কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চা: আলেম, শিক্ষা ও দাওয়াহর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

১. ভূমিকা

একসময় জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে মানুষকে বই, শিক্ষক, গ্রন্থাগার বা বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হতো। ইসলামি জ্ঞানচর্চায় শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর কিতাব অধ্যয়ন, শিক্ষকের সান্নিধ্য ও আলেমদের আলোচনা থেকে জ্ঞান অর্জন করতেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে কুরআনের আয়াত, হাদিস, ফিকহি মাসআলা বা ইসলামি বিষয়ের সারসংক্ষেপ জানা সম্ভব।

এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। AI-এর যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভবিষ্যৎ কী হবে? ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তরে আলেমের ভূমিকা কী হবে? AI কি ফতোয়া দিতে পারবে? ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষক কি প্রযুক্তির কাছে গুরুত্ব হারাবেন? দাওয়াহ কি আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে?

এসব প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্ঞান, সত্য, কর্তৃত্ব, নৈতিকতা, দায়িত্ব ও মানবিক প্রজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

২. AI: শুধু প্রযুক্তি নয়, জ্ঞানচর্চার নতুন বাস্তবতা

প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তন জ্ঞানচর্চার ধরন পরিবর্তন করেছে। মুদ্রণযন্ত্র বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ইন্টারনেট তথ্যের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে দিয়েছে। AI এখন মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করছে, লেখা তৈরি করছে, বিশ্লেষণ করছে, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, অনুবাদ করছে, গবেষণার কাঠামো সাজাচ্ছে এবং দীর্ঘ লেখা সংক্ষেপ করছে।

Generative AI ও ChatGPT-এর মতো Large Language Model বা LLM এই পরিবর্তনকে আরও গভীর করেছে। তবে শক্তিশালী প্রযুক্তি মানেই নির্ভুল প্রযুক্তি নয়। AI-এর উত্তর অনেক সময় সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী হলেও তা ভুল হতে পারে।

এখানে মূল সতর্কতা হলো, সুন্দরভাবে বলা কোনো কথা সবসময় সত্য নয়। ইসলামি জ্ঞানচর্চায় এই সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. তথ্যের যুগ থেকে জ্ঞানের যুগ—নাকি বিভ্রান্তির যুগ?

তথ্যের প্রাচুর্য জ্ঞানের প্রাচুর্যের নিশ্চয়তা নয়। একজন শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডে হাজারো তথ্য পেলেও সে হয়তো জানে না কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, তথ্যের উৎস কী, বক্তব্যটি কোন প্রেক্ষাপটে দেওয়া হয়েছে এবং একই বিষয়ে ভিন্ন মত কেন রয়েছে।

তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তথ্য হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে উপাত্ত বা বিবরণ। জ্ঞান হলো তথ্যকে বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং সুসংবদ্ধ কাঠামোয় স্থাপন করা। আর প্রজ্ঞা হলো সঠিক জ্ঞানকে সঠিক সময়, প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা।

AI তথ্যের ক্ষেত্রে শক্তিশালী হলেও ইসলামি জ্ঞানচর্চার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়। ইসলামে জ্ঞান চরিত্র, দায়িত্ব, আমল এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বোঝার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই মনে রাখতে হবে, তথ্যের প্রাচুর্য জ্ঞানের নিশ্চয়তা নয় এবং জ্ঞান থাকলেই প্রজ্ঞা আসে না। AI তথ্যের দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু তথ্যকে জ্ঞানে এবং জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় রূপান্তরের দায়িত্ব মানুষের।

৪. মানুষ যখন ধর্মীয় প্রশ্ন নিয়ে AI-এর কাছে যায়

বর্তমানে অনেকে AI ব্যবহার করে কুরআনের আয়াতের অর্থ, হাদিসের ব্যাখ্যা, ফিকহি মাসআলা, ব্যক্তিগত জীবনের ধর্মীয় সমস্যা এবং জটিল ইসলামি বিষয়ের সারসংক্ষেপ জানতে চাইছেন। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে এই ব্যবহার আরও বাড়বে।

AI-এর ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে। এটি জটিল বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে, বিভিন্ন ভাষায় ইসলামি বিষয় উপস্থাপন করতে পারে, গবেষণার প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে এবং কোনো বিষয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। AI একটি উত্তর তৈরি করে। অন্যদিকে একজন আলেম জ্ঞান, উৎস, ঐতিহ্য, প্রেক্ষাপট, নীতি ও দায়িত্বের আলোকে মতামত দেন। তাই AI-এর উত্তর এবং যোগ্য আলেমের ধর্মীয় ব্যাখ্যা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য না বুঝলে ধর্মীয় বিভ্রান্তির ঝুঁকি বাড়বে।

৫. AI কি ফতোয়া দিতে পারবে?

প্রযুক্তিগতভাবে AI ফিকহি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে পারে। কিন্তু উত্তর তৈরি করা এবং ফতোয়া দেওয়া এক বিষয় নয়।

ফতোয়া বা শরিয়াহভিত্তিক সিদ্ধান্তের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান, আরবি ভাষায় দক্ষতা, উসূলুল ফিকহের জ্ঞান, ফিকহি মতামত ও মতভেদের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা, প্রশ্নকারীর বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, সমাজ ও সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনা, মাকাসিদুশ শরিয়াহর উপলব্ধি এবং নৈতিক জবাবদিহি প্রয়োজন হতে পারে।

AI-এর ব্যক্তিগত নৈতিক দায়িত্ব, তাকওয়া, বিবেক বা ব্যক্তিগত জবাবদিহি নেই। AI ভুল করতে পারে, কিন্তু নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয় না। একজন আলেম বা মুফতি জ্ঞান ও নৈতিক দায়িত্ব—উভয়ের অধীন থাকেন।

তাই বাস্তবসম্মত নীতি হওয়া উচিত: AI গবেষণা সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হবে, মুফতি হিসেবে নয়। AI ফতোয়া গবেষণায় সহায়তা করতে পারে এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য ও মতামতের কাঠামো দিতে পারে। তবে চূড়ান্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত যোগ্য মানুষের কাছেই থাকা উচিত।

৬. AI Hallucination: প্রযুক্তি যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বলে

Generative AI-এর বড় সীমাবদ্ধতা হলো hallucination। AI কখনো বাস্তব ভিত্তিহীন তথ্য তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করা।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে AI ভুলভাবে হাদিসের সূত্র দিতে পারে, অস্তিত্বহীন গ্রন্থের নাম উল্লেখ করতে পারে, কোনো আলেমের নামে ভুল বক্তব্য প্রচার করতে পারে, আয়াতের অর্থ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এবং ফিকহি মতামত বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে পারে।

এ কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন: AI দিয়ে তথ্য তৈরি বা অনুসন্ধান করা যেতে পারে, কিন্তু তা গ্রহণ ও প্রচারের আগে নির্ভরযোগ্য মূল উৎস দিয়ে যাচাই করতে হবে।

বিশেষভাবে কুরআন, হাদিস, আকিদা, ফতোয়া ও শরিয়াহসংক্রান্ত বিষয় যাচাই করা জরুরি।

৭. AI-এর যুগে আলেমের গুরুত্ব কি কমবে?

সাধারণ আশঙ্কা হলো, মানুষ যদি AI-এর কাছ থেকে সব উত্তর পায়, তাহলে আলেমের প্রয়োজন কমে যাবে। বাস্তবে যোগ্য আলেমের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

ভবিষ্যতের বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়; বরং সঠিক তথ্য কোনটি, নির্ভরযোগ্য উৎস কোনটি, একই বিষয়ে ভিন্ন মত কেন, কোন মত কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য এবং বক্তব্যের নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কী—এসব নির্ধারণ করা।

AI বিভিন্ন উত্তর দিতে পারবে। কিন্তু প্রয়োজন হবে উত্তর বোঝার, তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগের।

ভবিষ্যতের আলেম হবেন জ্ঞান ব্যাখ্যার মানুষ, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখানোর মানুষ, উৎস যাচাইয়ের পথপ্রদর্শক এবং নৈতিক সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল পথনির্দেশক।

৮. ভবিষ্যতের আলেম: কিতাবের জ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা

ভবিষ্যতের আলেমকে ঐতিহ্যগত ইসলামি জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তির বাস্তবতাও বুঝতে হবে। তাঁর প্রয়োজন হবে কিতাবের জ্ঞান এবং প্রযুক্তির জ্ঞান—উভয়ই।

একজন ভবিষ্যৎ আলেমের জানা প্রয়োজন AI কীভাবে কাজ করে, AI কোথায় ভুল করতে পারে, AI-generated তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হয়, ডিজিটাল গবেষণা কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, Academic Integrity কী, Privacy কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে কার্যকর দাওয়াহ কীভাবে করা যায়।

প্রত্যেক আলেমকে কম্পিউটার বিজ্ঞানী হতে হবে না। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও ঝুঁকি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ভবিষ্যতের আলেম AI-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন না। তাঁরা AI-কে জ্ঞানের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করবেন।

৯. ইসলামি শিক্ষায় AI: সুযোগের নতুন দরজা

দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করলে ইসলামি শিক্ষায় AI-এর সম্ভাবনা ব্যাপক। শিক্ষক AI-এর সাহায্যে পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন, অনুশীলনী তৈরি করতে পারেন, কঠিন বিষয় সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং বিকল্প শিক্ষণপদ্ধতি খুঁজে পেতে পারেন।

আরবি ভাষা শিক্ষায় AI শব্দভাণ্ডার শেখা, ব্যাকরণ অনুশীলন, বাক্য গঠন, অনুবাদ, কথোপকথন এবং লেখার অনুশীলনে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষার্থী AI-কে ব্যক্তিগত অনুশীলন সহকারী হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।

তবে মূলনীতি হলো, AI শিক্ষককে সহায়তা করবে, শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না।

শিক্ষক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলেন, ভুল সংশোধন করেন, চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং জ্ঞানকে জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। এসব মানবিক দায়িত্ব প্রযুক্তি সম্পূর্ণভাবে পালন করতে পারে না।

১০. ভবিষ্যতের শিক্ষক: তথ্যদাতা নয়, পথপ্রদর্শক

AI-এর যুগে শিক্ষকতার ধারণা পরিবর্তিত হবে। শিক্ষক শুধু তথ্যের প্রধান উৎস থাকবেন না। ভবিষ্যতের শিক্ষক হবেন পরামর্শদাতা, তথ্য-নির্বাচক, যাচাইকারী এবং নৈতিক পথপ্রদর্শক।

শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিহ্নিত করতে শেখাবেন, নির্ভরযোগ্য উৎস বোঝাবেন, মূল উৎসের দিকে পরিচালিত করবেন, AI-এর ভুল শনাক্ত করতে শেখাবেন, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তুলবেন এবং নৈতিক সিদ্ধান্তে সহায়তা করবেন।

AI দ্রুত উত্তর দিতে পারে। শিক্ষক শেখাবেন কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয়। AI তথ্য দিতে পারে। শিক্ষক শেখাবেন কীভাবে তথ্যকে জ্ঞানে পরিণত করতে হয়।

১১. দাওয়াহর নতুন দিগন্ত

দাওয়াহর ক্ষেত্রে AI নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ভাষাগত সীমাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হবে। AI-এর সাহায্যে বক্তব্য বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা, subtitle তৈরি করা, সংক্ষিপ্ত কনটেন্টে রূপান্তর করা এবং শিশু ও তরুণদের উপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করা সম্ভব।

একটি বক্তব্যকে বহুভাষিক শিক্ষামূলক উপকরণে রূপান্তর করা দাওয়াহর জন্য বড় সুযোগ। তবে শুধু মানুষের কাছে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়। সত্য ও নির্ভুলতাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করবে। আর জ্ঞান ও গবেষণা বক্তব্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করবে।

১২. ইসলামি গবেষণায় AI: সহায়ক, কিন্তু গবেষকের বিকল্প নয়

গবেষক AI ব্যবহার করে গবেষণার সম্ভাব্য বিষয় নির্ধারণ, গবেষণা প্রশ্ন তৈরি, literature mapping, ধারণাগত কাঠামো তৈরি, দীর্ঘ লেখা সংক্ষেপ, তথ্য শ্রেণিবিন্যাস, ভাষাগত সম্পাদনা এবং অনুবাদ করতে পারেন।

তবে গবেষণার মূল দায়িত্ব AI-এর ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। গবেষকের দায়িত্ব হলো উৎস যাচাই করা, যুক্তি তৈরি করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা, ভিন্ন মতামত মূল্যায়ন করা এবং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান তৈরি করা।

AI বইয়ের নাম বা reference দিতে পারে। কিন্তু বইটি সত্যিই কী বলেছে এবং referenceটি বাস্তব কি না, তা গবেষককে যাচাই করতে হবে।

AI চিন্তাকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু চিন্তার বিকল্প হতে পারে না।

১৩. Academic Integrity: নতুন যুগের নতুন পরীক্ষা

AI শিক্ষায় সুযোগের পাশাপাশি একাডেমিক সততার নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। AI দিয়ে পুরো assignment তৈরি করে নিজের নামে জমা দিলে শিক্ষার্থী সত্যিই শিখেছে কি না—এ প্রশ্ন থাকে। AI দিয়ে সম্পূর্ণ গবেষণাপত্র তৈরি করে নিজের নামে প্রকাশ করলে বুদ্ধিবৃত্তিক মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

AI ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো।

শিক্ষার্থীদের জানতে হবে কোথায় AI ব্যবহার করা যাবে, কোথায় ব্যবহার করা যাবে না, AI-এর সাহায্য নেওয়ার বিষয়টি কখন উল্লেখ করতে হবে, plagiarism কী, citation কেন প্রয়োজন এবং নিজের চিন্তা ও AI-generated content-এর পার্থক্য কী।

শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য শুধু উত্তর দেওয়া নয়; চিন্তা করতে শেখানো।

১৪. Privacy: সুবিধার আড়ালে যে ঝুঁকি

AI ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্যের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসতর্কভাবে AI প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্য, শিক্ষার্থীর তথ্য, গবেষণার গোপন উপাত্ত, unpublished manuscript, পরীক্ষার প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য এবং সংবেদনশীল গবেষণা-উপাত্ত দেওয়া হতে পারে।

প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দায়িত্বশীল ব্যবহার নয়। AI ব্যবহারে সচেতনতা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

১৫. আমাদের সামনে করণীয়

১৫.১ AI Literacy

আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের AI সম্পর্কে মৌলিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

১৫.২ Digital Islamic Scholarship

প্রামাণ্য ইসলামি গ্রন্থ ও গবেষণার উন্নত ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করতে হবে।

১৫.৩ Source Verification

AI-এর তথ্য যাচাই করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে।

১৫.৪ Human Oversight

গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও নৈতিক সিদ্ধান্তে যোগ্য মানুষের তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে।

১৫.৫ Ethical Framework

ইসলামি মূল্যবোধ, মানবিক মর্যাদা, privacy ও academic integrity-এর আলোকে AI ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

১৫.৬ Interdisciplinary Research

আলেম, ফকিহ, প্রযুক্তিবিদ, AI গবেষক, ভাষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যে যৌথ গবেষণা বাড়াতে হবে।

১৫.৭ AI-সমৃদ্ধ ইসলামি শিক্ষা

প্রযুক্তির সাহায্যে ইসলামি শিক্ষাকে আরও সহজলভ্য, গবেষণাভিত্তিক ও বহুভাষিক করতে হবে।

১৬. শেষ কথা: AI-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়

AI সম্পর্কে দুটি চরম অবস্থান এড়িয়ে চলতে হবে। একটি হলো AI সব সমস্যার সমাধান, অন্যটি হলো AI সম্পূর্ণ বিপজ্জনক, তাই এটি ব্যবহার করা যাবে না।

বাস্তবতা এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি। AI একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। এর ব্যবহার মানুষের কল্যাণ করতে পারে, আবার অপব্যবহারে ক্ষতিও করতে পারে।

মূল প্রশ্ন AI ভালো না খারাপ—এটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, আমরা AI-কে কী উদ্দেশ্যে এবং কী নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবহার করছি।

ইসলামি জ্ঞানচর্চায় AI একই সঙ্গে একটি চ্যালেঞ্জ এবং একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এর চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ভুল তথ্য, hallucination, অগভীর জ্ঞান, plagiarism, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা, privacy এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা। অন্যদিকে এর সুযোগের মধ্যে রয়েছে ইসলামি শিক্ষা বিস্তার, গবেষণা সহায়তা, বহুভাষিক অনুবাদ, দাওয়াহ সম্প্রসারণ এবং প্রামাণ্য জ্ঞান সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের ভূমিকা। AI দ্রুত উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সঠিক প্রশ্ন নির্বাচন করবে কে? সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করবে কে? কোন মত কোন প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য তা নির্ধারণ করবে কে?

এই দায়িত্ব মানুষের, বিশেষ করে আলেম, শিক্ষক, গবেষক ও দাঈদের।

একজন আলেম শুধু তথ্যের ধারক নন; তিনি জ্ঞানের শিক্ষক, ব্যাখ্যাকার, নৈতিক পথপ্রদর্শক এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিভাবক।

ভবিষ্যতের ইসলামি জ্ঞানচর্চার লক্ষ্য হওয়া উচিত AI-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়; বরং AI-কে জ্ঞানের নৈতিক ও মানবিক উদ্দেশ্যের অধীন করা।

এর জন্য প্রয়োজন কিতাবের গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং প্রযুক্তির ভাষা বোঝেন—এমন আলেম। প্রয়োজন এমন শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে AI থাকবে কিন্তু শিক্ষক হারিয়ে যাবেন না। প্রয়োজন এমন দাওয়াহ, যা প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কিন্তু সত্য, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করবে না।

AI জ্ঞানের দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু কোন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, কোন জ্ঞান গ্রহণ করতে হবে এবং সেই জ্ঞান কীভাবে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে হবে—সে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব মানুষের।

ভবিষ্যতের ইসলামি জ্ঞানচর্চার মূলনীতি

“Technology with Knowledge, Knowledge with Wisdom, and Wisdom with Ethics.”

প্রযুক্তির সঙ্গে জ্ঞান, জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞা এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে নৈতিকতা।

নির্বাচিত পাঠ ও তথ্যসূত্র

UNESCO, Guidance for Generative AI in Education and Research।

UNESCO, Global Education Monitoring Report: Technology in Education—A Tool on Whose Terms?

