মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ): একটি কর্মমুখর জীবনের অবসান
আব্দুল মালেক
প্রাক্তন শিক্ষক, আল-জামিয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী
মাওলানা আবুল হাশেম—একটি পরিচিত নাম। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই; চলে গেছেন পরপারে। ফিরবেন না আর কোনোদিন। কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু স্মৃতি, যা আজও আমাদের আলোকিত করে।
১৯৮৫ সাল। তখন আমি ফালাহিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। কোনো এক বিকেলে আমার আবাসিক কক্ষে মাওলানা এ.জি.এম. বদরুদ্দোজ্জার সঙ্গে এলেন মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ)। প্রথম সাক্ষাতেই বুঝতে পারলাম, গুণ ও মানে এক উন্নত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমি কথা বলছি। যা ধারণা করেছিলাম, বাস্তব জীবনেও তাই দেখলাম।
মাওলানা আবুল হাশেম ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলেম, সুদক্ষ প্রশাসক এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার এক অনন্য কারিগর। তাঁর মধ্যে ছিল না কোনো অহংকারবোধ, ছিল না কোনো প্রদর্শনের ইচ্ছা। আত্মপ্রচারে বিমুখ এ মানুষটি কেবল প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ও কল্যাণের কথাই ভাবতেন।
তিনি আসার পরই ফালাহিয়া মাদ্রাসা দাখিল থেকে কামিল শ্রেণি পর্যন্ত মঞ্জুরি লাভ করে। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ার কত বড় কারিগর ছিলেন। আত্মপ্রচারে অনাগ্রহী হওয়ার কারণে তাঁর মহান ব্যক্তিত্বের প্রচার ও প্রকাশ ছিল তুলনামূলক কম।
কোনো ক্লাসের ঘণ্টা গ্যাপ যাওয়া তাঁর কাছে সহনীয় ছিল না। তাই গ্যাপ ঘণ্টায় সুযোগ পেলেই তিনি শিশু শ্রেণি থেকে কামিল শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাস নিতেন। মাদ্রাসা পরিচালনায় তিনি নতুন কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি চালু করেন, যা প্রতিষ্ঠানটিকে আরও গতিশীল ও যুগোপযোগী করে তোলে।
ব্যক্তিগত জীবনে মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ) ছিলেন আলাপপ্রিয়, পরিশ্রমী, সংস্কৃতিমনা, সফরপ্রেমী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। সমমনাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, হাস্যরস সৃষ্টি এবং আনন্দ উপভোগ করে তৃপ্তি লাভ করা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রতি তাঁর ছিল দারুণ আগ্রহ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেই সমমনা কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে হাস্যরসের মাধ্যমে অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন।
দিনের বেলায় তিনি ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক তথা শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ফলে প্রায়ই তাঁকে রাতের বেলায় অফিস করতে হতো। অনেক সময় রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত অফিস করতেন। রাতের কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে আমি দারুর রাজা এতিমখানায় থাকতাম বলে সেখানে এসে কিছুক্ষণ বসতেন। এরপর দেশের রাজনৈতিক অবস্থার সর্বশেষ খোঁজখবর নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে তবেই বাসায় ফিরতেন।
মাদ্রাসার শিক্ষা সফরে তাঁর সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, টেকনাফ, কুমিল্লাসহ দেশের অনেক স্থানে সফর করার সুযোগ হয়েছে। জীবনে বহু শিক্ষা সফর করেছি, কিন্তু তাঁর সঙ্গে শিক্ষা সফরের বৈশিষ্ট্য আমার কাছে ছিল কিছুটা ভিন্ন। তিনি প্রধানত দুটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। প্রথমত, ছাত্ররা যেন শিক্ষা সফর থেকে সবসময় নতুন কিছু শিখতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা যেন আনন্দমুখর পরিবেশে সময় কাটাতে পারে।
ফালাহিয়া মাদ্রাসার ইতিহাসে সর্বপ্রথম শিক্ষা সফর অনুষ্ঠিত হয়েছিল কক্সবাজার-টেকনাফে। সে সফরে আমিও অংশগ্রহণ করেছিলাম। চট্টগ্রাম সিটি গেটের আগে বা পরে কোথাও আমরা ফজরের নামাজ আদায় করি। ফজরের নামাজের পর মাওলানা আবুল হাশেম নিজের সিটে না বসে বাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাস্তার দুই পাশের পাহাড়, নদী, শহর, হাট-বাজারসহ উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো সম্পর্কে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদের দেখাতে লাগলেন। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি যেন তাঁকে স্পর্শই করতে পারেনি। এভাবেই আমরা কক্সবাজারে পৌঁছলাম।
