্ষের একটি স্বীকৃত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা এবং দূরদর্শিতা আজও প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
মানুষ গড়ার অদম্য প্রয়াস
নারী শিক্ষায় অবদান
২০০৬ সালে তিনি ফেনী মহিলা (দাখিল) মাদ্রাসা-এর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি শিক্ষিত সমাজ গঠনে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা, পাঠদানের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতেন এবং অভিভাবকদের মাঝেও নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতেন।
ফেনী মডেল (দাখিল) মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা
২০০৭ সালে জনাব আবু ইউসুফের পরামর্শে তিনি ফেনী রেসিডেন্সিয়াল মডেল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ফেনী মডেল (দাখিল) মাদ্রাসা নামে পরিচিতি লাভ করে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে নতুন একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর অদম্য কর্মস্পৃহা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার পরিচায়ক। অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলার জন্য সুনাম অর্জন করে এবং বর্তমানে ফেনীর অন্যতম পরিচিত মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে।
ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা
তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক সাহিত্যসভা, মাসিক দেয়ালিকা প্রকাশ এবং ইসলামী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু হয়। বিশেষ করে জামেয়া-ই-কাসেমিয়া, নরসিংদীতে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলামী সাংস্কৃতিক চর্চার যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে বহু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নতুন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গঠনে অনুপ্রেরণা
কর্মজীবনের মূল্যায়ন
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর দীর্ঘ কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়—
- শিক্ষা ছিল তাঁর জীবনব্যাপী সাধনা।
- মানুষ গঠনকে তিনি শিক্ষা–কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
- ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার চেয়ে প্রতিষ্ঠান গঠনকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
- প্রচারের পরিবর্তে নীরব কর্মকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
- শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।
- অবসর গ্রহণের পরও শিক্ষা বিস্তারের কাজে সক্রিয় থেকেছেন।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাঁকে একজন সফল শিক্ষক, দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসক এবং দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান–নির্মাতা হিসেবে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
পারিবারিক জীবন
পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, দায়িত্বশীল ও স্নেহপরায়ণ। শিক্ষকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি সন্তানদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও দ্বীনি অনুশাসনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি আদর্শ পরিবারই একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি।
তাঁর তিন পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে। সন্তানদের শিক্ষাজীবনেও তিনি জ্ঞান, চরিত্র ও নৈতিকতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
জনকল্যাণ ও সামাজিক ভূমিকা
মানুষ তাঁর কাছে সহজেই আসতে পারত। ব্যক্তিগত সমস্যায় পরামর্শ, শিক্ষা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা সামাজিক বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত মতামতের জন্য অনেকেই তাঁর শরণাপন্ন হতেন। বিনয়, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য তিনি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।
জ্ঞানান্বেষণ ও ভ্রমণ
জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল আজীবন। ১৯৭৮ সালে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন এবং জীবনের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা অঞ্চলে ভ্রমণ করে আলেম, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
বয়সের ভার সত্ত্বেও নতুন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং শিক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ অব্যাহত রেখেছিলেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও তিনি বিভিন্ন স্থানে সফর করেছিলেন।
ইন্তিকাল
জীবনের শেষদিকে তিনি পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০১৩ সালের ১৫ জুন, শনিবার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর।
একই দিন বিকেলে ফেনীর আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তাঁর অসংখ্য ছাত্র, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। পরে নিজ জন্মস্থান নোয়াখালীর শ্রীনদ্দি গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাঁর ইন্তিকাল শুধু একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের নয়, বৃহত্তর ইসলামী শিক্ষাঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মূল্যায়ন
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন আমাদের সামনে একজন আদর্শ শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। তিনি ছিলেন জ্ঞানসাধক, দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসক, প্রতিষ্ঠান–নির্মাতা এবং সর্বোপরি একজন মানুষ গড়ার কারিগর।
তাঁর কর্মজীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো সংক্ষেপে—
- শিক্ষাকে আজীবনের ইবাদত ও দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ।
- ব্যক্তি গঠনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অগ্রাধিকার।
- শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বিত চর্চা।
- প্রশাসনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব।
- প্রচারের পরিবর্তে নীরব কর্মের মাধ্যমে সমাজসেবা।
- অবসর–পরবর্তী জীবনেও শিক্ষা বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা।
তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা–প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা–দর্শনই তাঁর জীবনের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
উপসংহার
তিনি সম্পদের উত্তরাধিকার রেখে যাননি; রেখে গেছেন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতার স্মারক নির্মাণ করেননি; নির্মাণ করেছেন আদর্শ মানুষ। ব্যক্তিগত খ্যাতির পেছনে ছুটেননি; বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও শিক্ষার এমন একটি ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার প্রভাব আজও বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও তাঁর অসংখ্য ছাত্রের কর্মে প্রতিফলিত হচ্ছে।
তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর কর্মের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকেন। মানুষের হৃদয়ে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং তাঁর হাতে গড়া প্রজন্মের মধ্যে অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) আজও জীবন্ত।
আল্লাহ তাআলা তাঁর ইলম, খিদমত ও নেক আমল কবুল করুন, তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন এবং তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা ও আদর্শকে আগামী প্রজন্মের জন্য কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে কবুল করুন। আমীন।