Stanford Institute for Human-Centered Artificial Intelligence, AI Index Report।

Stuart J. Russell and Peter Norvig, Artificial Intelligence: A Modern Approach।

Luciano Floridi-এর Artificial Intelligence, Information Ethics এবং Philosophy of Information বিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনা।

Artificial Intelligence, Religion and Ethics বিষয়ক সমসাময়িক গবেষণা।

Islamic Jurisprudence and Artificial Intelligence বিষয়ক সমসাময়িক scholarly discussions।

Usul al-Fiqh, Maqasid al-Shariah এবং Contemporary Islamic Jurisprudence বিষয়ক প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ ও গবেষণা।

অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট উদ্বোধন

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি

অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের শুভ উদ্বোধন আগামী ২৬ আগস্ট ২০২৬, বুধবার অনুষ্ঠিত হবে।

📅 তারিখ: ২৬/০৮/২০২৬ ইং
📍 স্থান: হোটেল বেস্ট ইন
🕖 সময়: সন্ধ্যা ৭.০০টা

উক্ত অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের কার্যনির্বাহী পরিষদের সকল সদস্য, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহীদের সাদর উপস্থিতি কামনা করা যাচ্ছে।

আপনাদের আন্তরিক উপস্থিতি আমাদের এই আয়োজনকে সার্থক ও আনন্দময় করে তুলবে।

আমন্ত্রণেঃ
অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশন

মানুষ গড়ার কারিগর: প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম

প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম আর নেই। কথাটা ভাবতেই ব্যথায় ভরে ওঠে মন। এমন কর্মঠ, নিরলস, প্রচারবিমুখ, একনিষ্ঠ জ্ঞানতাপস, মানুষ গড়ার দক্ষ কারিগরকে এতো অল্প সময়ে হারাতে হবে তা ভাবিনি। জ্ঞানচর্চায় এমন অকৃত্রিম ও আন্তরিক শিক্ষাবিদ দুর্লভ। রাসুলের (সাঃ) হাদিসের পূর্ণ অনুসারী ছিলেন শিক্ষাবিদ প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম। রাসুল (সাঃ) হাদিসে বলেন “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন কর”। এ হাদিসের বাস্তব উপলব্ধি দেখেছি তাঁর মাঝে।

স্মরণ হয়, ইসলামী স্কলার, দার্শনিক আল-ফারাবীর কথা। তিনি যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হাসান বসরীকে তাঁকে দেখতে যান। ফারাবী হাসান বসরীকে জিজ্ঞাসা করেন ফারায়েজের একটি মাসয়ালা। হাসান বসরী বলেন, আপনি এখন মুমূর্ষু, রোগাক্রান্ত, ব্যথাতুর। আপনার এখন ফারায়েজ নিয়ে আলোচনা না করলে হয় না?
ফারাবী উত্তর দিয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে আমি আর একটি বিষয় জেনে মারা গেলাম, এটাই তো ভালো। অগত্যা হাসান বসরী আলোচনা করলেন এবং আলোচনা শেষে ফারাবীর বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে শুনতে পেলেন ফারাবী ইন্তেকাল করেছেন।

ফারাবী দর্শনের পূর্ণ অনুসরণকারী দেখেছি প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেমকে। মৃত্যুর কয়েক দিন পূর্বে কসমোপলিটন হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেলাম। সেই চিরচেনা হাসিমাখা মুখ। তিনি উঠে বসতে চাইলেন। না করলাম। মাথায় হাত বুলালাম। দোয়া করলাম। শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিলাম। আমিও আমার ও মাদরাসার, আমার আব্বা-আম্মা ও পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিলেন। এর পরের প্রশ্নই ছিল মাদরাসার পরীক্ষা কবে? সিলেবাস শেষ হয়েছে কিনা? সাথে সাথে মডেল মাদ্রাসার পরীক্ষার বিষয়ে চিন্তিত মনে প্রশ্ন করলেন। এ বিষয়ে ওরা এখনো তাঁকে কিছুই জানায়নি। এবং কেন? আমার সামনেই মডেল মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষককে একই প্রশ্ন। পরীক্ষার তারিখ ঠিক হয়েছে কিনা? রুটিন ছাপানো হয়েছে কিনা? শিক্ষকরা প্রশ্ন জমা দিয়েছেন কিনা? আমি তাঁকে বললাম আপনি এখন অসুস্থ। এ বিষয় নিয়ে চিন্তা করবেন না। শিক্ষক যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ও সুস্থ আছেন, তারা চিন্তা করবে। তিনি স্বভাবগত রাগে বলে উঠলেন, না, হবে না। ভাইস প্রিন্সিপ্যালকে খবর দিন। আমি এই বিষয়টা বুঝিয়ে বলব এবং সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে হবে। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জ্ঞানচর্চা ও সাধনায় নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে ধন্য হয়েছেন। মৃত্যুর একদিন আগেও তিনি মাদ্রাসা কমিটির সভাপতিকে বলেছেন। আমার বাসায় কমিটির মিটিং দিন। মাদ্রাসা সংক্রান্ত বিষয়ে আমি সবকিছু আপনাদের নজরে দিয়ে যেতে চাই।

খুব কাছাকাছি থেকে নিরবিচ্ছিন্ন দশটি বছর কাটিয়েছি। কষ্টকর কোনো অধ্যায় সংযোজিত হয়নি। উনার মৃত্যুর এক বছর আগে বিলম্বিত সংবর্ধনা দেওয়াটা উনাকে নীরবে কষ্ট দিয়েছে। পরোক্ষভাবে এমন কথাটি কানে কানে আমাকে শুনিয়েছেন। যে কোনো কাজে তাঁকে দেখতাম প্রথমে নিজে একটা ছক এঁকে নিতেন। তারপর কর্মপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা। অন্যদেরকে কাজে সম্পৃক্ত করার অদ্ভুত কৌশল। অনুপ্রেরণা দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছার অহর্নিশ প্রচেষ্টা। ব্যর্থতার গ্লানি, অপ্রাপ্তির বেদনা, অতৃপ্তির মলিনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না। নতুন কিছু জানার, নতুন কিছু করার উদ্যম তাঁর মাঝে আমরণ সক্রিয় ছিল।

সতের বছর পূর্বের কথা। আমি তখন চাটখিল আলিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস ছিলাম। ফেনী থেকে তিনি চারবার গিয়েছিলেন আমাকে তাঁর সহকর্মী ভাইস প্রিন্সিপ্যাল করে নিয়ে আসার জন্য। প্রতিবারই তিনি নতুন কৌশলে আমাকে নতুন স্বপ্ন দেখাতেন। এখানে আসলে তিনি আমাকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন। আমরা আল্লাহর রহমতে তাঁর নেক দোয়ায় প্রতিষ্ঠানটি তাঁর দেখা সে স্বপ্নে পৌঁছাতে পেরেছি। পাবলিক পরীক্ষায় সারাদেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে সাত বছর। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হওয়ায় মর্যাদাও আছে। আমি প্রতিবার ফলাফলের পরপরই তাঁকে টেলিফোনে তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন জানাতাম। তিনি খুশি হতেন। দোয়া করতেন মন খুলে।

সহজ-সরল, সাবলীল, অনাড়ম্বর জীবন ছিল তাঁর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অহংকার বলতে কিছুই ছিল না তাঁর জীবনে। শিশু শ্রেণির একজন ছাত্রের কথাও তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। একবার প্রথম শ্রেণির এক ছাত্র আমার রুমে প্রবেশ করল। ভদ্রতা নম্রতাসহ অনুমতি নিয়ে খুব কাছে এসে বলল, টিনসেটে আমাদের খুব গরম লাগে। আমাদের ক্লাসের ছাত্ররা মনে করে, একটা ফ্যান হলে ভালো হয়। ছেলেটিকে নিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। তিনি তার কথা শুনে হাসলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আগামীকালের মধ্যে তোমার ক্লাসে ফ্যান হবে।

শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় যখন হিমসিম খেয়ে যেতাম। শিশু থেকে কামিল পর্যন্ত যে কোনো ক্লাসে বললেই তিনি দৌড়ে যেতেন। তাঁর কাছে আগে ক্লাস, পরে অফিস। কামিল ক্লাসে নিয়মিত একটা ক্লাস নিতেন। কোনোদিন অনিয়মিত পাঁচ-সাতটা ক্লাসও নিতেন। কোনো শিক্ষকের সিলেবাস শেষ না হলে তাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। পরীক্ষার ফলাফল দিতে বিলম্ব হলে তার উপর ভীষণ ক্ষেপে যেতেন। ভালো ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে তাঁর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ছিল। আমরা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পরও কোনো ছাত্রকে তিনি যদি বুঝতেন দুর্বল, আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতেন, মানে না টিকলে বাদ দিতেন।

শিক্ষার পাশাপাশি সহপাঠ্যক্রম বিশেষত ক্রীড়া, সাংস্কৃতি, শিক্ষা সফর এগুলো ছিল তাঁর একটা আনন্দের ব্যাপার। শিক্ষা সফরে তাঁর সহযোগী হয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং রূপসা থেকে পাটুরিয়া গিয়েছি। অন্য কথায় বলা যায়, বাংলাদেশের সকল জেলায় সফর করা সম্ভব হয়েছে। স্মরণীয় এবং মজার ব্যাপার হলো, একবার এক সফরে বিলম্ব হওয়ায় একজন শিক্ষককে হাটহাজারীতে রেখে তিনি চলে আসেন। দায়িত্বশীল একজন শিক্ষককে বিলম্বের কারণে ফেনীতে রেখে তিনি শিক্ষা সফরের গাড়ি চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। একবার সেন্টমার্টিন সফর করলাম। আমাদের অধিকাংশ সফর হতো বুধবার, বৃহস্পতিবার। পরের দিন শুক্রবার প্রতিষ্ঠান বন্ধ। শনিবার পুরোদমে ক্লাসে হবে। সেন্টমার্টিন কেয়ারী সিন্দাবাদে যেতে হয়। হিসাব মিলাতে না পেরে সপ্তাহের মাঝামাঝি সফর করলাম। পরের দিন মাদ্রাসা খোলা। টেকনাফ থেকে সন্ধ্যা সাতটায় গাড়ি ছেড়ে রাত চারটায় ফেনী এলাম। তিনি আমাকে বললেন, আগামীকাল ক্লাস খোলা। সকাল সাড়ে আটটা। আল্লার বান্দাহ যথাসময়ে হাজির। অবাক হলাম, কয়েকজন যুবক শিক্ষক দরখাস্ত দিলেন ছুটির জন্য। আর সবচে বেশি বয়স্ক প্রিন্সিপ্যাল আবুল হাশেম সাহেব সেদিনও আট পিরিয়ড ক্লাস করে আমাকে সহযোগিতা করেছেন।

দিনের বেলায় ক্লাস ও একাডেমিক কাজ বেশি থাকায় সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত তিনি অফিস ফাইলসমূহ গোছানো এবং অন্যান্য কাজে মনোযোগী হতেন। রাতের বেলায় কোনো অভিভাবক এসে কোনো তথ্য চাইলে তিনি হাসিমুখে তা দিয়ে দিতেন। বিরক্ত হতেন না। অফিস সহকারীদেরকেও অনেক সময় তিনি রাতের বেলায় অফিসে আসতে বাধ্য করতেন। আমিতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনেই তাঁর সাথে সাহচর্য দিতে বাধ্য হতাম। রাত দশটায়ও তিনি হাসিমুখে গল্প করতে করতে বাসায় ফিরতেন।

সদা হাসি-খুশি, সদালাপী, সরল বিশ্বাস, উদারমন, নিজের ও পরিবারের ব্যাপারে উদাসীন থেকেই তিলে তিলে তিনি গড়ে তোলেন দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া। এর পূর্বে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়ায়ে কাসেমিয়া নরসিংদী ও তামিরুল মিলাত কামিল মাদ্রাসায়। পাবনার পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদ্রাসা ও নোয়াখালী ইসলামিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল।

ক্ষণজন্মা এই শিক্ষাবিদের মরণে আমরা শোকাহত। অগণিত ওস্তাদের ওস্তাদ। জাতিকে তিনি অনেক শ্রেষ্ঠ সন্তান উপহার দিলেও জাতি তাঁকে বেশি কিছু দিতে পারেনি। আমরা আজ শ্রদ্ধাভরে তাঁকে স্মরণ করি এবং তাঁর পরকালীন মুক্তি কামনা করি।

যাঁদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ

 [লেখাটি ২০০৩ সালে আল–জামেয়াতুল ফালাহিয়া (কামিল) মাদ্রাসার ২৫ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে উৎসব স্মারক-এ প্রকাশিত হয়]

প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় কিছু লোকের ঘাম ঝরানো ও নিঃস্বার্থ ত্যাগ কোরবানীর ইতিহাস থাকে। আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া (কামিল) মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনায় যারা নিঃস্বার্থ ত্যাগ কোরবানীর নজরানা পেশ করে গেছেন অব্যাহতভাবে একান্ত মনের টানে; তাদের মধ্যে কয়েকজনকে গত দু’বছরের ব্যবধানে আমরা হারিয়েছি। ফালাহিয়ায় যখন আমি যোগদান করি তখন ইহা একটি দাখিল মাদরাসা ছিল। এ মাদরাসাকে কামিল স্তরে উন্নীত করার ক্ষেত্রে এদের নিরলস প্রচেষ্টা ছিল স্মরণ করার মত। পঁচিশ বছর পূর্তির এ মুহূর্তে আমরা ফালাহিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। কোন প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে তাদের অবদানের মুল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁদের শ্রমের জন্য যথার্থ জাযায়ে খায়ের দান করুন। ছাত্র-ছাত্রী ও সুধীজনের কাছে হারিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরার লক্ষ্যে এ লেখার অবতারনা করছি।

মরহুম আলহাজ্ব মোঃ ইউনুস

সদা প্রাণবন্ত উচ্ছল উজ্জীবিত এক বাক্তিস্বত্তা আলহাজ্ব মোঃ ইউনুস। কর্ম চাঞ্চল্য, সৎসাহস, পরিশ্রমপ্রিয়তা, সাধনা ও দারুণ দরদীমন ছিল, যার বিশেষণ তেমনি এক ক্ষণজন্মা পুরুষ ১৯৪৫ এর জুনে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার অন্তর্গত চম্পকনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মৌলভী মোঃ আবদুল বারী। মাতা অজিফা বেগম এখনও জীবিত আছেন, বয়স ৯০ বছরেরও অধিক। সে কালজয়ী ব্যক্তির স্মৃতির পাতাগুলো যখন আমি আওড়াতে থাকি, তখন যে শূণ্যতা আমার মনে সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে আমার মনে হল লোকটি নিজের জন্য জন্মেনি বরং পরের জন্য তার জন্য। তাঁর গতিময় জীবনের সোনাঝরা দিনগুলির বিক্ষিপ্ত স্মৃতিগুলো উৎসব স্মারকে তুলে ধরাই আমার ইচ্ছে।

শিক্ষাঃ আলহাজ্ব মোঃ ইউনুস ছোট কাল থেকে অতান্ত মেধাবী ছিলেন। তাঁর শিক্ষা জীবন পার্শ্ববর্তী বল্লভপুর উচ্চবিদ্যালয়ে শুরু। এরপর তিনি চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত মিরসরাই পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন ১৯৬১ ইং সালে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ থেকে আই.এ ও বি.এ পাশ করেন। পারিবারিক কারণে তিনি আর কোন উচ্চ শিক্ষা নিতে পারেননি।

সন্তান-সন্ততিঃ মরহুমের বড় ছেলে আবদুল্লাহ রায়হান। যিনি ২০০১ ইং সালে পাকিস্তানের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ইসলামাবাদ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ মাষ্টার্স পাশ করেন। ছোট ছেলে আবদুল্লাহ রেদওয়ান ঢাকায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে এম, বি এ অধ্যয়নরত। বড় মেয়ে সাবেকা সুলতানা এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সাইন্সে অধ্যয়নরত। মেঝো মেয়ে সুমাইয়া সাদিয়া দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজীতে অনার্স পড়ছে। সেজো মেয়ে নাদিয়া ফারজানা ভিকারুন্নেসা নুন কলেজে এইচ, এস সিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে সামিরা তাসনিয়া একই স্কুলে ১০ম শ্রেণীতে পড়ছে।

আন্দোলনঃ মরহুম আলহাজ্ব মোঃ ইউনুস ১৯৯৯-৭০ ও ৭০-৭১ সালে নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। পরবর্তীতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা ও কর্মপরিষদের সদস্য হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। 

কর্মজীবনঃ শত ঝড়-ঝঞ্জা ও কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বেড়ে এই প্রাণচঞ্চল ব্যক্তি ১৯৭৪ সালে তার কর্মজীবনে পা রাখেন। ১৯৭৮ এর প্রথমদিকে নিজেই রেদওয়ান ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। ব্যবসার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৪ সালে তাকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (CIP) হিসেবে ঘোষণা করেন। ৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের মুসলিম ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন International Business Forum প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝিতে তিনি এ ব্যাংকের Executive Committee এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

সমাজকল্যাণ মূলক কাজঃ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বহু সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন। ফেনী আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলেমীন (ট্রাস্ট) এর চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসার প্রয়োজনে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতেন। ৯৬ ইং সালে কামিল ক্লাশ খোলার পর তার ত্যাগ অনেক বৃদ্ধি পায়। মাদ্রাসা পরিদর্শন করার জন্য তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব এ. টি. এম. শরীফুল্লাহকে নিজ গাড়ীতে করে মাদ্রাসায় নিয়ে আসেন। কামিল মঞ্জুরীর স্বার্থে তিনি একবার আমাকে নিয়ে ডাঃ মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের বাসায় যান। দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন শুধু মাদ্রাসার মঞ্জুরী প্রসংগে। তিনি আমাকে পেলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে প্রায়ই বলতেন, বলুন আমাকে কি করতে হবে? মাদ্রাসার লেখা পড়ার পরিবেশ সুন্দর করা, এবং একটি হোস্টেল নির্মাণে উদ্যোগ গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন একটা ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। কিন্তু আল্লাহ তাকে সে সুযোগ দেননি। তবে নেক নিয়্যাতের জন্য ছাওয়াব অবশ্যই তিনি পাবেন।

মৃত্যুঃ এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ২০০২ সালের ১৭ ই মার্চ রোববার দিবাগত রাত পৌনে ১০টায় ইহলোক ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)। তাঁর মৃত্যু আমাদের সকলকে করেছে ব্যথিত ও শোকাহত। জানি মৃত্যু সকলের জন্য অবধারিত তারপরও তাঁর মৃত্যু আমাকে এবং তাঁর প্রতিটি অনুরাগীকে পাহাড়সম ব্যথায় ব্যথিত করেছে। তার মৃত্যুতে জাতি একজন বলিষ্ঠ শিল্পোদ্যক্তা, সমাজসেবী, তেজোদীপ্ত প্রাণ, কর্মসচেতন ও তৎপর ব্যক্তিকে হারালো। যিনি এ সময়কার প্রতিটি যুবকের জন্য প্রেরণা। আমাদের প্রেরণা দিয়ে তিনি যে মহান আদর্শ তথা কোরআন-হাদীস অধ্যয়নের ভূবন তৈরি করে গেছেন, সে ভূবনে তিনি একজন মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকুক। আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করছি।

মরহুম আলহাজ্ব মাকছুদুর রহমান

যে মহান ব্যক্তির জমিনের উপর মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনি হলেন আলহাজ্ব মাকছুদুর রহমান। মরহুম সুলতান আহমদ (শাস্তি কোং) এর দানকৃত তিন ডিং জমিনের উপর ফেনী ইসলামিয়া এতিমখানা প্রতিষ্ঠার পর, এতিমদের লেখাপড়া করানোর জন্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন কর্তৃপক্ষ। তখন কেউ জমি দিতে রাজি হয়নি। এমতাবস্থায় রামপুর নিবাসী জনাব আবুল খায়ের গং প্রস্তাব দেন মাদ্রাসাটি রামপুরে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি নিজের জমিনের উপর (বর্তমান) মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার সার্বিক সহযোগিতা করেন। মাদ্রাসার মোট জমিনের প্রায় অর্ধেক জমিন তাঁর। মাদ্রাসার সুখে-দুঃখে সবসময় ওতপ্রোতভাবে তিনি জড়িত ছিলেন। ফেরৎ দেবার শর্তে একবার তিনি মাদ্রাসার নামে ৪৮ শতাংশ জমিন দান কবলা রেজিঃ করে দিয়েছেন। ২০০২ সালে তিনি ১,০০,০০০/= (এক লক্ষ টাকা) করজে হাসানা দান করেন। মোট কথা মাদ্রাসার সার্বিক প্রয়োজনে তিনি অতন্দ্রপ্রহরীর মত কাজ করেন। মাদ্রাসার প্রতিটি ইটের গাঁথুনীতে তাঁর ঘাম জড়িত। তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মাদ্রাসা গভর্ণিং বডির সদস্য এবং ট্রাস্টের সদস্য ছিলেন।

তাঁর তিন ছেলে, তিন মেয়ে, স্ত্রীসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে যান। বড় ছেলে মোঃ ইউসুফ, মেঝো ছেলে মোঃ আখতার হোসেন, ছোট ছেলে মীর হোসেন বাবুল। আখতার হোসেন স্নো হোয়াইট দোকানের মালিক এবং ছোট ছেলে সাদিয়া ড্রেস হাউজ পরিচালনা করেন। তিনি ২০০৩ সালের ১৮ ই এপ্রিল রোজ শুক্রবার রাত ৮.১৫ টার সময় ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