তখনকার সময়ে শিক্ষা সফরে গিয়ে নিজেরাই রান্না করে খাওয়ার নিয়ম ছিল। আমি ছিলাম সফরের ব্যবস্থাপক। লক্ষ্য করলাম, বাস থেকে নেমেই মাওলানা আবুল হাশেম আমাকে সঙ্গে নিয়ে রান্নার স্থান নির্ধারণ, মিঠাপানির ব্যবস্থা, অস্থায়ী বাথরুম তৈরির ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় টুকিটাকি বাজার করাসহ মৌলিক সব কাজে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠলেন।
সৈকত ভ্রমণ ও আনন্দ উপভোগ শেষে সবাই যখন খেতে বসলেন, তখনও তিনি প্রত্যক্ষভাবে সবকিছু তদারকি করতে লাগলেন। কোথাও তাঁর মধ্যে সামান্য ক্লান্তি বা অবসাদের ছাপও দেখা যায়নি। কক্সবাজারের হাশেমিয়া মাদ্রাসায় আমরা রাত্রিযাপন করি। সেখানেও দেখলাম, তিনি প্রত্যেক ছাত্র ও শিক্ষকের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সবাই ঠিকমতো থাকার ও শোয়ার ব্যবস্থা পেয়েছে কি না, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করছেন।
তখন আমি উপলব্ধি করলাম, তিনি সত্যিই একজন অসাধারণ দায়িত্বশীল মানুষ।
এ শিক্ষা সফরে অংশগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন শিক্ষক সর্বজনাব মাওলানা এ.জি.এম. বদরুদ্দোজা, মাওলানা আতিকুল্লাহ, জয়নাল আবেদীন, আবু আহমাদ এবং আবদুল গোফফারানসহ আরও অনেকে। আমার জানামতে, সেটি ছিল অত্যন্ত আনন্দমুখর, তৃপ্তিদায়ক এবং স্মরণীয় একটি শিক্ষা সফর।
একবার আমরা দুজনে পরামর্শ করলাম, জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখতে যাব। সে মোতাবেক মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ) তৎকালীন সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুস সুবহানের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের জন্য দুটি অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করলেন। আমরা দুজনে ঢাকায় মাওলানা আবদুস সুবহান এমপির হোস্টেলে গেলাম টিকিট সংগ্রহ করার জন্য।
পাবনা পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতাকালীন সময় থেকেই মাওলানা আবদুস সুবহান সাহেবের সঙ্গে মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ)’র গভীর পরিচয় ও আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। দীর্ঘদিন পর তাঁদের সাক্ষাৎ হওয়ায় মাওলানা আবদুস সুবহান সাহেব যেভাবে মাওলানা আবুল হাশেম সাহেবকে ভক্তি, শ্রদ্ধা, সম্মান ও আন্তরিক আতিথেয়তার সঙ্গে গ্রহণ করলেন, তা দেখে আমি অভিভূত হলাম। তখন উপলব্ধি করলাম, মাওলানা আবুল হাশেম সত্যিই একজন উচ্চমাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
দুটি টিকিট নিয়ে আমরা জাতীয় সংসদের একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন উপভোগ করলাম।
এভাবেই মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী, মাওলানা জয়নুল আবেদীন, মাওলানা শাহজাহানসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামার নিকট মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিঃ)’র বিশেষ গুরুত্ব ও উচ্চ মর্যাদা ছিল, যা আমি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছি।
পরিশেষে মহান রব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করি—হে আল্লাহ! আপনি মাওলানা আবুল হাশেমের জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। তাঁর কবরের আজাব মাফ করে দিয়ে তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগিচায় পরিণত করুন। তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। তাঁর পরিবার-পরিজনসহ আমাদের সকলকে তাঁর অনুপস্থিতির ব্যথা-বেদনা সহ্য করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
Related Posts
View Allমানুষটি চলে গেছেন, আলোটি রয়ে গেছেঃ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর স্মৃতিতে
মুহাম্মদ ওমর ফারুক
পিএইচডি গবেষক || মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া
মানুষ গড়ার কারিগর: প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম
ফারুক আহমাদ
অধ্যক্ষ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.): একজন প্রকৃত আলিমের জীবন, কর্ম ও উত্তরাধিকার
ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার
নির্বাহী সম্পাদক, দ্বিমাসিক আল মাকতাব, ঢাকা