স্মৃতিতে একজন আদর্শ শিক্ষাগুরু
মুহাম্মদ মোতাহার হোসাইন
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ ফেনী সরকারি কলেজ, ফেনী || সাবেক শিক্ষার্থী আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী
যখন মাতৃকোড় ছেড়ে প্রথমবারের মতো ঘরের বাইরে পা রাখি, তখন বাড়ির প্রতি, শৈশব-কৈশোরের বন্ধুদের প্রতি, চেনাজানা মাঠ-ঘাটের প্রতি এবং সর্বোপরি মায়ের প্রতি এক অদ্ভুত টান অনুভব করতাম। স্মৃতির পর্দায় বারবার ভেসে উঠত আপনজনদের মুখ। মনে হতো, তারা সবাই আপন আপন আনন্দে দিন কাটাচ্ছে, আর আমি বাড়ির আঙিনা থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে এক নতুন জীবনের পথে যাত্রা শুরু করেছি। সেই যাত্রার গন্তব্য ছিল ফেনীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া।
আমি সেখানে ভর্তি হতে যাওয়ার মাত্র দেড় যুগ আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হলেও অল্প সময়েই শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও সুনামের জন্য সুপরিচিত হয়ে ওঠে। সেই সুনামেই আকৃষ্ট হয়ে আমার অভিভাবক আমাকে সেখানে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রার পেছনে যাঁর অবদান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ছিলেন অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাসেম (রহ.)। শহরের জীবন ছেড়ে নিজ জন্মভূমির নিকটবর্তী এই প্রতিষ্ঠানকে আদর্শ শিক্ষাঙ্গনে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় নিয়েই তিনি এখানে যোগদান করেছিলেন। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন শিক্ষাবিদ এবং দক্ষ প্রশাসক। জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা যেমন শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করত, তেমনি তাঁর স্নেহ ও আন্তরিকতা তাঁদের কাছে তাঁকে আপন করে তুলেছিল।
কিছুদিন আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে আমার দাখিল পরীক্ষার প্রশংসাপত্রটি হাতে আসে। প্রশংসাপত্রে তাঁর স্বাক্ষর দেখে মুহূর্তেই বহুদিনের বিস্মৃত স্মৃতিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমার এক ভগ্নিপতির সঙ্গে প্রথমবারের মতো আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়ায় যাই। ততদিনে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়ে গেছে এবং নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠদানও শুরু হয়ে গেছে। যদিও সকালে পৌঁছেছিলাম, অধ্যক্ষ মহোদয়ের বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাই দুপুর সাড়ে বারোটার পর।
অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশের সময় আমি ছিলাম অত্যন্ত নার্ভাস। গ্রাম থেকে আসা এক সাধারণ ছাত্র হিসেবে মনে হচ্ছিল, এত ছাত্রের ভিড়ে আদৌ ভর্তি হতে পারব কি না। কিন্তু তিনি খুব দ্রুতই আমার মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করেন। স্নেহভরা কণ্ঠে আমাকে আশ্বস্ত করেন এবং সহজ কয়েকটি প্রশ্ন করেন। যেমন—“আমার লাল জামা আছে”—বাক্যটি আরবিতে অনুবাদ করতে বলেন।
এরপর ইংরেজি বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্য তিনি মাহমুদুল হক স্যারকে অফিস থেকে ডেকে পাঠান। তিনি চাইলে নিজেই ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে বিষয়-সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সেই দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই ছোট্ট ঘটনাটিই আমাকে তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অনন্য দিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তিনি পেশাগত সততা রক্ষা করেছেন, একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মানও প্রদর্শন করেছেন। একজন প্রশাসক হিসেবে এটি ছিল তাঁর উন্নত নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
মৌখিক ও লিখিত পরীক্ষা শেষে তিনি আমার অভিভাবককে ডেকে আমার পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চান। এরপর স্নেহভরে বলেন, “ও একটু ভয় পাচ্ছে। সমস্যা নেই, আমি অফিসকে বলে দিচ্ছি, ওকে ভর্তি করে নেবে।”
তাঁর এই কথাগুলো শুনে যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব দুশ্চিন্তা মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম এবং মনে মনে হুজুরের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম।
ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি জানতে চাইলেন, আমি কোথায় থাকব। ভগ্নিপতি জানালেন, পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। পরে তাঁকে জানানো হলে যে আমি হোস্টেলে থাকব, তিনি হোস্টেল সুপারকে ডেকে আল-রাজি হলে অধ্যক্ষের কার্যালয়ের নিকটবর্তী একটি আসনের ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করেন। নতুন পরিবেশে একজন নবাগত শিক্ষার্থীর জন্য এটি ছিল একজন অভিভাবকসুলভ শিক্ষকের আন্তরিকতার উজ্জ্বল প্রকাশ।
পরবর্তী সময়ে যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, তিনি আন্তরিকভাবে খোঁজ নিয়েছেন—কেমন আছি, পড়াশোনা কেমন চলছে, ফলাফল কেমন করছি। প্রথম দিন যে স্নেহ ও মমতা পেয়েছিলাম, তা শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। তাঁর ছাত্র হতে পারা এবং আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়ার একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত হওয়া আজও আমার জীবনের অন্যতম গর্ব।
ফালাহিয়া থেকে চলে আসার কিছুদিন পর তিনি ইহজগতের যাত্রা শেষ করেন। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে কবুল করুন।
আজ বহু বছর পর ফিরে তাকিয়ে উপলব্ধি করি, তিনি কেবল একজন দক্ষ প্রশাসক কিংবা বিদ্বান আলেম ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষক। তিনি নিজেই আমার ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই পরবর্তী সময়েও আমার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়মিত জানতে চাইতেন। একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়—তিনি বোধ হয় এমনটি মনে করতেন না। তাঁর কাছে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব ছিল শিক্ষার্থীর অগ্রগতি, বিকাশ ও সাফল্যের প্রতি সমানভাবে দৃষ্টি রাখা। আমার প্রতি তাঁর আন্তরিক অনুসন্ধান ছিল সেই উন্নত নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষকসুলভ মমত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।
আজও তাঁর কথা স্মরণ করলে গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। একজন শিক্ষক কীভাবে জ্ঞান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, মাওলানা আবুল হাসেম (রহ.) ছিলেন তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমার জীবনের স্মৃতিপটে তিনি তাই কেবল একজন অধ্যক্ষ নন, একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
Related Posts
View Allমানুষটি চলে গেছেন, আলোটি রয়ে গেছেঃ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর স্মৃতিতে
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
পিএইচডি গবেষক || মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
মানুষ গড়ার কারিগর: প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম
ফারুক আহমাদ
অধ্যক্ষ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.): একজন প্রকৃত আলিমের জীবন, কর্ম ও উত্তরাধিকার
ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার
নির্বাহী সম্পাদক, দ্বিমাসিক আল মাকতাব, ঢাকা