মরহুম আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম (বি.এস.সি)

বারাহীপুর নিবাসী জনাব নুরুল ইসলাম বি.এস.সির পিতার নাম মরহুম ছেরু মিয়া। তিনি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে জিবি ও ট্রাস্ট এর সদস্য ছিলেন। আমি অত্র মাদরাসায় ১৯৮৭ সালের ১লা জানুয়ারীতে যোগদেয়ার পূর্বেও যখন ফেনীতে এসেছি তখনও ইসলামী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী, সমাজসেবক এ লোকটিকে ফালাহিয়া অঙ্গণে দেখেছি। তিনি তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন। বড় ছেলে আনওয়ারুল ইসলাম পেশায় একজন বড়মানের ঠিকাদার। মেঝো ছেলে ফখরুল ইসলাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোট ছেলে কামরুল ইসলাম এখনও লেখাপড়া করছে। মেয়েদের সবাই বিবাহিতা। জনাব বি.এস.সি সাহেব বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলনের একজন নিরলস ও একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। দাওয়াতী বই সঙ্গে রাখতেন। সুযোগ পেলেই ইসলামের দাওয়াত দিতেন। বেতন পেয়ে প্রথমে নির্ধারিত অংশ ফি সাবিলিল্লাহ হিসাবে দিতেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলাম, দ্বীন, ধর্ম, ঈমান ও আক্বীদা বিষয়ে মানুষকে বুঝাতেন এবং অত্র প্রতিষ্ঠানের ধারক ও বাহকের ভূমিকা রেখে গেছেন। ২০০৩ সালের ১লা জানুয়ারী ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে তিনি পরপারে আল্লাহর সান্নিদ্ধে চলে গেলেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)।কাজী মোঃ হুমাউন কবির

কাজী মোঃ হুমাউন কবির, পিতা- কাজী মুরহুম আবদুল গফুর, গ্রাম মাইজ বাড়িয়া, ফেনী সদর, ফেনী। তিনি দীর্ঘদিন থেকে আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলেমিন (ট্রাস্ট) এর সভাপতি ছিলেন। ১৯৯০ সালের শেষ পর্যন্ত পদাধিকার বলে গভর্ণিং বডির সভাপতিও ছিলেন। তাঁকে আমি নিকট থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। তাঁর নির্দেশনায় মাদ্রাসার লক্ষ-লক্ষ টাকার কাজ হয়েছে, কিন্তু তিনি কখনো একটি টাকাও নিজ হাতে গণনা করে দেখেন নাই। আমার জানামতে তিনি মাদ্রাসা ফান্ড থেকে কোন সময় একটি পয়সা ধারও নেন নাই। মাদ্রাসার প্রয়োজনে সাধারণ কালেকশান করতেও দ্বিধাবোধ করতেন না। তিনি আমাদের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব আ.ন.ম আবদুজ জাহের সাহেবের শিক্ষক ছিলেন। একবার ফালাহিয়ার কাজে আ.ন.ম আবদুজ জাহের সাহেবের কাছে গেলে তিনি বলেন- আমি ফালাহিয়াকে যতটুকু ভালোবাসি তারচেয়ে বেশী ভালোবাসি হুমায়ুন স্যারকে। এ মহান ব্যক্তিত্ব ২০০৩ সালের মাঝামাঝি সময় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে তিন মেয়ে নাতি-নাতনী ও বহু গুণগ্রাহী রেখে যান। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন।

সৈয়দ মোঃ আবদুর রব

লক্ষীয়ারার বগইড় নিবাসী জনাব সৈয়দ মোঃ আবদুর রব ছিলেন আরেকজন নিঃস্বার্থ সমাজ কর্মী। তিনিও আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি ট্রাস্টের ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে থেকে তার শ্রম নিয়োজিত ছিল এ প্রতিষ্ঠানে গোড়াপত্তনে।

পরিশেষে মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে এদের ছাড়াও আরো যারা বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে এ মাদ্রাসাকে আজকের এ পর্যায়ে আনার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য জাযায়ে খাইর কামনা করছি। আল্লাহর কাছে আরো দোয়া করছি আল্লাহ যেন ইলমে দ্বীনের এ বাগানকে কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখেন। আমাদের নগণ্য খেদমতও কবুল করেন। আমীন। হুম্মা আমীন।

সামাজিক চাহিদা পূরণে মাদ্রাসা শিক্ষা

( লেখাটি ১৯৯৫ সালে আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া (কামিল) মাদ্রাসার বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয়)

সমাজে খোদাভীরু, যোগ্য ও আদর্শ মানুষ গড়ার উদ্দেশ্যে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) যে মহান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে গেছেন, উহাই “মাদ্রাসা শিক্ষা” নামে পরিচিত।

প্রাচীন মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণীদের চারিত্রিক ও আদর্শিক গুণাবলীতে আকৃষ্ট হয়ে, বর্তমান যুগেও মাদ্রাসায় শিক্ষিতরা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সাথে সাথে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখে; দেশের সামাজিক চাহিদা পূরণে যাতে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে পারেন, সে জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় সমন্বিত পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতরা আজ ডিগ্রী নিয়ে শুধু মাদ্রাসায় শিক্ষকতা বা মসজিদের ইমামতির দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নন। দেশের আর্থ-সামাজিক চাহিদা পূরণে এবং রাজনৈতিক ও আর্থনৈতিক অঙ্গনেও নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যোগ্যতা ও সততার সহিত পালন করছেন। সরকার একটু আন্তরিক হলে, মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষার্থীগণ আরো অধিক হারে যোগ্যতা ও সততার পরিচয় দিতে পারেন। এ বিষয় পর্যালোচনার উদ্দেশ্যেই এ নিবন্ধের অবতারণা।

উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা

মুসলমানগণ ভারত বর্ষে আগমনের সাথে সাথে এতদঞ্চলে শিক্ষার আলোও নিয়ে আসেন। তারা মসজিদ মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে কোরআন-হাদীসের আলোকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান লাখেরাজ, ওয়াকফ, হেবা সম্পত্তি এবং সরকারী সাহায্যে পরিচালিত হতো। মাক্স মুলারের এক সরকারী রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ইংরেজ শাসনের পূর্বে একমাত্র বাংলাদেশেই ৮০ হাজার মক্তব ছিল।

ইংরেজ আমলে মাদ্রাসা শিক্ষা

১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে বাংলার স্বাধীনতাসূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ইংরেজরা মুসলমানদের হেবা, ওয়াক্ফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দেয়। ফলে এদেশের প্রচলিত মক্তব ও মাদ্রাসাগুলি বিলুপ্ত অথবা ধর্মনিরপেক্ষ স্কুলে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এ সম্পর্কে এডাম শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায় যে, এদেশের বৃটিশ রাজত্ব কায়েমের পর ইংরেজরা মুসলিম শাসনামলে প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ফারসী ও আরবী ভাষার পরিবর্তে ইংরেজী ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে চালু করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় একলক্ষ মাদ্রাসা ধ্বংস করে দেয়; যাতে রাজ্যহারা মুসলমানদেরকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও ধর্মীয় দিক থেকে পঙ্গু করা যায়। এহেন ষড়যন্ত্রমূলক কাজের ফলে ঐ সময় শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সাত লক্ষাধিক মুসলমান চাকুরী হারিয়ে বেকার হয়ে যায়। এভাবে ইংরেজ শাসনামলে মুসলমানদেরকে দাবিয়ে রাখার জন্য ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের নামে এমন এক শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করে, যার অভিশাপ থেকে আজও মুসলমানগণ মুক্তি পায়নি।

পাক আমলে মাদ্রাসা শিক্ষা

বলা বাহুল্য, দেশ বিভাগের পর হতে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার ও উন্নতির নামে প্রায়ই কোন না কোন কমিটি কমিশন গঠিত হতে থাকে। মাদ্রাসার সমস্যা সমাধান, মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নতি ও আধুনিকায়নের নামে সভা-সমিতি করণ, কমিটি-কমিশন গঠন তখন রীতিমত একটা রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। মাদ্রাসায় উন্নয়ন বরাদ্ধ বলতে সে সময় কোন স্বতন্ত্র বরাদ্দ ছিলনা। জীবিকার জন্য শিক্ষকদেরকে সমাজের ধনী ব্যক্তিদের দান সাদকার উপর নির্ভর করতে হতো।

বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৮ ইং সালে মরহুম জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাতীয় মর্যাদা দিয়ে, পূর্ব গঠিত বিভিন্ন কমিটি কমিশনের সুপারিশমালার আলোকে মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়া হয়। তখন থেকে এ পর্যন্ত মাদ্রাসা শিক্ষার অগ্রগতির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে দেয়া হলো

১. ১৯৭৯ ইং সালে “বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড” নামে স্বায়ত্বশাসিত বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মাদ্রাসায় প্রবর্তন করার লক্ষ্যে, বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু সংখ্যক মাদ্রাসা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

৩. দাখিল আলিম উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়।

৪. ১৯৮২ ইং সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

৫. সাধারণ শিক্ষার ন্যায় মাদ্রাসা শিক্ষাকেও ৫টি স্তরে বিন্যাস করা হয়।

(ক) ইবতেদায়ী (প্রাথমিক স্তর) ১ম-৫ম শ্রেণী পর্যন্ত- ৫ বৎসর।

(খ) দাখিল (মাধ্যমিক স্তর) ৬ষ্ঠ-দশম শ্রেণী পর্যন্ত-৫ বৎসর।

(গ) আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর)- ২ বৎসর।

(ঘ) ফাজিল (স্নাতক স্তর)- ২ বৎসর (প্রস্তাবিত)।

(৩) কামিল (আতকোত্তর স্তর)-২ বৎসর (প্রস্তাবিত)।

এভাবে তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যায় যে, মাদ্রাসা শিক্ষা এখন ভিন্ন কোন শিক্ষা নয়, বরং ইহা একটি জাতীয় শিক্ষা হিসাবে পরিগণিত। একটি জাতীয় শিক্ষার পাঠ্যসূচীতে যে মৌলিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত, তার সব কিছু এ শিক্ষায় আছে। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা গণমুখী শিক্ষা হওয়ায় একদিকে যেমন মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ছে তেমনি ছাত্র সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে সরকার ১৯৮০-৮১ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এ সময় সরকার বেসরকারী স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূরিকরণের লক্ষ্যে একটি অভিন্ন বেতন স্কেল প্রবর্তন করেন। যার ৫০% (পঞ্চাশ শতাংশ) ১৯৮০ সালের ১লা জানুয়ারী থেকে দিতে থাকেন। এই অভিন্ন বেতন স্কেল প্রবর্তন মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা। কেননা এই প্রথমবার মাদ্রাসা শিক্ষা দেশের সাধারণ শিক্ষার সমমর্যাদা লাভ করে। বর্তমানে সরকার ৮০% বেতন, মহার্ঘভাতা ছাড়াও ২৫০ টাকা হারে বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা দিচ্ছেন। সরকার ১৯৯৪ ইং সালে জুলাই মাস থেকে টাইম স্কেল প্রবর্তন করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। আশা করা যায়, জাতীয় প্রয়োজনে মাদ্রাসা শিক্ষার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং অদূর ভবিষ্যতে মুসলিম শাসনামলের গৌরবোজ্জল মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাই পুনরায় এদেশের জাতীয় শিক্ষা হিসাবে বিবেচিত হবে। মাদ্রাসা শিক্ষার সফলতা সুদূর প্রসারী ও তা ৎপর্যপূর্ণ। নিম্নে এব্যাপারে আলোকপাত করা গেল।

নিরক্ষরতা দুরিকরণ

আলেম সমাজ কুরআন-হাদীসের শিক্ষা সম্পর্কিত বাণীতে অনুপ্রাণিত হয়ে, যুগ যুগ ধরে সমাজে শিশু-কিশোরদেরকে মসজিদ, মক্তব ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসার মাধ্যমে কুরআন পঠনসহ মাসলা-মাসায়েল, হিসাব-নিকাশ ও বাংলা অক্ষর জ্ঞান নিঃস্বার্থভাবে শিক্ষা দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি এক জরীপে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় দু’লক্ষ মসজিদে প্রায় ৪ লক্ষ ইমাম ও মোয়াজ্জিন মসজিদ ভিত্তিক মক্তবের মাধ্যমে কুরআনের অক্ষর জ্ঞন ও মাসয়ালা মাসায়েল শিক্ষা দিয়ে আসছেন। আর এক জরীপে দেখা যায় যে, এ অঞ্চলে ছোট-বড় প্রায় ৮০ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা রয়েছে। তন্মধ্যে মাত্র ১৪ হাজার সরকারের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এই ১৪ হাজার ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশী। যারা নিরলসভাবে ছাত্রদেরকে প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের প্রাথমিক স্কুলে গমনোপযোগী ৩০% ছাত্র-ছাত্রী বিদ্যালয়ে যাচ্ছেনা। তাছাড়া সমসংখ্যক শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে স্থান সংকুলান ও আসবাবপত্রের অভাবে বা দারীদ্রতার কারণে করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় মসজিদ কেন্দ্রীক মক্তব ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসার গুরুত্ব দেশ ও সমাজের নিকট অপরিসীম।

শান্তি-শৃংখলা রক্ষা

যুগ-যুগ ধরে আলেম সমাজ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের শান্তি-শৃংখলা রক্ষার্থে কাজ করার ইতিহাস সর্বজন স্বীকৃত। বর্তমানে তাঁরা নিম্নপদ্ধতিতে কাজ করে যাচ্ছেনঃ

১. অজ্ঞ ও ধর্মবিমুখদেরকে কুরআন-হাদীসের বাণী প্রচারের মাধ্যমে ধর্মপরায়ণ করা।

২. কেহ যেন নৈতিকতা বিরোধী কাজে লিপ্ত না হয়, ইসলামের বাণী অবহিত করায়ে সচেতন করা।

৩. সমাজের ঝগড়া-বিবাদ, কলহ-কোন্দল মেটানোর কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।

৪. ইসলামী জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে সমাজের যাবতীয় কুসংস্কার দূরীভূত করা।

৫. সমাজের মধ্যে নাগরিক সচেতনতা জাগ্রত করা এবং পরকালের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে, প্রত্যেককে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালনে সচেতন করা।

সামজিক উন্নয়ন

একটি রাষ্ট্র বা জাতীয় উন্নতি ইসলামী শিক্ষা তথা প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যতীত আদৌ সম্ভব নয়। তাই এ যুগ সন্ধিক্ষণে সমাজের অন্যায়-অত্যাচার, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করে সমাজের উন্নয়ন কল্পে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য করে গড়ে তোলা দরকার। আমার কথা হলো -“ইসলামিক ফাউন্ডেশন, “মসজিদ মিশন” ও “মসজিদ সমাজ” মসজিদের ইমাম ও মক্তবের শিক্ষকদেরকে শিশু-শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, হাঁস-মুরগীর খামার, পশু পালন, দাতব্য চিকিৎসালয়, কৃষি, বন ও মৎস্য চাষ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্ব-স্ব কর্মস্থলে প্রেরণ করছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান যারা পল্লী-অঞ্চলের উন্নতি বৃদ্ধি পাবে এতে সন্দেহ নেই।

আর্থিক উন্নয়ন

কর্মহীন শিক্ষা যেমন অবাস্তব, ধর্মহীন শিক্ষা ও ফলদায়ক নয়, বরং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কর্ম ও ধর্ম উভয় পদ্ধতির সমন্বয় করে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠে উহাই বাস্তব শিক্ষা। বর্তমান মাদ্রাসা শিক্ষা এ বাস্তবতার আলোকে গড়ে উঠেছে। ইবনে খালদুন, ইবনে সীনা, ইবনে রুশদ, আল কিন্দি, আল-ফারাবী, আল-গাজ্জালী প্রমুখ দার্শনিক, চিকিৎসক, ঐতিহাসিক ও সমাজতত্ত্ববিদগণ অতীত যুগের মাদ্রাসা শিক্ষা লাভ করেই দেশের উন্নয়নের পথ নির্দেশ দিয়ে গেছেন। বর্তমান যুগেও তা সম্ভব। বর্তমানে দেশের সার্বিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো-

১. শিক্ষকতা: দেশের ১৪ হাজার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবতেদায়ী মাদ্রাসা, সাড়ে পাঁচ হাজার দাখিল মাদ্রাসা, এবং আলিম, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসায় প্রায় দেড় লাখ লোক শিক্ষকতা করছেন। এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ২০ হাজারেরও অধিক ধর্মীয় শিক্ষক এবং ৪৪ হাজারের অধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফাজিল, কামিল পাশ ৫০ হাজারের অধিক শিক্ষক নিয়োজিত থেকে সাধারণ শিক্ষার সাথে সাথে নৈতিক শিক্ষাও দিয়ে যাচ্ছেন। তদুপরি সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় শিক্ষকসহ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও বেশ কিছু সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষা প্রাপ্তরা শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন। উপরন্ত প্রায় ২ লাখ মসজিদে ৪ লাখেরও অধিক ইমাম মোয়াজ্জিন ও প্রায় ৮০ হাজার মক্তবে ১ লাখের অধিক মুয়াল্লিম স্থানীয় জনসাধারণের অনুদানের অনুকুল্যে চাকুরী করে যাচ্ছেন। বেসরকারী তথা কওমী মাদ্রাসায় শিক্ষাদানরত শিক্ষকদের হিসাব উপরোক্ত পরিসংখ্যানের বহির্ভূত।

২. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনঃ মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের একটি অংশ বর্তমানে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনা করে খরচের পর অতিরিক্ত অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। তদুপরি আধুনিক আরবী ও আরবী টাইপ শিখে যারা বিদেশে চাকুরী করছেন এবং চাকুরীলব্ধ টাকা বৈদেশিক মুদ্রাকারে দেশে পাঠাচ্ছেন, তাদের সংখ্যাও কম নয়।

৩. ব্যবসা বাণিজ্যঃ দেশের এক শ্রেণীর আলিম মাদ্রাসা শিক্ষা গ্রহণের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করে সাফল্যের সাথে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের ন্যায়-নীতি ও সততাপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য দেশের আর্থ-সামাজিক চাহিদা পূরণে সহায়ক বিবেচিত হয়ে আসছে। তদুপরি দেশের একশ্রেণীর আলিম ইউনানী, হেকিমী ও হোমিও চিকিৎসায় নিয়োজিত থেকে জনসেবার সাথে-সাথে নিজেরাও সচ্ছল অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। তবে সরকারী চাকুরীতে এদের সংখ্যা এখনও কম। অল্পে তুষ্টি তাঁদেরকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছে।

সুপারিশমালা

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো জোরদার এবং উন্নয়নমুখী করার লক্ষ্যে নিয়ে কতেক মুসুপারিশ লিপিবদ্ধ করা হলোঃ-

১. মাদ্রাসা শিক্ষার ভিত্তি পৃথক ইবতেদায়ী মাদ্রাসাগুলিকে স্বীকৃতি দান করে শিক্ষকগণকে নিয়মিত সরকারী অনুদান প্রদান এবং ছাত্র-ছাত্রীদেরকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুরূপ বিনামূল্যে বইপত্র সরবরাহ করার ব্যবস্থা নিলে “বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম” বাস্তবায়িত হতে পারে।

২. বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার নানাবিধ বৈষম্য বিরাজমান। উদাহরণ স্বরূপ ইবতেদায়ী ও নিম্নমাধ্যমিক বৃত্তি প্রদানের কথা উল্লেখ করা যায়। সাধারণ শিক্ষায় উক্ত দু’টি বৃত্তি সরকারীভাবে দেয়া হয় কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষায় বেসরকারীভাবে।

৩. মঞ্জুরী প্রদানের সময় মাদ্রাসা বোর্ড যে সব শিক্ষক রাখার শর্ত দিয়া থাকেন, উক্ত সকল শিক্ষককে সরকারী অনুদানের আওতাভুক্ত করা প্রয়োজন।

৪. আলিম শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের মানবিক বিভাগের যাবতীয় বিষয় পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত থাকলেও উক্ত বিষয়ের প্রভাষকদেরকে কোন সরকারী অনুদান দেয়া হয়না। অনুরূপভাবে ফাজিল মাদ্রাসায় ডিগ্রী কলেজের মানবিক শাখার যাবতীয় বিষয় পাঠ্যসূচীর অন্তভুক্ত থাকা সত্ত্বেও মাত্র বাংলা, ইংরেজী বিষয়ের প্রভাষকদ্বয়কে সরকারী বেতন দেয়া হয়। ইসলামের ইতিহাস, রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও অর্থনীতির প্রভাষক রাখা অবশ্য কর্তব্য। প্রভাষকের ব্যবস্থা না করতে পারলে মঞ্জুরী দেবেনা। অথচ সরকার এদেরকে বেতনও দেবেনা। মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে এসব বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করা দরকার।

৫. পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনার জন্য মাদ্রাসা টেক্সট বুক বোর্ড গঠন করে স্বতন্ত্রভাবে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তিদের দ্বারা শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা একান্ত প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে পাঠ্য পুস্তকের দুর্বোধ্যতা ও সংখ্যাধিক্য শিক্ষার্থীদের জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

৬. মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বর্তমানে যে সমস্ত সমস্যায় আছেন তা নিরসন কল্পে আরো বাস্তবধর্মী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে এবং ব্যয়বহুল পাঠ্য তালিকার পরিবর্তন করে মাদ্রাসা শিক্ষার পথ সকলের জন্য উন্মুক্ত করা দরকার।

৭. ফাজিলকে ডিগ্রী এবং কামিলকে এম, এ মান দেয়া উচিত। প্রতি জিলায় সরকারী উদ্যোগে একটি করে ফাজিল মাদ্রাসা এবং বৃহত্তম জিলায় একটি করে পূর্ণাঙ্গ কামিল মাদ্রাসা গড়ে তুলে তাতে আধুনিক যুগ-জিজ্ঞাসা ও চাহিদার আলোকে ইসলামী বিষয় সমূহের উপর গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন।

৮. মাদ্রাসা শিক্ষকদেরকে পাঠদানের আধুনিক পদ্ধতি শিক্ষা দানের লক্ষ্যে প্রতি বিভাগে সরকারী উদ্যোগে একটি করে মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা অত্যাবশ্যক।

৯. ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে এফিলিয়েটিং ক্ষমতা দিয়ে ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসাগুলিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা প্রয়োজন।

১০. দেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা ঘরের অবস্থা ভাল না। আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তদুপরি চাহিদা মোতাবেক বিজ্ঞানাগারও নেই। এ সমস্ত মাদ্রাসায় সরকারী পর্যায়ে উন্নয়নের আওতাভুক্ত করা এবং আসবাবপত্র ও শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।

১১. ইবতেদায়ী থেকে কামিল পর্যন্ত সর্বস্তরের মাদ্রাসাগুলি একটিমাত্র বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। রেডিও-টিভিতে ফল প্রকাশের খবর প্রচারিত হলেও দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ফলাফল ছাপানো হয় না। জিলা প্রশাসকের নিকট কেন্দ্রের ফলাফল আসেনা। টেবুলেশন সীট পেতে কোন-কোন সময় দুই থেকে আড়াই মাস সময় লেগে যায়। দুই, তিন মাস পরেও মার্কসীট পাওয়া যায় না। মূল সনদ পেতে হলে অন্ততঃ ৪/৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়। সাময়িক সনদ আনতে হলে সরকারী নির্ধারিত ফী আদায় করার পরও বিরাটমূল্য ও সময় দিতে হয়। এরূপ প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম, কালক্ষেপন ও অর্থের অপচয় ঘটে। অতএব মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে অন্ততঃ আর একটি মাদ্রাসা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা অতীব প্রয়োজন।

১২. ইবতেদায়ীসহ প্রায় ২০ হাজার মাদ্রাসার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর গঠনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

উপসংহার

উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, “সামাজিক চাহিদা পূরণে মাদ্রাসা শিক্ষা” এদেশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। তবে এ ব্যাপারে সরকারকে অত্যধিক আন্তরিক হতে হবে।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.): একজন প্রকৃত আলিমের জীবন, কর্ম ও উত্তরাধিকার

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁদের জীবদ্দশায় নয়, বরং তাঁদের রেখে যাওয়া জ্ঞান, আদর্শ এবং কর্মের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাঁরা কেবল একটি সময়ের প্রতিনিধি নন; বরং যুগের সীমানা অতিক্রম করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও আদর্শ হয়ে থাকেন। ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে আলিমগণ এমনই এক শ্রেণির মানুষ, যাঁদের কাঁধে ন্যস্ত হয়েছে নবুওয়াতের উত্তরাধিকার বহনের গুরুদায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন-

إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আলিমগণ নবীদের উত্তরাধিকারী।১

এই হাদীস আলেমের মর্যাদা যতটা তুলে ধরে, তার চেয়েও বেশি তাঁর দায়িত্বের গভীরতা নির্দেশ করে। কারণ নবীদের উত্তরাধিকার কেবল তথ্য বা জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, আখলাক, দাওয়াহ, নেতৃত্ব এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। ফলে একজন প্রকৃত আলিমের পরিচয় তাঁর মুখস্থ জ্ঞানের পরিমাণে নয়; বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, সমাজে ইতিবাচক প্রভাব এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতায় নিহিত।

পবিত্র কুরআনও আলেমের এই স্বতন্ত্র পরিচয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলিমরাই প্রকৃত অর্থে তাঁকে ভয় করে।২

এই আয়াত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে আলিম হওয়ার মাপকাঠি হিসেবে তথ্যের আধিক্য বা পাণ্ডিত্যকে নয়, বরং খাশইয়াতুল্লাহ তথা আল্লাহভীতিকে-প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত আলিম সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান তাঁর অন্তরকে আল্লাহর প্রতি বিনম্র করে, যার ইলম তাঁর চরিত্রে প্রতিফলিত হয় এবং যার আমল তাঁর জ্ঞানের সত্যতা প্রমাণ করে। জ্ঞান ও চরিত্রের এই সমন্বয়ই একজন রব্বানী আলিমের মৌলিক পরিচয়।

কিন্তু আধুনিক মুসলিম সমাজের অন্যতম বড় সংকট হলো, ‘আলিম’ শব্দটি ধীরে ধীরে তার মৌলিক তাৎপর্য হারাতে বসেছে। অনেক ক্ষেত্রে আলিম পরিচয়কে কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি, পেশাগত পরিচয় অথবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে এমন এক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, শিক্ষা ও তারবিয়াত (تربية) (চরিত্র, জ্ঞান ও নৈতিকতার সুশিক্ষা ও বিকাশ), বক্তব্য ও চরিত্র, নেতৃত্ব ও আত্মশুদ্ধির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রকৃত আলিমের ধারণাকে পুনরাবিষ্কার করা কেবল একটি একাডেমিক প্রয়োজন নয়; বরং উম্মাহর নৈতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম পূর্বশর্ত।

১ সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪১; জামে’ আত-তিরমিজি, হাদীস নং ২৬৮২।
২ সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮।


এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সমকালীন ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আহমাদ আলী তাঁর ‘প্রকৃত আলিমের সন্ধানে’ গ্রন্থে কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের আলোকে প্রকৃত আলিমের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত আলিম কেবল বক্তা, শিক্ষক বা গবেষক নন; বরং তিনি একজন রব্বানী ব্যক্তিত্ব, যাঁর ইলম আমলে রূপ নেয়, চরিত্রে ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় এবং সমাজে কল্যাণকর পরিবর্তন সাধিত হয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামোকে ভিত্তি করে অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস, দক্ষ শিক্ষাপ্রশাসক, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা, নিবেদিত ছাত্রগঠনের মুরব্বি ও সমাজচিন্তক। অর্থাৎ, প্রকৃত আলিমের প্রায় সকল গুণেরই এক অপূর্ব সমন্বয় তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত হয়েছিল।

১. ইসলামে প্রকৃত আলিমের মর্যাদা ও স্থান
ইসলামে প্রকৃত আলিম হলেন তিনি, যিনি শুধু জ্ঞান অর্জন করেন না; বরং সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করেন এবং মানুষকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আলিমগণ আল্লাহভীরুতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার প্রতীক; তাই ইসলামে তাঁদের মর্যাদা ও দায়িত্ব উভয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১.১ আলিমগণ নবীদের জ্ঞান ও আদর্শের উত্তরাধিকারী
নবী-রাসূলগণ মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম এবং সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তাঁদের পর নবী-রাসূলদের জ্ঞান, আদর্শ ও দাওয়াতের উত্তরাধিকার বহন করার কারণেই আলিমগণের মর্যাদা সর্বাধিক। রাসূলুল্লাহ (সা.) আলিমদের ‘নবীদের উত্তরাধিকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন-যা তাঁদের মর্যাদা ও দায়িত্বের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। রাসূল (সা.) বলেন-

إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ، وَإِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِثُوا دِينَارًا ، وَلَا دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَثُوا الْعِلْمَ ، فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ

অর্থাৎ, আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী। নবীগণ দীনার বা দিরহামকে উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে যান না। বরং তাঁরা রেখে গেছেন কেবল ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করেছে, সে পূর্ণ অংশ গ্রহণ করেছে।৩

১.২ আলিম ও জাহেলের মধ্যে পার্থক্য
ইলম আল্লাহ প্রদত্ত এক অফুরন্ত নিয়ামত। যা জ্ঞানী ও মূর্খদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

অর্থাৎ, বলুন! যারা জানে এবং যারা জানে না তার কি সমান?৪

তিনি অন্যত্র বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ

অর্থাৎ, বলুন! অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? আলো ও অন্ধকার কি এক হতে পারে?৫

৩ সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮; সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪১; জামে’ আত-তিরমিজি, হাদীস নং ২৬৮২; সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস নং ২২৩।
৪ সূরা যুমার, ৩৯: ৯।
৫ সূরা রা’দ, ১৩: ১৬।


১.৩ আলিমগণ দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত (কল্যাণের অধিকারী)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-

مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

অর্থাৎ, আল্লাহ তা’আলা যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন।৬

অতএব মহান আল্লাহ যার কল্যাণ চান, যাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করতে চান, তাঁকেই কেবল তিনি আলিম হওয়ার সৌভাগ্য দান করেন।

আল্লাহ বলেন-

يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ

অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন।৭

তিনি আরো বলেন-

يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِي خَيْرًا كَثِيرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ

অর্থাৎ, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বিশেষ প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে উক্ত প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়। বস্তুতঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিগণ ব্যতীত কেউই উপদেশ গ্রহণ করে না।৮

১.৪ প্রকৃত আলিম জান্নাতের পথের পথিক
আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ-কে আমি বলতে শুনেছি-

مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ ، وَإِنَّ الْعَالِمَ لَيَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالْحِيتَانُ فِي جَوْفِ الْمَاءِ …

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথসমূহের একটি পথ সহজ করে দেন। ফেরেশতাগণ ইলম অন্বেষণকারীর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের ডানা বিছিয়ে দেন। আর আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা এবং পানির গভীরের মাছ-আলিমের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।৯

১.৫ আলিমের মর্যাদা আবেদের ওপর পূর্ণিমার চাঁদের মতো
রাসূল (সা.) বলেন-

وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ

অর্থাৎ, আর একজন আলিমের মর্যাদা একজন সাধারণ ইবাদতকারীর ওপর এমন, যেমন পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মর্যাদা অন্যান্য নক্ষত্রের ওপর।১০

৬ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭১।
৭ সূরা মুজাদালাহ, ৫৮: ১১।
৮ সূরা বাকারা, ২: ২৬৯।
৯ সুনানু আবি দাউদ, হাদীস নং ৩৬৪১।
১০ মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ২১২।


ক্বাযী আয়ায বলেন, এই তুলনার কারণ এই যে, নক্ষত্রের আলো দ্বারা সে কেবল নিজেই আলোকিত হয়। কিন্তু চাঁদের আলো নিজেকে ছাড়াও অন্যকে আলোকিত করে। অনুরূপভাবে আবেদ তার ইবাদত দ্বারা কেবল নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায়। কিন্তু আলিম তার ইলম দ্বারা নিজে যেমন উপকৃত হন, তেমনি অন্যকে উপকৃত করে থাকেন। আলিম উক্ত নূর লাভ করেন রাসূল (সা.) থেকে। যেমন চন্দ্র জ্যোতি লাভ করে থাকে সূর্য থেকে। আর সূর্য কিরণ লাভ করে আল্লাহ থেকে। একইভাবে রাসূল (সা.) অহি লাভ করে থাকেন আল্লাহ থেকে (মিরকাত)।

১.৬ মৃত্যুর পরও আলিমের নেক আমল জারি থাকে
মানুষ মৃত্যুবরণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আলিমের আমল জারি থাকে। একজন আলিম জীবিত অবস্থায় ইলম বিতরণ করার কারণে অনেকে উপকৃত হয়েছেন। সেজন্য মৃত্যুবরণ করার পরও তার সওয়াব তিনি পেতে থাকবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ

অর্থাৎ, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি বিষয় ছাড়া-সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।১১

এখানে عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ (উপকারী ইলম) বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। একজন আলিমের শিক্ষা, গ্রন্থ, ছাত্র-শিষ্য এবং তাঁর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানচর্চা যদি তাঁর মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করে, তাহলে সেই উপকারের ধারাবাহিকতায় তাঁর জন্য সওয়াব অব্যাহত থাকার আশা করা যায়।

২. রব্বানিয়‍্যাত: প্রকৃত আলিমের প্রথম ও প্রধান পরিচয়
একজন প্রকৃত আলিমের পরিচয় নির্ধারণে যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব লাভ করে তা হলো, ‘রব্বানিয়‍্যাত’। একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে আলিম হিসেবে মূল্যায়নের পূর্বশর্ত কেবল তাঁর জ্ঞানের গভীরতা নয়; বরং তাঁর জ্ঞান কতখানি আল্লাহমুখী, তাঁর ব্যক্তিত্ব কতখানি আল্লাহকেন্দ্রিক এবং তাঁর জীবন কতখানি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত- সেই প্রশ্নের উত্তরই প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করে। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে এই আল্লাহকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বকেই ‘রব্বানিয়‍্যাত’ বলা হয়।

‘রব্বানী’ শব্দটি কুরআনের একটি বিশেষ পরিভাষা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَلَكِن كُونُوا رَبَّانِيِّينَ بِمَا كُنتُمْ تُعَلِّمُونَ الْكِتَابَ وَبِمَا كُنتُمْ تَدْرُسُونَ

অর্থাৎ, বরং তোমরা রব্বানী হও; কারণ তোমরা কিতাব শিক্ষা দাও এবং তা অধ্যয়ন কর।১২

১১ সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৩১।
১২ সূরা আলে ইমরান, ৩: ৭৯।


এই আয়াতে লক্ষ্যণীয় যে, কুরআন শুধু ‘আলিম’ হওয়ার নির্দেশ দেয়নি; বরং ‘রব্বানী’ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষা ও অধ্যয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য কেবল জ্ঞান অর্জন নয়; বরং এমন এক ব্যক্তিত্ব নির্মাণ, যার চিন্তা, মূল্যবোধ, সিদ্ধান্ত, শিক্ষা এবং কর্ম-সবকিছু আল্লাহর হিদায়াত দ্বারা পরিচালিত হয়। ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, রব্বানী হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষের কাছে জ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো ধীরে ধীরে শিক্ষা দেন, তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশ ঘটান এবং নিজেও সেই জ্ঞানের অনুসারী হন। এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, রব্বানিয়‍্যাত একটি সমন্বিত ব্যক্তিত্বের নাম; এটি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ নয়, বরং জ্ঞান, চরিত্র ও তারবিয়াতের সমন্বয়।

রব্বানিয়‍্যাতের প্রথম স্তম্ভ হলো আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। প্রকৃত আলিমের প্রতিটি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, শিক্ষা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি। তিনি জ্ঞানকে ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন না; বরং ইবাদতের একটি রূপ হিসেবে গ্রহণ করেন। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ আলিমগণ জ্ঞানার্জনের পূর্বে নিজেদের নিয়ত শুদ্ধ করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম মালিক (রহ.)-এর বিখ্যাত উক্তি-“ইলমের আগে আদব শিক্ষা কর”-এটি রব্বানিয়‍্যাতেরই একটি বাস্তব প্রকাশ। কারণ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় না হলে জ্ঞান মানুষের অন্তরে বিনয় সৃষ্টি করার পরিবর্তে অহংকার সৃষ্টি করতে পারে।

রব্বানিয়‍্যাতের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো ইলমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি। ইসলামে জ্ঞান কখনো আত্মপ্রদর্শনের উপকরণ নয়। বরং জ্ঞান হলো আল্লাহর পরিচয় লাভের একটি মাধ্যম। কুরআন বারবার মানুষকে সৃষ্টি, ইতিহাস এবং বিশ্বজগত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে সেই চিন্তা তাকে সৃষ্টিকর্তার মহিমা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এই কারণেই কুরআন আলিমের পরিচয় নির্ধারণ করেছে খাশইয়াতুল্লাহ বা আল্লাহভীতির মাধ্যমে-

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

অর্থাৎ, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলিমরাই প্রকৃত অর্থে তাঁকে ভয় করে।১৩

এই আয়াত ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। এখানে আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর তথ্যভাণ্ডারের কারণে নয়; বরং তাঁর অন্তরের অবস্থার কারণে। অর্থাৎ প্রকৃত ইলম মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব, নিজের সীমাবদ্ধতা এবং আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করে। সুতরাং যে জ্ঞান মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে অথবা ক্ষমতা ও খ্যাতির প্রতি আকৃষ্ট করে, সে জ্ঞান ইসলামের কাঙ্ক্ষিত ইলম নয়।

রব্বানিয়‍্যাতের অপরিহার্য উপাদান হলো ইখলাস। ইখলাস এমন একটি গুণ, যা বাহ্যিকভাবে পরিমাপ করা যায় না; কিন্তু এর প্রভাব মানুষের সমগ্র জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত হয়। একজন রব্বানী আলিম তাঁর শিক্ষা, গবেষণা, দাওয়াহ কিংবা নেতৃত্বকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন না। তিনি মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অধিক মূল্য দেন। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে বহু মহান আলিম খ্যাতির কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছেন। তাঁদের স্থায়ী প্রভাবের উৎস ছিল তাঁদের ইখলাস, তাঁদের আন্তরিকতা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

১৩ সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮।


রব্বানিয়‍্যাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির সমন্বয়। ইসলামে জ্ঞান এমন একটি শক্তি, যা মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। যদি সেই জ্ঞান চরিত্র পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) দুআ করতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا …

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট উপকারী জ্ঞান প্রার্থনা করছি…”।১৪

এই দুআয় ‘উপকারী জ্ঞান’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রতিটি জ্ঞান উপকারী নয়; বরং সেই জ্ঞানই উপকারী, যা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে, নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করে এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত হতে উদ্বুদ্ধ করে। রব্বানী আলিমের জ্ঞান সর্বদা উপকারী জ্ঞানে পরিণত হয়; কারণ তাঁর ব্যক্তিত্ব সেই জ্ঞানের বাস্তব প্রতিফলন।

ইসলামের ইতিহাসে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.), ইমাম নববী (রহ.), ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.), শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) এবং আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর মতো মনীষীদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের জ্ঞানের প্রভাবের মূল রহস্য ছিল রব্বানিয়‍্যাত। তাঁরা জ্ঞানকে কখনো ব্যক্তিগত মর্যাদার মাধ্যম বানাননি; বরং উম্মাহর হিদায়াত, সমাজসংস্কার এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদন করেছিলেন। এই কারণেই তাঁদের প্রভাব তাঁদের জীবদ্দশার বহু শতাব্দী পরও অব্যাহত রয়েছে।

একজন মানুষের ডিগ্রি, বক্তৃতাশৈলী কিংবা প্রশাসনিক দক্ষতা তাঁকে প্রকৃত আলিমে পরিণত করে না; বরং রব্বানিয়‍্যাতই সেই ভিত্তি, যার ওপর একজন আলিমের সমগ্র ব্যক্তিত্ব নির্মিত হয়। রব্বানিয়‍্যাত অনুপস্থিত হলে ইলম কেবল তথ্যে পরিণত হয়; কিন্তু রব্বানিয়‍্যাত উপস্থিত থাকলে সেই ইলম হিদায়াত, প্রজ্ঞা এবং সমাজপরিবর্তনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

এই গবেষণার আলোচ্য ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই নীতিটি (রব্বানিয়‍্যাত) বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর আলিমসত্তার প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রশাসনিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর ব্যক্তিত্বে রব্বানিয়‍্যাত কতখানি প্রতিফলিত হয়েছে, তাঁর জ্ঞান কীভাবে তাঁর চরিত্রে রূপ লাভ করেছে এবং তাঁর জীবন কীভাবে ছাত্র, সহকর্মী ও সমাজকে আল্লাহমুখী করেছে-এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই তাঁর প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করবে। তাই পরবর্তী আলোচনা মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন বিশ্লেষণের সূচনা হবে এই রব্বানিয়‍্যাতের ধারণাকে ভিত্তি করেই।

৩. ইলম ও আমলের সমন্বয়: প্রকৃত আলিমের জ্ঞানের সত্যতা
পূর্ববর্তী আলোচনায় প্রতিপন্ন হয়েছে যে, রব্বানিয়‍্যাত প্রকৃত আলিমের ব্যক্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে রব্বানিয়‍্যাত কেবল অন্তরের একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা নয়; বরং তা মানুষের জীবনাচরণে দৃশ্যমান রূপ লাভ করে। এখানেই ইলম (জ্ঞান) ও আমল (কর্ম)-এর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের প্রশ্নটি সামনে আসে। যে জ্ঞান মানুষের চরিত্র, আচরণ ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয় না, তা ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ ইলম নয়। প্রকৃত আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর জানা বিষয়ে নয়; বরং তিনি যা জানেন, তা কতখানি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেন-তার ওপর নির্ভরশীল। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি সরাসরি কুরআনের শিক্ষা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ

অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না? আল্লাহর নিকট এটি অত্যন্ত ঘৃণিত যে তোমরা এমন কথা বলো, যা তোমরা নিজেরা করো না।১৫

১৪ সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদীস নং ৯২৫।
১৫ সূরা আস-সাফ, ৬১: ২-৩।


এই আয়াত কেবল সাধারণ মুমিনদের জন্য নৈতিক নির্দেশনা নয়; বরং বিশেষভাবে জ্ঞানীদের জন্য সতর্কবাণী। কারণ, একজন আলিমের কথা ও কর্ম সমাজে আদর্শ ও অনুকরণের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর আমল ও জীবনাচরণের অমিল দেখা দিলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয় না; বরং ইসলামের দাওয়াহ ও এর গ্রহণযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একজন আলিমের সবচেয়ে শক্তিশালী দাওয়াহ কেবল তাঁর বক্তব্য নয়, বরং তাঁর জীবন ও কর্মই। মানুষের হৃদয়ে যে শিক্ষা গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলে, তা কেবল মুখের কথায় নয়; বরং বাস্তব আচরণ, চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমেই অধিকতর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনে এই সত্যই অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

রাসূলুল্লাহ এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি আল্লাহর কাছে এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, যা মানুষের কোনো উপকারে আসে না-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ …

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাই, যা উপকারে আসে না…”।১৬

এই দুআ ইসলামী জ্ঞানচিন্তার একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। জ্ঞানের মূল্য কেবল তার বিস্তৃতিতে নয়; বরং তার ফলপ্রসূতায়। যে জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য, নৈতিক উৎকর্ষ এবং মানবসেবার দিকে পরিচালিত করে, সেটিই ‘ইলমে নাফি” (উপকারী জ্ঞান)। পক্ষান্তরে যে জ্ঞান অহংকার, আত্মগর্ব বা পার্থিব প্রতিযোগিতার উপকরণে পরিণত হয়, তা ইসলামী দৃষ্টিতে তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের মহান মনীষীরাও একই নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ইমাম আল-গাযালী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ উল্লেখ করেন যে, যে জ্ঞান মানুষের চরিত্র ও আমলকে সংশোধন করে না, তা আখিরাতে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। তাঁর ভাষায়, ইলমের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিতর্কে জয়লাভ নয়; বরং আত্মাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করা। একইভাবে ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়‍্যাহ বলেন, ইলম একটি বৃক্ষের মতো; আর আমল তার ফল। ফলহীন বৃক্ষ যেমন মানুষের উপকারে আসে না, তেমনি আমলহীন জ্ঞানও তার প্রকৃত মূল্য হারায়।

অধ্যক্ষ আবুল হাশেম (রহ.) ইলম ও আমলের সম্পর্ককে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত আলিমের আমল তিনটি স্তরে প্রতিফলিত হয়। প্রথমত, তাঁর ব্যক্তিগত ইবাদত ও চরিত্রে; দ্বিতীয়ত, তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক আচরণে; এবং তৃতীয়ত, তাঁর নেতৃত্ব, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মধ্যে। অর্থাৎ একজন আলিমের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার মধ্যে যদি দ্বৈততা সৃষ্টি হয়, তবে তাঁর আলিমসত্তা অপূর্ণ থেকে যায়। ইসলামে ব্যক্তি ও জনজীবনের এই ঐক্যই প্রকৃত আলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে-কোনো আলিম কি কখনো ভুলের ঊর্ধ্বে? ইসলামের দৃষ্টিতে এর উত্তর হলো-আলিমও একজন মানুষ; তাই তাঁরও ভুল-ত্রুটি হতে পারে। তবে একজন প্রকৃত আলিমের বিশেষত্ব হলো, তিনি নিজের ভুলকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন না; বরং সত্য উপলব্ধি হলে বিনয়ের সঙ্গে তা স্বীকার করেন এবং আত্মসমালোচনা, তাওবা ও সংশোধনের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। এই বিনয়, আত্মজিজ্ঞাসা ও সংশোধনের মানসিকতাই ইলম ও আমলের প্রকৃত সমন্বয়ের পরিচায়ক। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর চরিত্রেও এই বিনয়, আত্মসমালোচনা ও সংশোধনপ্রবণতা ছিল অন্যতম মহৎ বৈশিষ্ট্য।

আবার, ইলম ও আমলের ঐক্য ছাড়া প্রকৃত তারবিয়াত সম্ভব নয়। একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিক্ষা দেন না; বরং তাঁর দৈনন্দিন জীবনাচরণ, চরিত্র, আচার-ব্যবহার ও নৈতিকতার মাধ্যমেও নীরবে শিক্ষা প্রদান করেন। অনেক সময় ছাত্ররা শিক্ষকের বক্তব্যের চেয়ে তাঁর জীবন ও চরিত্রকেই বেশি অনুসরণ করে। এ কারণেই ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ আলিমদের অবদান শুধু তাঁদের রচিত গ্রন্থে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তাঁদের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের জীবন ও চরিত্রেও তা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের জীবনই ছিল তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যপুস্তক। এই অর্থে, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) শুধু একজন শিক্ষক বা আলিম ছিলেন না; তাঁর জীবন ও কর্মই ছিল একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এই আলোচনার সারমর্ম হলো, ইসলামী দৃষ্টিতে ইলম ও আমল দুটি পৃথক বাস্তবতা নয়; বরং একই সত্যের দুই অবিচ্ছেদ্য দিক। ইলম মানুষকে সত্যের পরিচয় দেয়, আর আমল সেই সত্যকে জীবন্ত বাস্তবে রূপান্তরিত করে। ইলম ছাড়া আমল অন্ধ, আর আমল ছাড়া ইলম নিষ্প্রাণ। এই সমন্বয়ই একজন আলিমকে তথ্যের ভাণ্ডার থেকে নৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত করে। এই তাত্ত্বিক আলোচনার আলোকে পরবর্তীতে বিশ্লেষণ করব-মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন কীভাবে ইলম ও আমলের এই কুরআনিক আদর্শের বাস্তব প্রতিফলনে পরিণত হয়েছিল। তাঁর শিক্ষা, ব্যক্তিগত জীবন, ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জ্ঞান ও কর্মের এই ঐক্য কীভাবে প্রকাশ পেয়েছিল, সেটিই হবে পরবর্তী বিশ্লেষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

১৬ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭২২।


৪. ইলমকে আমানত হিসেবে ধারণ করার মানসিকতা
একজন প্রকৃত আলিম কখনো জ্ঞানকে ব্যক্তিগত মর্যাদা, খ্যাতি বা কৃতিত্ব অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন না; বরং তিনি ইলমকে আল্লাহপ্রদত্ত আমানত মনে করেন এবং তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ

অর্থাৎ, আল্লাহ যেমন তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও তেমনি অনুগ্রহ করো।১৭

আল্লাহ যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সামর্থ্য দান করেছেন, তার যথার্থ কৃতজ্ঞতা হলো তা কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা এবং অন্যদের উপকৃত করা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও ইলম অর্জন ও তা শিক্ষাদানের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেছেন, যে ব্যক্তি ইলমের সন্ধানে কোনো পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন; আর যারা আল্লাহর ঘরে সমবেত হয়ে কুরআন অধ্যয়ন ও শিক্ষা করে, তাদের ওপর প্রশান্তি ও রহমত নেমে আসে এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করেন।১৮

তাই একজন আলিমের কাছে ইলমের প্রকৃত মর্যাদা কেবল তার পরিমাণে নয়, বরং তার উপকারিতায়। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সমগ্র জীবনই ছিল এই দর্শনের বাস্তব প্রকাশ। তিনি জ্ঞান অর্জনকে কখনো ব্যক্তিগত কৃতিত্বের বিষয় মনে করেননি; বরং সেই জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াকেই নিজের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষকতা, হাদীসের দরস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি ইলমকে কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং ইলমকে সমাজের সম্পদে পরিণত করে গেছেন।

৫. ইলমচর্চা ও আলিমসত্তার বিকাশ
একজন প্রকৃত আলিমের পরিচয় তাঁর অর্জিত জ্ঞানের পরিমাণে নয়; বরং সেই জ্ঞান কীভাবে তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র, সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব এবং মানুষ গড়ার সক্ষমতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে-তার ওপর নির্ভর করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একজন আলিমের জীবনের মূল্যায়ন তাঁর শিক্ষাজীবনের বিবরণ দিয়ে শুরু হলেও তা সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁর সমগ্র জীবনকে একটি অব্যাহত শিক্ষাপ্রক্রিয়া (Continuous Process of Learning and Moral Formation) হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যে ইলম কখনো স্থির কোনো সম্পদ নয়; বরং তা আত্মগঠন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন এবং সমাজকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করার একটি নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। এই মানদণ্ডে বিচার করলে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর আলিমসত্তার বিকাশকে কেবল একটি শিক্ষাগত অর্জন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের ইলমসাধনা, আত্মশুদ্ধি, শিক্ষকসান্নিধ্য এবং অবিরাম আমলনির্ভর জীবনের সম্মিলিত ফল। তাঁর ব্যক্তিত্বে যে প্রজ্ঞা, বিনয়, নৈতিক দৃঢ়তা এবং তারবিয়াতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি পরিণত রূপ লাভ করেছিল, তা কোনো আকস্মিক অর্জন ছিল না; বরং দীর্ঘ জ্ঞানসাধনার স্বাভাবিক পরিণতি।

ইসলামী ঐতিহ্যে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি মৌলিক নীতি রয়েছে। কুরআন মানুষকে নির্দেশ দেয়-

وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا

অর্থাৎ, বলুন, হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।১৯

১৭ সূরা আল-কাসাস, ২৮: ৭৭।
১৮ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯।
১৯ সূরা ত্ব-হা, ২০: ১১৪।


এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল (সা.)-কে সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি বৃদ্ধির জন্য নয়; বরং জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেই জ্ঞান এমন জ্ঞান, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে আরও নিকটবর্তী করে এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত করে। এই আয়াত ইসলামী শিক্ষাদর্শনের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে- ইলমের কোনো সমাপ্তি নেই, এবং প্রকৃত আলিম সারাজীবন শিক্ষার্থী হিসেবেই বেঁচে থাকেন।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন এই কুরআনিক আদর্শের এক বাস্তব প্রতিফলন। তিনি ইলমকে কখনো চাকরি, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং তা ছিল তাঁর জীবনব্যাপী ইবাদত। তাঁর নিকট জ্ঞান অর্জন মানে ছিল নিজেকে সংশোধন করা, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা এবং একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে তোলা। এ কারণেই তাঁর শিক্ষাদান কেবল পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রতিটি পাঠ ছিল চরিত্র গঠন, চিন্তার পরিশুদ্ধি এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি প্রচেষ্টা।

একজন প্রকৃত আলিম তাঁর উস্তাদদের কাছ থেকে শুধু তথ্য ও জ্ঞান অর্জন করেন না; বরং তাঁদের আদর্শ, চরিত্র, আচার-আচরণ, ইখলাস ও জীবনদর্শনও আত্মস্থ করেন। ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যে ইলমের সংরক্ষণ ও উত্তরাধিকার প্রধানত সনদ (জ্ঞান হস্তান্তরের ধারাবাহিক সূত্র) ও সুহবত (সাহচর্য/ Companionship)-এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ, কিতাব অধ্যয়নের পাশাপাশি একজন আলিম তাঁর উস্তাদের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞানের প্রয়োগ, চরিত্রের পরিশুদ্ধতা, ইখলাস ও জীবনাচরণের শিক্ষা লাভ করেন। এ কারণেই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় ‘সুহবত’কে জ্ঞান অর্জন ও আত্মগঠনের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর আলিমসত্তার বিকাশেও এই ঐতিহ্যের গভীর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তিনি এমন এক শিক্ষাপদ্ধতির উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন, যেখানে জ্ঞান কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং উস্তাদের ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে ছাত্রের অন্তরে সঞ্চারিত হতো। এর ফলেই তাঁর নিজের মধ্যেও শিক্ষকের ভূমিকা কেবল একজন বক্তা বা পাঠদাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি পরিণত হয়েছিলেন একজন মুরব্বি, যিনি ছাত্রদের জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি তাদের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনদর্শন নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নিকট ইলম ছিল না মুখস্থ তথ্যের সমষ্টি; বরং এমন এক আলোকবর্তিকা, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে। তিনি ছাত্রদের কেবল ‘কী ভাবতে হবে’ তা শেখাতেন না; বরং ‘কীভাবে সত্যের আলোকে চিন্তা করতে হবে’- সেই বোধ গড়ে তুলতেন। আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বের ভাষায় এটি Transformative Education (রূপান্তরমূলক শিক্ষা- যে শিক্ষা চিন্তা, চরিত্র, মূল্যবোধ ও আচরণে গভীর ইতিবাচক পরিবর্তন আনে), আর ইসলামী পরিভাষায় এটি তারবিয়াহভিত্তিক শিক্ষা। এখানেই তাঁর আলিমসত্তার স্বাতন্ত্র্য নিহিত।

এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জ্ঞানচর্চা কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না; বরং ছিল উম্মাহকেন্দ্রিক। তিনি জ্ঞানকে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করেননি; বরং সমাজে জ্ঞানী, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ তৈরির উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামী ইতিহাসে নবীদের উত্তরাধিকার বহনকারী আলিমদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যও ছিল এটি। তাঁরা নিজেদের চারপাশে অনুসারী নয়, বরং আদর্শবান মানুষ গড়ে তুলেছেন। এই অর্থে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর ইলমচর্চার সবচেয়ে বড় সাফল্য তাঁর ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্য নয়; বরং তাঁর দ্বারা গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক এবং ইসলামী সমাজকর্মী।

সুতরাং গবেষণামূলক দৃষ্টিতে বলা যায়, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর আলিমসত্তার বিকাশ ছিল কুরআনিক ইলম-দর্শনের একটি জীবন্ত প্রতিফলন। তাঁর জ্ঞান আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে চরিত্রে রূপ নিয়েছে, চরিত্র নেতৃত্বে রূপ নিয়েছে, আর নেতৃত্ব মানুষ গঠনের শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই ধারাবাহিক রূপান্তরই তাঁকে একজন তথ্যসমৃদ্ধ পণ্ডিতের পরিবর্তে একজন রব্বানী আলিম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই একজন প্রকৃত আলিমের তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বিচার করলে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, তাঁর জীবনে ইলম কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠার এক অবিরাম অভিযাত্রা।

৬. একজন প্রশাসক নন, একজন রব্বানী নেতা
প্রকৃত আলিমের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নেতৃত্ব (Leadership)। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণে নেতৃত্ব ক্ষমতার প্রয়োগ নয়; বরং আমানত (Trust), খিদমাহ (Service) এবং ইসলাহ (Reformation)-এর দায়িত্ব। একজন প্রকৃত আলিম কেবল জ্ঞানের শিক্ষক নন; তিনি সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশক, প্রতিষ্ঠান নির্মাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্থপতি। এই কারণেই ইসলামী ইতিহাসে মহান আলিমদের অবদান শুধু তাঁদের রচিত গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, গড়ে তোলা মানুষ এবং সৃষ্ট জ্ঞান-সংস্কৃতির মধ্যেও সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নেতৃত্বকে প্রশাসনিক দক্ষতার সংকীর্ণ পরিসরে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, সেগুলোকে তিনি কেবল পাঠদান বা পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সেগুলোকে তারবিয়াহ, আখলাক এবং নেতৃত্ব বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অন্তরালে সর্বদা একটি বৃহত্তর লক্ষ্য কাজ করত- কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান এমন মানুষ তৈরি করবে, যারা ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল এবং ইসলামের মূল্যবোধে দৃঢ় থাকবে।

এই নেতৃত্বের দর্শন কুরআনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

অর্থাৎ, আর আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ নেতা বানিয়ে দিন।২০

২০ সূরা আল-ফুরকান, ২৫: ৭৪।


এই আয়াতে নেতৃত্বকে কোনো রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং তাকওয়ার ভিত্তিতে মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

একইভাবে আল্লাহ বলেন-

وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا

অর্থাৎ, আমি তাঁদের এমন নেতা বানিয়েছিলাম, যারা আমার নির্দেশে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত।২১

এই দুটি আয়াত ইসলামী নেতৃত্বের মৌলিক দর্শন স্পষ্ট করে। একজন নেতা প্রথমে নিজে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকেন, তারপর তাঁর জীবন ও কর্মের মাধ্যমে অন্যদের সেই পথে পরিচালিত করেন। এই কারণেই প্রকৃত আলিমকে “রব্বানী নেতা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রকৃত আলিমের নেতৃত্বের মূল শক্তি প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়; বরং নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা (Moral Credibility)। মানুষ তাঁর পদমর্যাদার কারণে নয়, তাঁর চরিত্রের কারণে তাঁকে অনুসরণ করে।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবনে এই নৈতিক নেতৃত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকে কখনো ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে ব্যবহার করেননি। বরং তাঁর সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিল প্রতিষ্ঠানের আদর্শ, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং ইসলামী মূল্যবোধের সংরক্ষণ। প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি তিনি যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের নৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার ভবন, আর্থিক সামর্থ্য বা পরীক্ষার ফলাফলে নয়; বরং তার সাংগঠনিক সংস্কৃতি (Institutional Culture)-তে নিহিত।

আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা প্রায়শই প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় তার মানুষ গড়ার সক্ষমতা দ্বারা। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নেতৃত্বের বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি একটি প্রতিষ্ঠানকে শুধু জ্ঞান বিতরণের স্থান হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে চরিত্র নির্মাণের কর্মশালা হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর নিকট একজন ছাত্রের নৈতিক উন্নতি পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাগুলো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ছাত্রদের আবাসিক জীবনের প্রতি তাঁর নিয়মিত খোঁজখবর, সাপ্তাহিক কুরআনভিত্তিক আলোচনা, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতির প্রতি আন্তরিক মনোযোগ এবং প্রয়োজন হলে তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরামর্শ প্রদান-এসবই প্রমাণ করে যে, তিনি প্রশাসনিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে একটি শিক্ষার্থীসমাজ গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ছিল মানুষ নির্মাণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, কেবল নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি রব্বানী নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এখানে তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি-নির্ভর নয়, আদর্শ-নির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো এক ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে; সেই ব্যক্তি চলে গেলে প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু একজন দূরদর্শী রব্বানী নেতা প্রতিষ্ঠানকে এমন মূল্যবোধ, নীতি ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন, যা তাঁর অনুপস্থিতিতেও টিকে থাকে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নেতৃত্বে এই বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।

প্রকৃত আলিম কেবল বিদ্যমান সমাজকে পরিচালনা করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ সমাজের ভিত্তিও নির্মাণ করেন। এই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান মাধ্যম হলো শিক্ষা। কারণ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানই এমন স্থান, যেখানে আগামী দিনের আলিম, শিক্ষক, সমাজনেতা ও নাগরিক গড়ে ওঠে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক রূপান্তরের (Social Transformation) সূতিকাগার।

২১ সূরা আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৩।


তাঁর সমাজসংস্কারমূলক ভূমিকার মূল্যায়নও এই প্রেক্ষাপটে করতে হবে। তিনি সমাজ পরিবর্তনকে কেবল বক্তৃতা, স্লোগান বা তাৎক্ষণিক কর্মসূচির মাধ্যমে অর্জনযোগ্য বলে মনে করেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের স্থায়ী পরিবর্তন শুরু হয় মানুষের অন্তর, চরিত্র এবং চিন্তার পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাই তাঁর সমাজসংস্কারের কৌশল ছিল দীর্ঘমেয়াদি-একজন আদর্শ ছাত্র গড়ে তোলা, একজন সৎ শিক্ষক তৈরি করা এবং একটি নৈতিক শিক্ষা-পরিবেশ নির্মাণ করা। এই কৌশল নববী দাওয়াতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ব্যক্তি গঠনের মাধ্যমে সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া অনুসৃত হয়েছে।

গবেষণামূলক দৃষ্টিতে বলা যায়, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নেতৃত্ব ছিল Transformational Leadership (রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব)-এর একটি ইসলামী রূপ। আধুনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এই ধারণা এমন নেতৃত্বকে বোঝায়, যা অনুসারীদের কেবল কাজে উদ্বুদ্ধ করে না; বরং তাদের মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিত্বকে ইতিবাচকভাবে রূপান্তরিত করে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব এর চেয়েও গভীর ছিল। এর ভিত্তি ছিল তাকওয়া, ইখলাস, খিদমাহ এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি। তাই তাঁকে কেবল একজন সফল প্রশাসক বলা তাঁর অবদানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে; বরং তাঁকে একজন রব্বানী নেতা বলা অধিক যথার্থ।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর নেতৃত্বের মূল শক্তি ছিল তাঁর আলিমসত্তা। তাঁর প্রশাসন ছিল ইলমের সম্প্রসারণ, তাঁর প্রতিষ্ঠান ছিল তারবিয়াতের ক্ষেত্র এবং তাঁর সমাজসংস্কার ছিল নববী উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। এ কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ও গড়ে তোলা মানুষ আজও তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। তাই মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন ড. আহমাদ আলীর উপস্থাপিত ‘প্রকৃত আলিম’-এর ধারণাকে কেবল সমর্থনই করে না; বরং তার একটি জীবন্ত উদাহরণও উপস্থাপন করে। তাঁর মধ্যে জ্ঞান, চরিত্র, নেতৃত্ব এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের যে সমন্বয় দেখা যায়, তা একজন রব্বানী আলিমের পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্বেরই পরিচয় বহন করে।

৭. শিক্ষক, মুরব্বি ও তারবিয়াতের নির্মাতা: ব্যক্তিগত স্মৃতিতে একজন রব্বানী আলিম
ইসলামী ইতিহাসে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) কিংবা শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর জীবন মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও তাঁদের ছাত্রদের বর্ণিত ঘটনাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ একজন আলিমের প্রকৃত চরিত্র আনুষ্ঠানিক পরিসরের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক মুহূর্তেই অধিক স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়। শ্রদ্ধেয় উস্তাযের একজন প্রিয় ছাত্র হিসেবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর ব্যক্তিত্বের যেসব দিক প্রতিফলিত হয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংহত শিক্ষাদর্শন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং রব্বানিয়‍্যাতের ধারাবাহিক প্রকাশ।

ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে একজন আলিমের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় কেবল তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় নয়; বরং তিনি কতজন মানুষ গড়ে তুলতে পেরেছেন-তার ওপর নির্ভর করে। নবী-রাসূলদের শিক্ষাপদ্ধতির মূল লক্ষ্যও ছিল তথ্য প্রদান নয়; বরং ব্যক্তিত্ব নির্মাণ। পবিত্র কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দায়িত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলা চারটি মৌলিক কাজের কথা উল্লেখ করেছেন-আয়াত তিলাওয়াত, তাযকিয়া, কিতাব শিক্ষা এবং হিকমাহ শিক্ষা (সূরা আল-বাকারা, ২: ১২৯; সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৪)। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে তাযকিয়া বা চরিত্র নির্মাণকে জ্ঞানদানের পূর্বে বা তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কুরআন স্পষ্ট করে যে, ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞানী মানুষ তৈরি করা নয়; বরং সৎ, দায়িত্বশীল এবং আল্লাহমুখী মানুষ গড়ে তোলা।

প্রকৃত আলিম কখনোই নিজেকে কেবল একজন মু’আল্লিম (শিক্ষক) হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেন না; তিনি একই সঙ্গে একজন মুরব্বি। শিক্ষক তথ্যের স্থানান্তর ঘটান, কিন্তু মুরব্বি মানুষকে রূপান্তরিত করেন। শিক্ষক পাঠ সমাপ্ত করেন, কিন্তু মুরব্বি একটি জীবনদর্শন নির্মাণ করেন। এই কারণেই ইসলামী ঐতিহ্যে মুরব্বির প্রভাব তাঁর শ্রেণিকক্ষের সীমানা অতিক্রম করে ছাত্রের সমগ্র জীবনে বিস্তৃত হয়। এই তাত্ত্বিক মানদণ্ডের আলোকে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষকতাকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তাঁর শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ গঠন। তিনি ছাত্রদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করার চেয়ে তাদের আদর্শবান মুসলিম, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং ভবিষ্যৎ সমাজনেতা হিসেবে গড়ে তুলতে অধিক মনোযোগী ছিলেন। তাঁর শ্রেণিকক্ষ ছিল কেবল পাঠদানের স্থান নয়; বরং নৈতিক শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের এক অনন্য শিক্ষাঙ্গন।

তাঁর ছাত্রদের স্মৃতিচারণে একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে-তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখেননি। বরং তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতিও সমান দৃষ্টি রাখতেন। এই বৈশিষ্ট্য ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে তারবিয়াহ-র মূল উপাদান। কারণ তারবিয়াতের অর্থ কেবল শাসন বা নির্দেশ প্রদান নয়; বরং ধীরে ধীরে একজন মানুষকে তার পূর্ণ সম্ভাবনার দিকে বিকশিত হতে সহায়তা করা।

আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও এই সত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। আমার শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে নিয়মিত কুরআন অধ্যয়নের প্রতি আগ্রহ ও অঙ্গীকার দেখে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এখানেই মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর তারবিয়াতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে আমি নিচে একটি কেস স্টাডি উল্লেখ করছি:

কেস স্টাডি: কুরআন ক্লাস এবং শৃঙ্খলা, কুরআনকেন্দ্রিক শিক্ষা ও একজন রব্বানী মুরব্বির শিক্ষাদর্শ
আমার স্মৃতিতে অন্যতম উজ্জ্বল ঘটনা হলো নিয়মিত কুরআন অধ্যয়নের প্রতি মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর আন্তরিক উৎসাহ ও সন্তুষ্টি। আপাতদৃষ্টিতে এটি একজন শিক্ষকের স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে একজন রব্বানী আলিমের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। তিনি কুরআন পাঠকে পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে দেখেননি; বরং চরিত্র নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে কুরআন ছিল Curriculum নয়; Life Formation-এর কেন্দ্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি কুরআনের সেই নির্দেশনারই বাস্তব প্রকাশ-

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ

অর্থাৎ, এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ গভীরভাবে অনুধাবন করে।২২

এখানে কুরআনের উদ্দেশ্য মুখস্থ করা নয়; বরং তাদাব্বুর-অর্থাৎ চিন্তা, আত্মসমালোচনা ও জীবনগঠন। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শন এই কুরআনিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

একজন রব্বানী আলিমের শ্রেণিকক্ষ এমন একটি পরিবেশ, যেখানে পাঠদান, তারবিয়াত, নৈতিক শৃঙ্খলা এবং আল্লাহভীতি একই সঙ্গে বিকশিত হয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সঙ্গে আমার ১৯৯৮ সালের একটি অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তখন আমি আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্র। দ্বিতীয় পিরিয়ডে কুরআনের ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন। শিক্ষকহীন অবস্থায় শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ে। কেউ গল্পে, কেউ হাসি-ঠাট্টায়, আবার কেউ শ্রেণিকক্ষের ভেতরে অযথা চলাফেরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই দৃশ্য কোনো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একজন রব্বানী শিক্ষকের দৃষ্টিতে এটি কেবল শৃঙ্খলার ভঙ্গ নয়; বরং শিক্ষার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার সূচনা।

২২ সূরা সা-দ, ৩৮: ২৯।


এই সময় অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) আকস্মিকভাবে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রথমেই ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসেবে আমাকে দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেন। তাঁর কণ্ঠে কঠোরতা ছিল, কিন্তু সেই কঠোরতা অপমান বা ভীতির উদ্দেশ্যে নয়; বরং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য। এরপর তিনি নিজেই শিক্ষকের আসনে বসেন এবং কুরআন মাজিদ খুলতে বলেন। সেদিনের পাঠ ছিল সূরা আলে ইমরানের ৮৬ নম্বর আয়াত-

كَيْفَ يَهْدِي اللَّهُ قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ …

(যারা ঈমান আনার পর কুফরি করেছে, আল্লাহ কীভাবে তাদেরকে হেদায়াত দান করবেন?) আয়াতটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি শুধু তাফসিরের তথ্য উপস্থাপন করেননি; বরং আয়াতের নৈতিক আবেদনকে শিক্ষার্থীদের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ যখন প্রশ্ন করছেন-তিনি কীভাবে তাদের হিদায়াত দেবেন, তাহলে তোমরা যদি নিজেরাই উদাসীন থাকো, কীভাবে হিদায়াতের পথে চলবে?” এই একটি বাক্য শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। যে শ্রেণিকক্ষ কয়েক মুহূর্ত আগেও বিশৃঙ্খল ছিল, তা গভীর মনোযোগ ও আত্মসমালোচনার পরিবেশে পরিণত হয়।

গবেষণামূলক বিশ্লেষণে এই ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা উন্মোচন করে-

প্রথমত, এখানে শৃঙ্খলা (Discipline)-কে উদ্দেশ্য নয়, বরং শিক্ষার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। আধুনিক শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানে শৃঙ্খলা প্রায়শই আচরণ নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ইসলামী শিক্ষাদর্শে শৃঙ্খলার ভিত্তি হলো তাকওয়া এবং আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি (Muraqabah)। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) শিক্ষার্থীদের নীরব করানোর জন্য কণ্ঠ উঁচু করেননি; তিনি কুরআনের ভাষার মাধ্যমে তাদের অন্তরকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। এটি বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা।

দ্বিতীয়ত, এই ঘটনায় কুরআনকে পাঠ্যবই নয়, জীবন্ত দিকনির্দেশনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কুরআন নিজেই ঘোষণা করে-

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ

অর্থাৎ, এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।২৩

এই আয়াতের আলোকে কুরআনের শিক্ষা তখনই পূর্ণতা লাভ করে, যখন তা মানুষের বাস্তব জীবনকে স্পর্শ করে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর ব্যাখ্যার পদ্ধতি ছিল ঠিক এমনই। তিনি আয়াতকে ইতিহাসের একটি ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি; বরং শিক্ষার্থীদের বর্তমান জীবন ও দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এটি ইসলামী শিক্ষাবিজ্ঞানে তাদাব্বুরভিত্তিক শিক্ষা (Tadabbur-Based Pedagogy)-এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তৃতীয়ত, এই ঘটনা মুরব্বিয়ানা নেতৃত্ব (Murabbi Leadership)-এর বাস্তব প্রতিফলন। একজন প্রকৃত আলিমের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়; বরং শিক্ষার্থীদের আত্মিক জাগরণ ঘটানো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) সেদিন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় শুধু একটি ক্লাস নেননি; তিনি একটি মূল্যবোধগত সংকটের মুহূর্তকে তারবিয়াতের সুযোগে রূপান্তরিত করেছিলেন। একজন সাধারণ প্রশাসক হয়তো অনুপস্থিত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন বা শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিতেন; কিন্তু একজন রব্বানী মুরব্বি সেই পরিস্থিতিকেই নৈতিক শিক্ষার উপকরণে পরিণত করেন।

২৩ সূরা সা-দ, ৩৮: ২৯।


চতুর্থত, ঘটনাটি তাঁর পরিস্থিতিনির্ভর শিক্ষাদর্শ (Contextual Pedagogy)-এর পরিচয় বহন করে। তিনি পূর্বপ্রস্তুত কোনো বক্তৃতা দেননি; বরং যে আয়াতটি সেদিনের পাঠ ছিল, সেটিকেই শিক্ষার্থীদের আচরণের সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি তাৎক্ষণিক কিন্তু গভীর শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করেছিলেন। ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে এটিই নববী পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায়ই আশপাশের ঘটনা, প্রশ্ন বা পরিস্থিতিকে উপলক্ষ করে শিক্ষা দিতেন, ফলে শিক্ষা জীবনঘনিষ্ঠ ও স্থায়ী হতো।

পঞ্চমত, আমার দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে এই ঘটনাটির অম্লান উপস্থিতি শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে নির্দেশ করে। মানুষ কেবল তথ্য মনে রাখে না; বরং রূপান্তরমূলক শিক্ষণ-অভিজ্ঞতা (Transformative Learning Experience) মনে রাখে। প্রায় তিন দশক পরও এই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে জীবন্ত থাকা প্রমাণ করে যে, এটি কেবল একটি ক্লাস ছিল না; বরং ব্যক্তিত্ব গঠনের এক নির্ধারণী অভিজ্ঞতা। ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্যও ঠিক এটিই-এমন শিক্ষা, যা পরীক্ষার খাতায় নয়, মানুষের চরিত্রে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

এই কেস স্টাডির আলোকে বলা যায়, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শের কেন্দ্রে ছিল কুরআন, তারবিয়াত এবং নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়। তিনি কুরআনকে জ্ঞানের উৎস হিসেবে যেমন দেখেছেন, তেমনি চরিত্র গঠনের প্রধান মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর শাসনের মধ্যে ভয় ছিল না, ছিল দায়িত্ববোধ; তাঁর কঠোরতার মধ্যে রূঢ়তা ছিল না, ছিল মমতা; তাঁর পাঠদানের মধ্যে তথ্য ছিল না, ছিল আত্মজাগরণের আহ্বান। একজন ‘প্রকৃত আলিম’-এর যে বৈশিষ্ট্য-ইলমকে মানুষের অন্তরে জীবন্ত করে তোলা-এই একটিমাত্র ঘটনাই তার একটি শক্তিশালী প্রায়োগিক (Illustrative) সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই কারণেই ১৯৯৮ সালের সেই কুরআন ক্লাস কেবল একজন ছাত্রের স্মৃতি নয়; বরং একজন রব্বানী আলিমের শিক্ষাদর্শ, তারবিয়াত এবং নৈতিক নেতৃত্বের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যা তাঁর সমগ্র ব্যক্তিত্বকে বোঝার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য গবেষণামূলক জানালা উন্মুক্ত করে।

একইভাবে ছাত্রাবাসে অবস্থান, ছাত্রদের দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্পর্কে তাঁর খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজনবোধে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করার ঘটনাগুলোও তাঁর শিক্ষকসত্তার একটি ভিন্ন মাত্রা উন্মোচন করে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক প্রায়শই শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকে; কিন্তু ইসলামী শিক্ষার ঐতিহ্যে শিক্ষক ছাত্রের চরিত্র, ইবাদত, শৃঙ্খলা, সময়ব্যবস্থাপনা এবং নৈতিক বিকাশেরও অভিভাবক। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) এই ঐতিহ্যকে তাঁর বাস্তব জীবনে ধারণ করেছিলেন। তিনি বুঝতেন, একটি আদর্শ সমাজ নির্মাণের সূচনা হয় একজন আদর্শ শিক্ষার্থীর গঠন থেকে; আর সেই গঠন কেবল পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আরেকটি কেস স্টাডিতে বিষয়টি ফোটে উঠে।

কেস স্টাডি: ছাত্রাবাসে আবাসনের সিদ্ধান্ত-প্রতিভা চিহ্নিতকরণ, তারবিয়াত ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্মাণ
আমার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) ছাত্রাবাসকে কেবল আবাসনের ব্যবস্থা হিসেবে দেখতেন না। তিনি নিয়মিত ছাত্রদের খোঁজখবর নিতেন, তাদের জীবনযাপন, ইবাদত, পড়াশোনা এবং নৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকতেন। গবেষণার দৃষ্টিতে এই আচরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বে একে Pastoral Care (নৈতিক তত্ত্বাবধান) বলা হলেও ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে এটি তারবিয়াহ-র অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন রব্বানী আলিম ছাত্রকে কেবল শ্রেণি কক্ষে শিক্ষা দেন না; বরং তার সামগ্রিক জীবনগঠনের দায়িত্বও অনুভব করেন। প্রকৃত আলিমের লক্ষ্য মানুষ তৈরি করা, কেবল সনদধারী শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর ছাত্রাবাসকেন্দ্রিক তত্ত্বাবধান এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ।

একজন প্রকৃত আলিম কেবল বর্তমানকে পরিচালনা করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে চিনতে পারেন এবং সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইসলামী শিক্ষার ভাষায় এটিই তারবিয়াহ-মানুষকে তার পূর্ণ সম্ভাবনার দিকে ধীরে ধীরে বিকশিত করে তোলা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লেখকের ছাত্রাবাসে আবাসনের ঘটনাটি মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শ ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

১৯৯৮ সালে আমার প্রি-টেস্ট এবং দাখিল পরীক্ষার কয়েক মাস পূর্বে অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) তাঁর কক্ষে আমাকে ডেকে পাঠান। সেখানে তিনি জানান যে, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমাকে কেন্দ্রীয় পরীক্ষা পর্যন্ত ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করতে হবে এবং থাকা-খাওয়ার সমস্ত ব্যয় প্রতিষ্ঠান বহন করবে। সিদ্ধান্তটি ছিল না কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান বা আনুষ্ঠানিক পুরস্কার; বরং একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে অধিক ফলপ্রসূ করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত শিক্ষাগত বিনিয়োগ। তিনি আমাকে স্নেহভরা কণ্ঠে বলেছিলেন- তোমাকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। জীবনে বড় হতে হবে, বড় স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলসভাবে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, তুমি অনেক দূর যেতে পারবে—।” সেদিনের সেই কথাগুলো হয়তো ছিল অতি সাধারণ কিছু বাক্য; কিন্তু সময়ের স্রোতে সেগুলোই আমার কাছে হয়ে উঠেছে একটি জীবনের দিকনির্দেশনা, এগিয়ে চলার প্রেরণা এবং স্বপ্ন দেখার সাহস। তাঁর সেই কথাগুলো আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে একজন মুরব্বির সুদূরপ্রসারী শিক্ষাদর্শ নিহিত রয়েছে। তিনি কেবল পরীক্ষার ফল নিয়ে চিন্তা করেননি; বরং একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘমেয়াদি জীবন, তার ভবিষ্যৎ অবদান এবং সমাজে তার সম্ভাব্য ভূমিকা সম্পর্কে চিন্তা করেছেন।

গবেষণামূলক দৃষ্টিতে এই ঘটনাটি প্রথমত প্রতিভা চিহ্নিতকরণের (Talent Identification) একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা, মেন্টরিং ও সমৃদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ তৈরিকে শিক্ষানেতৃত্বের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে এর ভিত্তি আরও গভীর। রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও স্বভাব বুঝে তাঁদের দায়িত্ব বণ্টন করতেন। কেউ বিচারকার্যে, কেউ দাওয়াতে, কেউ প্রশাসনে এবং কেউ জ্ঞানচর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। অর্থাৎ নববী শিক্ষাপদ্ধতিতে সমতা (Equality)-র পাশাপাশি যোগ্যতার যথাযথ বিকাশ (Equity)-কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর সিদ্ধান্ত এই নববী নীতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ একজন মেধাবী ছাত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ ছিল না; বরং একটি সুদূরপ্রসারী শিক্ষানীতির অংশ।

দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা তাঁর তারবিয়াহভিত্তিক নেতৃত্ব-এর পরিচয় বহন করে। তিনি লেখককে ছাত্রাবাসে পাঠিয়েছিলেন শুধু বেশি পড়াশোনা করার জন্য নয়; বরং একটি নিয়মতান্ত্রিক, ইবাদতমুখী এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার জন্য। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, চরিত্র গঠন ছাড়া জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না। কুরআনও শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধিকে পাশাপাশি উল্লেখ করেছে-

يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ

অর্থাৎ, তিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।২৪

২৪ সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৪।


আয়াতে ‘তাযকিয়া’ ও ‘তা’লীম’-এর যুগপৎ উল্লেখ প্রমাণ করে যে, ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞানার্জন নয়; বরং নৈতিক ব্যক্তিত্ব গঠন। ছাত্রাবাসে থাকার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) মূলত এই তাযকিয়ামুখী পরিবেশ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন।

তৃতীয়ত, এই ঘটনাটি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব (Institutional Leadership)-এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একজন সাধারণ প্রশাসক প্রতিষ্ঠানের নিয়ম প্রয়োগ করেন; কিন্তু একজন দূরদর্শী নেতা প্রতিষ্ঠানের সম্পদকে মানুষের উন্নয়নে বিনিয়োগ করেন। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) প্রতিষ্ঠানের সীমিত সম্পদকে ব্যয় করেছেন এমন একজন শিক্ষার্থীর পেছনে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সমাজ উপকৃত হতে পারে। এটি ইসলামী নেতৃত্বের সেই দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সম্পদকে ব্যক্তিগত মর্যাদার জন্য নয়; বরং উম্মাহর কল্যাণে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চতুর্থত, এই ঘটনার মাধ্যমে তাঁর অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব (Inspirational Leadership)-এরও পরিচয় পাওয়া যায়। একজন শিক্ষকের একটি বাক্য অনেক সময় শিক্ষার্থীর জীবনব্যাপী প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। “তোমাকে নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা”-এই বাক্যটি শুধু উৎসাহ ছিল না; এটি ছিল দায়িত্ব অর্পণ। একজন শিক্ষার্থী যখন উপলব্ধি করে যে, তাঁর শিক্ষক তাঁর ওপর আস্থা রাখেন, তখন সেই আস্থা তার আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আধুনিক নেতৃত্বতত্ত্বে একে Pygmalion Effect (প্রত্যাশাজনিত প্রভাব) বলা হয়; ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে এটি একজন মুরব্বির হুসনুয-যান (অন্যের প্রতি সু-ধারণা বা ভালো ধারণা পোষণ করা) ও ইতিবাচক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।

তাই, ছাত্রাবাসে থাকার এই সিদ্ধান্ত ছিল না একটি প্রশাসনিক নির্দেশ; বরং একজন রব্বানী শিক্ষকের সুদূরপ্রসারী মানুষ গড়ার কর্মসূচির অংশ। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) একজন ছাত্রের বর্তমান ফলাফলের চেয়ে তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রকৃত আলিমের দৃষ্টি কেবল বর্তমান প্রজন্মে সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি এমন মানুষ গড়ে তোলেন, যারা ভবিষ্যতে সমাজের নৈতিক নেতৃত্ব বহন করবে। এই কেস স্টাডি সেই তত্ত্বের একটি জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।

কেস স্টাডি: টিসি (Transfer Certificate)-এর ঘটনা-প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অন্তরালে একজন মুরব্বির হৃদয়
অধ্যক্ষ আবুল হাশেম (রহ.) এর তারবিয়াতপদ্ধতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্নেহ ও শাসনের ভারসাম্য। ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বে এই ভারসাম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তেমনি সীমাহীন শিথিলতা শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর আচরণে এই দুই গুণের এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়। তিনি প্রয়োজনে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতেন, কিন্তু সেই দৃঢ়তার অন্তরালে ছিল গভীর মমতা ও কল্যাণকামিতা। ফলে তাঁর শাসন ছাত্রদের কাছে ভয়ের কারণ নয়; বরং আস্থার উৎসে পরিণত হতো।

এই বৈশিষ্ট্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমার জীবনের সেই ঘটনা, যখন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের প্রয়োজনে ছাড়পত্র (Transfer Certificate) নেওয়ার প্রসঙ্গ ওঠে। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল একটি সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) বিষয়টিকে কেবল একটি আবেদনপত্র বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেননি। তিনি এর সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, সম্ভাবনা, চরিত্র ও নৈতিক বিকাশের প্রশ্নটিকেও গভীরভাবে বিবেচনা করেছিলেন।

প্রথমদিকে তাঁর অনীহাকে বাহ্যিকভাবে কঠোরতা বা প্রশাসনিক অনমনীয়তা মনে হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা ছিল একজন মুরব্বির আন্তরিক উদ্বেগ ও দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। তিনি চাইতেন, তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা কোনো শিক্ষার্থী যেন আবেগ, সাময়িক অসন্তোষ বা অপরিণত সিদ্ধান্তের বশবর্তী হয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়, যা পরবর্তীতে তার দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ ও সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গভীর মানবিক দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে-প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ছিল শিক্ষার্থীর কল্যাণ, আর প্রশাসকের ভূমিকার ঊর্ধ্বে ছিল একজন মুরব্বির দায়িত্ব। তিনি কেবল একজন Principal ছিলেন না; তাঁর আচরণে একজন প্রকৃত Murabbi-এর পরিচয়ই অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর কাছে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ছিল একটি কাগজে স্বাক্ষর করার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত আলিমের একটি বৈশিষ্ট্য হলো-তিনি মানুষের তাৎক্ষণিক চাওয়ার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন। এই ঘটনাটি সেই তত্ত্বের একটি বাস্তব উদাহরণ।

গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন স্মৃতি নয়; বরং একজন রব্বানী শিক্ষকের Educational Philosophy-এর বাস্তব প্রকাশ। প্রকৃত আলিমের আরেকটি অন্যতম পরিচয় হলো-তিনি মানুষকে কেবল শিক্ষা দেন না, বরং তাদের জীবনযাত্রার দিকনির্দেশনা দেন। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর ছাত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করলে এই তত্ত্বের একটি জীবন্ত প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা কখনোই রোল নম্বর ছিল না; তারা ছিল একটি আমানত, যাদের ইলম, আমল ও আখলাকের বিকাশ নিশ্চিত করাকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করতেন।

এই কারণেই তাঁর প্রভাব শ্রেণিকক্ষের সময়সীমা অতিক্রম করে ছাত্রদের জীবনব্যাপী স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। একজন শিক্ষক পাঠদান শেষ হলে তাঁর দায়িত্ব শেষ হতে পারে; কিন্তু একজন মুরব্বির প্রভাব তাঁর ছাত্রদের চরিত্র, সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধ এবং কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘকাল প্রবাহিত হয়। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর উত্তরাধিকারও মূলত এই মানুষ গড়ার মধ্যেই নিহিত। তাঁর প্রকৃত কীর্তি কেবল প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা সেই মানুষগুলো, যারা আজও তাঁর শিক্ষা ও আদর্শের ধারক হিসেবে সমাজে ভূমিকা পালন করছেন।

আরো কয়েকটি ঘটনা না বললেই নয়-

বিবাহের খুতবা-শিক্ষকের সম্পর্কের স্থায়িত্ব
সাধারণত একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ২০১২ সালে আমার বিবাহে মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর উপস্থিতি এবং খুতবা প্রদান প্রমাণ করে যে, তিনি শিক্ষকতার সম্পর্ককে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি। ইসলামী ঐতিহ্যে একজন মুরব্বির দায়িত্ব ছাত্রের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতেও অব্যাহত থাকে। তিনি ছাত্রকে শুধু জ্ঞান দেন না; বরং জীবনের নতুন অধ্যায়েও নৈতিক দিকনির্দেশনা দেন। এই ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি দিক তুলে ধরে-তিনি মানুষকে শিক্ষার্থী হিসেবে নয়; আজীবন আমানত হিসেবে দেখতেন। এখানেই রব্বানিয়‍্যাতের সামাজিক রূপ প্রকাশিত হয়।

শেষ সাক্ষাৎ-রোগশয্যাতেও একজন শিক্ষকের মমতা
২০১৩ সালে ঢাকার ইবনে সিনা, ধানমণ্ডি-তে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনের আরেকটি মানবিক ও আবেগঘন দিক আমার সামনে উন্মোচিত হয়। তখন আমি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলেছিলাম, “আপনার অসুখ ভালো হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।” আমার সামান্য আশ্বাসের পর তিনি শিশুসুলভ সরলতা ও গভীর প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন- “তুই কি সত্যি বলছিস?” সেই মুহূর্তটি আজও আমার স্মৃতিতে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং আমাকে আবেগ তাড়িত করে। তাঁর এই সরল প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, কঠোর শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার আড়ালে তিনি ছিলেন গভীর আবেগ, বিশ্বাস, মমতা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ। তাঁর এই মানবিক সত্তাই তাঁর শিক্ষাদর্শকে আরও গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছিল।

আমার সাথে তাঁর শেষ সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা সম্ভবত এই গবেষণার সবচেয়ে মানবিক উপাদান। কারণ অসুস্থতার মধ্যেও মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর আন্তরিকতা, ছাত্রদের প্রতি তাঁর খোঁজখবর এবং মানসিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, শিক্ষকতা তাঁর কাছে কোনো পেশাগত ভূমিকা ছিল না; বরং ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। মানুষ সাধারণত অসুস্থতার সময় নিজের কষ্ট নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু একজন রব্বানী আলিম নিজের শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেও অন্যের কল্যাণের কথা ভাবেন। এই আচরণ রাসূলুল্লাহ-এর সুন্নাহরই প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তিগত কষ্ট কখনো মানবিক দায়িত্বকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। তাই রব্বানিয়‍্যাতের অন্যতম লক্ষণ হলো-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলেও চরিত্র পরিবর্তিত হয় না। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবনের এই শেষ পর্ব সেই নীতির বাস্তব সাক্ষ্য বহন করে।

৮. শৃঙ্খলা, জ্ঞানচর্চা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ-এক তারবিয়াতভিত্তিক ত্রিমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শকে বোঝার জন্য আলাদা আলাদা ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ কম। তাঁর জীবন ও কর্মপদ্ধতির ভেতরে শৃঙ্খলা, জ্ঞানচর্চা এবং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ-এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তিনি এমন এক তারবিয়াতভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে বাহ্যিক আচরণ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ-তিনটিই একই সুতায় গাঁথা ছিল।

৮.১ ছাত্রদের আমল-আখলাক সংশোধনে পরিদর্শন
আবুল হাশেম (রহ.) এর ছাত্র-তদারকি ও আমল-আখলাক সংশোধনের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও সরাসরি। তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না; বরং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ এবং সামাজিক অভ্যাস পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। একদিন শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন ক্লাসে পরিদর্শনে আসেন এবং কারো টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলে থাকা, কারো অযথা চুলের স্টাইল-এসব বাহ্যিক শৃঙ্খলাগত ত্রুটি সংশোধন করে দিচ্ছিলেন। প্রথম দৃষ্টিতে এটি কঠোরতা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল এক গভীর শিক্ষাদর্শের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর লক্ষ্য ছিল এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা শুধু জ্ঞান নয়, চরিত্র ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও আদর্শ হবে। এই বাহ্যিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই তিনি অন্তর্নিহিত আত্মশুদ্ধির ভিত্তি নির্মাণ করতেন। অনন্য মাত্রা প্রদান করেছিল।

৮.২ প্রতি বৃহস্পতিবারের সাপ্তাহিক জলসা
মাদরাসায় প্রতি বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক জলসা ছিল তাঁর জ্ঞানচর্চাভিত্তিক শিক্ষাদর্শের প্রাণকেন্দ্র। এটি ছিল একটি উন্মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, যেখানে পাঠ্যবইয়ের সীমা অতিক্রম করে বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা হতো। সীরাত, নাহু-সরফ, ফিকহ এবং অন্যান্য জ্ঞানশাখা নিয়ে শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করত। বিশেষ করে নাহু-সরফের আলোচনায় শব্দের বিশ্লেষণ ও তাহকীক নিয়ে যে প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হতো, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর আগ্রহ ও প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করত। এই জলসা ছিল কেবল পাঠদান নয়, বরং চিন্তাশক্তি, যুক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বিকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই, মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শ ছিল এক জীবন্ত তারবিয়াতি কাঠামো- যেখানে শৃঙ্খলা ছিল ভিত্তি, জ্ঞানচর্চা ছিল প্রাণ, এবং ছাত্রের ভবিষ্যৎ ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য। কিন্তু এই তিনটি উপাদানকে একত্রে যুক্ত করেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি-ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই তাঁকে কঠোরতার মধ্যে নরম, শৃঙ্খলার মধ্যে মানবিক এবং শিক্ষার মধ্যে জীবন্ত করে তুলেছিল।

৮.৩ চরিত্র গঠনকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ
একজন প্রকৃত আলিমের প্রধান কাজ কেবল তথ্য পরিবেশন নয়; বরং মানুষের চরিত্র নির্মাণ। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) এই আদর্শকে তাঁর শিক্ষা-দর্শনের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা তখনই পূর্ণতা লাভ করে যখন তা মানুষের আখলাক ও আচরণে প্রতিফলিত হয়। এজন্য তিনি ছাত্রদের আমল, পোশাক-পরিচ্ছদ, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর আকস্মিক শ্রেণি-পরিদর্শন, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ছাত্রদের সার্বিক চরিত্র গঠনের প্রচেষ্টা ছিল এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রয়োগ।

৯. বিনয়: প্রকৃত আলিমের অলংকার
আলিমের অন্যতম পরিচয় তাঁর তাওয়াজু (تواضع) বা বিনয়। যত বেশি জ্ঞান বৃদ্ধি পায়, প্রকৃত আলিম তত বেশি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) ছিলেন এই গুণের অনন্য উদাহরণ। আরবি ভাষা, হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কখনো প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসেননি। বরং নীরবে কাজ করাকেই তিনি পছন্দ করতেন। নিজের অর্জনকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখেননি; বরং আল্লাহর অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এই বিনয়ই তাঁকে ছাত্র, সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল।

১০. প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও উম্মাহ গঠনের দৃষ্টিভঙ্গি
একজন প্রকৃত আলিম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও অধ্যয়নে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তিনি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পরও দ্বীনের খেদমত চালিয়ে যায়। এই বিবেচনায় মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.) ছিলেন একজন সফল প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা। জামেয়া কাসেমিয়া, নরসিংদীর উন্নয়ন, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী-কে ধাপে ধাপে উচ্চতর স্বীকৃতির পর্যায়ে উন্নীত করা এবং ফেনী রেসিডেন্সিয়াল মডেল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা-এসব তাঁর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের সাক্ষ্য বহন করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আদর্শভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বহু প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারে।

১১. ছাত্র তৈরির মধ্যেই নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা
প্রকৃত আলিমের প্রকৃত সম্পদ তাঁর ছাত্রসমাজ। তিনি নিজের প্রতিভার চেয়ে উত্তরসূরি তৈরির দিকে অধিক মনোযোগী হন। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন এই নীতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। তিনি মেধাবী ছাত্রদের খুঁজে বের করতেন, তাদের জন্য আবাসন, শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ও মানসিক প্রেরণার ব্যবস্থা করতেন। তাঁর কাছে প্রতিটি ছাত্র ছিল ভবিষ্যতের একজন দায়িত্বশীল আলিম ও সমাজনেতা। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র আজ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা, দাওয়াহ ও সমাজসেবার দায়িত্ব পালন করছেন-যা তাঁর জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট উত্তরাধিকার।

১২. সমাজসংস্কার ও দাওয়াহমুখী চিন্তা
একজন আলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নন; বরং তিনি সমাজের নৈতিক পুনর্গঠনের অগ্রদূত। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবনেও এই বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ পরিবর্তনের সূচনা হয় মানুষের অন্তরের পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাই তাঁর শিক্ষা, দাওয়াহ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক, আল্লাহভীরু ও আদর্শবান মানুষ তৈরি করা। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততাও এই সমাজবিনির্মাণমুখী চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।

১৩. কর্মমুখী নেতৃত্ব
সত্যিকারের আলিম কথার চেয়ে কর্মে বেশি বিশ্বাসী। মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন ছিল এর বাস্তব উদাহরণ। তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে শিক্ষা, প্রতিষ্ঠান, ছাত্রগঠন এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন। তাঁর নীরব কিন্তু কার্যকর নেতৃত্ব বহু প্রতিষ্ঠানকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষের জীবনকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে।

অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রহ.)-এর জীবন ছিল ইলম, আমল, তারবিয়াত, বিনয় ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল সমন্বয়। তিনি আল-কুরআনকে চরিত্রগঠনের ভিত্তি এবং ছাত্রাবাসকে তারবিয়াতের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশাসনিক দায়িত্বেও তিনি ছিলেন একজন পিতৃসুলভ মুরব্বি-শাসনের পাশাপাশি স্নেহ, কঠোরতার পাশাপাশি মমতা এবং সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মানবিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি শুধু একজন মুহাদ্দিস বা অধ্যক্ষ ছিলেন না; বরং একজন রব্বানী আলিম ও আদর্শ নির্মাতা, যিনি নিজের জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে নিবেদন করেছেন এবং শিক্ষা ও চরিত্রগঠনের মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে আলোকিত করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো পদ বা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের জীবন ও চরিত্র। তিনি আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, আদর্শ, ভালোবাসা ও স্মৃতি আজও হৃদয়ে জীবন্ত। আল্লাহ তা’আলা তাঁর ইলম ও খেদমত কবুল করুন, কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।

গ্রন্থপঞ্জী
১. আল-কুরআন।
২. সহীহ বুখারী।
৩. সহীহ মুসলিম।
৪. সুনানু আবি দাউদ।
৫. জামে’ আত-তিরমিজি।
৬. সুনানু ইবনি মাজাহ।
৭. মিশকাতুল মাসাবীহ।
৮. ড. আহমদ আলী, প্রকৃত আলিমের সন্ধানে, ঢাকা: গার্ডিয়ান পাবলিকেশন।

অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন

১৯ জুন, শুক্রবার মরহুম অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিজ গ্রামে অবস্থিত ছমদ আলী হাজী জামে মসজিদে অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এক স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ) দেশ-বিদেশে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্ঞান অন্বেষণ, শিক্ষা বিস্তার এবং মানুষ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করে গেছেন। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ড বিনির্মাণে তিনি ছিলেন এক অক্লান্ত সাধক।

ফাউন্ডেশনের সভাপতি নাছিরুদ্দিন সরকার বলেন, “আমরা এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই। বিশেষ করে মরহুমের নিজ গ্রামে তাঁর নামে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও সেবাধর্মী কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাই।”

বক্তারা আরও বলেন, অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ইখলাসের কারণেই তিনি হাজার হাজার আলেম, শিক্ষাবিদ ও সুনাগরিক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর ছাত্ররা আজও মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাছিরুদ্দিন সরকার, মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন, মাওলানা ফয়জুল্লাহ, মাওলানা সাইফুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট সাইফুল্লাহ নোমান, জোবায়ের, মোশাররফ হোসেন, ডা. গালিব মোঃ আসাদুল্লাহসহ ফাউন্ডেশনের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মসজিদে নগদ আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠান শেষে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া পরিচালনা করা হয় এবং উপস্থিত সবার মাঝে তবারক বিতরণ করা হয়। পরবর্তীতে ফাউন্ডেশনের সদস্যবৃন্দ মরহুম অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হাশেম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কবর জিয়ারত করেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করেন।

সংখ্যালঘু মুসলিমদের ক্ষমতায়নে ইসলামি শিক্ষা: সামাজিক দৃঢ়তার একটি আদর্শিক অনুসন্ধান

(মূল শিরোনাম: Islamic Education and Social Resilience: A Normative Inquiry into Muslim Minority Empowerment)

মূল উৎস: ASEAN Journal of Islamic Studies and Civilization (AJISC), Vol. 01 No. 2, December 2024, pp. 171-201.

অনুবাদ সম্পর্কিত নোট:

(নিচের লেখাটি ‘ASEAN Journal of Islamic Studies and Civilization’ জার্নালে প্রকাশিত একটি মূল গবেষণাপত্রের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ ও সারসংক্ষেপ। মূল গবেষকদের যুক্তি, তাত্ত্বিক কাঠামো ও ফলাফল প্রাঞ্জল বাংলায় তুলে ধরা হয়েছে)

অনুবাদক: মুহাম্মদ আব্দুহু

ভূমিকা: সংখ্যালঘুদের নতুন বাস্তবতা ও সংকট

বিশ্বব্যাপী মানুষের অভিবাসন ও বৈশ্বিক মিশ্রণের ফলে পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম সংখ্যালঘুদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এই সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও মানসিক জীবনে নানা বাধা দেখা দিচ্ছে। ইসলামোফোবিয়া, পদ্ধতিগত বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বহিষ্কার এবং নিজেদের ধর্মীয় অনুশীলন (যেমন মসজিদ নির্মাণ বা হিজাব পরিধান)-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ—এসব চ্যালেঞ্জ তাদের প্রতিদিনের জীবনে গভীর মানসিক চাপ তৈরি করছে।

গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন যে, এই সমস্যা একদিনের নয়। ইতিহাসের বিচ্যুত সহনশীলতার নীতি—যেখানে প্রাথমিক ইসলামি রাষ্ট্র ‘আহলে কিতাব’ বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষা দিলেও খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলো সেই পারস্পরিক সুবিধা মুসলিমদের দিত না—এই বৈষম্যের শেকড় গভীর করেছে। এর ফলে সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে একটি ‘অদৃশ্য ও অশ্রুত’ অনুভূতি তৈরি হয়েছে, যা তাদের সামাজিক সংহতি ও দৃঢ়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল: প্রতিকূল পরিবেশে মুসলিম সংখ্যালঘুদের টিকে থাকার এবং সমাজে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার শক্তি, অর্থাৎ ‘সামাজিক দৃঢ়তা’ (Social Resilience), আসলে কোথায় থাকে? ইসলামি শিক্ষা এই দৃঢ়তা তৈরিতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে?

সামাজিক দৃঢ়তার তাত্ত্বিক কাঠামো: তিনটি স্তর

সামাজিক দৃঢ়তা কেবল কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নয়, এটি প্রতিকূলতাকে সুযোগে পরিণত করার একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। আধুনিক তত্ত্ববিদদের (যেমন কেক ও সাকদাপোলরাক) অনুসারে একে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. মোকাবিলা সক্ষমতা (Coping Capacity): তাৎক্ষণিক বিপদ বা মানসিক চাপ মোকাবিলা করা। এটি প্রতিক্রিয়াশীল বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ।

২. অভিযোজন সক্ষমতা (Adaptive Capacity): পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। এটি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিখন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ।

৩. রূপান্তরমূলক সক্ষমতা (Transformative Capacity): প্রতিষ্ঠান গঠন, নেতৃত্ব তৈরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটানো।

গবেষকগণ যুক্তি দিয়েছেন যে, রূপান্তরমূলক সক্ষমতা অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন কারণ এটি ‘সামষ্টিক সংস্থা’ বা দলীয় শক্তির ওপর নির্ভরশীল। এককভাবে কেউ সমাজ বদলাতে পারে না, কিন্তু ইসলামি শিক্ষা এই সামষ্টিক শক্তি অর্জনের পথ দেখায়।

ইসলামি শিক্ষা: প্রাচীন ভিত্তি ও আধুনিক প্রয়োজন

ইসলামি শিক্ষাকে গবেষণায় কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেখানোর বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। একে ব্যক্তির সামগ্রিক বিকাশের (বুদ্ধি, চরিত্র ও আধ্যাত্মিক) একটি সুষম ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মূল ভিত্তি ‘তালীম’ (জ্ঞান), ‘তারবিয়াহ’ (মানসিক বিকাশ) এবং ‘তাদীব’ (শৃঙ্খলা)।

গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি শিক্ষাকে একদিকে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক ভিত্তি ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে আধুনিক ডিজিটাল যুগের চাহিদা (সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান) মোকাবিলা করতে হবে। যদি শিক্ষা স্থির থাকে, তবে তা আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হবে; আর যদি মূল নীতি ছাড়াই আধুনিক হতে চায়, তবে তা নিজের পরিচয় হারাবে। সংখ্যালঘুদের জন্য এই ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যাবশ্যকীয়, যাতে তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় টিকিয়ে রেখে সমাজের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে।

শিক্ষা ও দৃঢ়তার সংযোগ: যুক্তির মিল

এই গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো ইসলামি শিক্ষার নীতিগুলোকে সামাজিক দৃঢ়তার তিনটি স্তরের সাথে যুক্ত করা:

১. আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও মোকাবিলা সক্ষমতা:

ইসলামি শিক্ষায় শেখানো সবর (ধৈর্য), তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) এবং শুকর (কৃতজ্ঞতা)—এই তিনটি মূল্যবোধ মানুষকে বৈষম্য বা মানসিক চাপের মুখোমুখি হলে ভেঙে পড়তে দেয় না। ‘সবর’ এখানে কেবল নিষ্ক্রিয় সহ্য করা নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় মোকাবিলা কৌশল। যখন একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তি জানেন যে তার কষ্ট আল্লাহর নজরে আছে এবং এর প্রতিদান আখেরাতে আছে, তখন তিনি মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে বিপদ মোকাবিলা করতে পারেন। এটি তাদের ‘মোকাবিলা সক্ষমতা’ বৃদ্ধি করে।

২. বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও অভিযোজন সক্ষমতা:

ইসলামি শিক্ষা যুক্তি, বিশ্লেষণ ও জ্ঞান অন্বেষণকে উৎসাহিত করে। ইবনে খালদুনের মতো পণ্ডিত মুখস্থ করণের বিরোধিতা করেছেন এবং সমালোচনামূলক চিন্তার ওপর জোর দিয়েছেন। এই শিক্ষা মুসলিমদের আধুনিক সমাজে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। যেমন—ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থায় টিকে থাকা, নতুন পেশা শিখন বা প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া। এটি তাদের ‘অভিযোজন সক্ষমতা’ বাড়ায়।

মূল লেখকদের পরিচয়:

এই গবেষণাপত্রের মূল লেখকগণ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক:

১. মাওলানা উইজাকসোনো (Maulana Wijaksono): মিশরের কায়রোতে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-এর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের গবেষক।

২. মুহদি মুহদি (Muhdi Muhdi): ইন্দোনেশিয়ার আনতাসারি স্টেট ইসলামিক ইউনিভার্সিটি-র তারবিয়াহ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ অনুষদের অধ্যাপক।

৩. বারকাতিল্লাহ (Barkatillah): ইন্দোনেশিয়ার এসটিএআই রাখা আমুনতাই প্রতিষ্ঠানের গবেষক।

৪. ওলেক্সান্দর সামোইলেঙ্কো (Oleksandr Samoilenko): ইউক্রেনের ডনিপ্রো হিউম্যানিটারিয়ান ইউনিভার্সিটি-র গবেষক।৩. সামষ্টিক চেতনা ও রূপান্তরমূলক সক্ষমতা:

ইসলামি শিক্ষার ‘উম্মাহ’ (সামষ্টিক সম্প্রদায়) এবং ‘খলিফাতুল্লাহ’ (আল্লাহর প্রতিনিধি) ধারণা মুসলিমদের ব্যক্তিগত কল্যাণের বাইরে গিয়ে সমাজের জন্য কাজ করতে প্রেরণা দেয়। এটি তাদের নেতৃত্ব গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম করে। যখন সংখ্যালঘুরা সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয়, তখন তারা আর বিচ্ছিন্ন ‘আউটসাইডার’ থাকে না, বরং সমাজের গতিপথ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। এটি হলো প্রকৃত ‘রূপান্তরমূলক সক্ষমতা’।

প্রাচীন পণ্ডিতদের দৃষ্টিভঙ্গি: গভীর বিশ্লেষণ

গবেষণায় দুইজন প্রাচীন পণ্ডিতের শিক্ষাদর্শনকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে:

আল-গাজ্জালী: তিনি শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনকে মুখ্য বিবেচনা করতেন। তার মতে, শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যায়, যা তাদের নৈতিক দৃঢ়তা দেয়। তিনি শিক্ষককে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে দাঁড় করানোর কথা বলেছেন। আল-গাজ্জালীর দর্শন সংখ্যালঘুদের মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের পথ দেখায়, যাতে তারা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পতিত হয় না।

ইবনে খালদুন: তিনি শিক্ষাকে বাস্তব ও প্রায়োগিক দিক থেকে দেখতেন। তিনি কেবল মুখস্থ করার পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন, যা বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। তিনি শিশুর প্রাথমিক বয়সেই সামাজিক মূল্যবোধ শেখানো এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। তার দর্শন সংখ্যালঘুদের আধুনিক সমাজে মানিয়ে নেওয়ার ও নেতৃত্ব দেওয়ার বাস্তব পথ দেখায়।

উপসংহার: শিক্ষা থেকে ক্ষমতায়ন

গবেষকগণ উপসংহারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইসলামি শিক্ষা সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য কেবল একটি ‘সুরক্ষা কবচ’ নয়, বরং এটি একটি ‘ক্ষমতায়নের হাতিয়ার’। এটি তাদের নিষ্ক্রিয় সহ্যকারী হতে দেয় না, বরং সক্রিয় ও সমন্বিত সামাজিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। প্রতিকূলতাকে কেবল কষ্ট হিসেবে দেখার বদলে, ইসলামি শিক্ষা তাদের সেই কষ্টকে সামাজিক সম্প্রীতি, ন্যায়বিচার ও টেকসই দৃঢ়তায় রূপান্তরিত করার শিক্ষা দেয়। এটি তাদের নিজেদের পরিচয় নিয়ে সংহতি অর্জনের সাথে সাথে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের অংশীদার হতে শেখায়।

মূল আর্টিক্যাল রেফারেন্স ও লিংক

Citation:

Wijaksono, M., Muhdi, M., Barkatillah, & Samoilenko, O. (2024). Islamic Education and Social Resilience: A Normative Inquiry into Muslim Minority Empowerment. ASEAN Journal of Islamic Studies and Civilization (AJISC), 1(2), 171-201.

DOI Link:

https://doi.org/10.62976/ajisc.v1i1.1438

(পাঠকগণ উপরের লিংকে ক্লিক করে মূল ইংরেজি গবেষণাপত্রের পূর্ণাঙ্গ পিডিএফ সংস্করণ ডাউনলোড করতে পারবেন)

তুরস্কের তানযিমাত, ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডি, আরবদের বোকামির দন্ড এবং ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা!

ইসলামী সভ্যতার উত্থান আরবের মরুভূমিতে হলেও খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এ সভ্যতা বিশ্ব জয় করে নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব আরবদের থেকে অনারবদের হাতে চলে যায়। নেতৃত্ব প্রথমে যায় পারস্যের নিকট। কিন্তু এটা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এরপর ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব চলে যায় তুর্কিদের নিকট। তুর্কিরা বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দেয় প্রায় সাত শতাব্দী ধরে। এরপর পশ্চিমাদের আগ্রাসনে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা বাজে।

শিল্পবিপ্লব (১৭৬০), ফরাসী বিপ্লব (১৭৮৯) ও বিজ্ঞান বিপ্লবের (১৮৫০) ঢেউ খুব দ্রুত পুরো ইউরোপসহ তাদের উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বড় একটা অংশ যেহেতু অটোমান সাম্রাজ্যো অধীনে ছিলো সেহেতু এই তিন বিপ্লবের ধাক্কা তাদের গায়ে লাগে। শিল্প ও বিজ্ঞান বিপ্লবের সাথে খাপ খাইতে না পেরে তুর্কি সাম্রাজ্য আর্থিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

ফরাসী বিপ্লবের আঘাতে তুরস্কে তানযিমাত (সংস্কার) শুরু হয়েছিলো। তানযিমাত অর্থ পুনর্গঠন। ১৮৩৯ সাল থেকে শুরু করে ১৮৭৬ সালের তুরস্কের প্রথম সাংবিধানিক যুগের শুরু পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্যের সংস্কারমূলক কাজগুলো বোঝাতে তানযিমাত যুগ বলা হয়। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে আধুনিক করে তোলার প্রচেষ্টা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও আগ্রাসী শক্তি থেকে সাম্রাজ্যের সীমানার সুরক্ষাসহ আরো অনেক কাজের জন্য এই সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করছে। ১৮০০ সালের পরবর্তি সময়ে ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে তুর্কিদের অধীনস্থ অনেক জাতির মাঝে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এ প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে অটোমানদের পক্ষে। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তুর্কি সুলতান বিভিন্ন সংস্কার শুরু করেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ এলাকার মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে থামাতে এই প্রচেষ্টা চালানো হয়। ১৮৩২ সালে এসে লন্ডন চুক্তির আলোকে তুরস্ক থেকে গ্রিস পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যায়। বলকান অঞ্চলের অটোমান অধীনস্থ অন্যান্য দেশগুলোতেও বিদ্রোহের দাবানল বিস্ফোরিত হতে থাকে।

‘তানজিমাত’ নামে তুরস্কে সার্বিক আধুনিকায়ন শুরু করেন সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৭৮৫-১৮০৮-১৮৩৯)। তবে তিনি খুব বেশি সংস্কার কাজ করার সময় পাননি। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের মৃত্যুর পর তানযিমাতের কাজ এগিয়ে নেন সুলতান প্রথম আব্দুল মজিদ (১৮৩৯-১৮৬১)। ইনি মোটামুটি দুই দশকের লম্বা সময় পান। ১৮৩৯ সালে সূচিত তুরস্কের ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় ছিলো কৃষি, শিল্প, অর্থ, শিক্ষা, আইন, ভূমি, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার প্রভৃতি অনেক কিছুই। অধিক নাগরিক স্বাধীনতা ও সমানাধিকার দেয়ার মাধ্যমে অমুসলিম সম্প্রদায় ও তুর্কি ভিন্ন জাতিগুলোকে উসমানীয় সমাজের মূলধারায় আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

  • ১৮৪০ সালে প্রথম উসমানীয় ব্যাংক নোটের প্রচলন করা হয়, সাম্রাজ্যের প্রথম ডাকঘর প্রচলন করা হয়, ফরাসি রীতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন করা হয়, ফরাসি রীতিতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের পুনর্গঠন করা হয়।
  • ১৮৪৪ সালে আদমশুমারি শুরু করে তুর্কিরা।
  • ১৮৪৮ সালে প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে।
  • ১৮৫৬ সালে অমুসলিমদের জন্য জিজিয়া করের অবলুপ্তি করে।
  • ১৮৫৭ সালে ভূমি আইন প্রণয়ন করে।
  • ১৮৭৬ সালে প্রথম সাম্রাজ্যের সংবিধান প্রণয়ন করে।

মূলত অটোমানকর্তৃক পশ্চিমা ধাচে সংস্কার কার্যক্রম কর্মসূচী গ্রহন করতে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাচ্যের সাম্রাজ্যগুলোর পতন চূড়ান্ত হয়েছিলো। এবং সুনির্দিষ্ট করে বললে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা বেজে গিয়েছিলো এ সময়ে। ঠিক এ সময়টিকে সর্বগ্রাসী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত সফলতার সময় বলা যায়। এ সময়ে পারস্যের সাফাভিদ কিংবা ভারতের মোগলরা নাই। আটোমানদের পর এ দুইটা ছিলো বড় মুসলিম সাম্রাজ্য। মুসলিমদের বাইরে এশিয়া ও আফ্রিকায় অন্য কোনো সাম্রাজ্যও তখন আর ছিলো না। প্রায় সব কিছু ইউরোপীয়ানদের দখলে চলে যায়।

শিল্প ও বিজ্ঞান বিপ্লবের মাধ্যমে ইউরোপে যে বিশাল পুঁজির পাহাড় তৈরি হয় তার ছিটেফোঁটাও তুরস্কে হয় না। শিল্প বিপ্লবে অংশ নিতে না পারা বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে পিছিয়ে পড়ে। তাদের ভাগ্যে পরাজয়ের পর পরাজয় জুটতে থাকে। এ সুযোগটা কাজে লাগায় চীরপ্রতিদ্বন্দ্বি রাশিয়া। ১৮৫০ সাল নাগাদ উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি বলে অবিহিত করতে থাকে রুশ সম্রাট জার প্রথম নিকোলাস (১৮২৫-১৮৫৫)। এখানে ব্যক্তি বলতে দেশ বুঝানো হয়। রুশদের থেকে এই প্রচারণা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। অটোমানরা তখনো টিকে থাকলেও অস্তিত্বের লড়াই করতে থাকে।

এখানে আলাদা করে তুর্কিদের ১৮৫৭ সালের ভূমি সংস্কার আইন নিয়ে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে। তানযিমাতের অংশ হিসেবে উসমানীয়রা নতুন ভূমি নীতি প্রণয়ন করে। এ নীতিমালার আলোকে ভূমির মালিকানার কাঠামোতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। কর ব্যবস্থাকে সুসংহত করার জন্য জমির নিবন্ধন করতে বলা হয় সাম্রাজ্যের সর্বত্র। আরব ফিলিস্তিনিরা অধিকাংশ ছিলো কৃষক, তেমন শিক্ষাদীক্ষা ছিলো না তাদের। এই মানুষগুলো সরকারকে কর দিতে অনিচ্ছুক ছিলো। আর্থিক কষ্টে থাকা তুর্কি প্রশাসনের দরকার টাকা। কিন্তু আরব নাগরিকরা সেটা বুঝতে রাজি না। এ সময় স্থানীয় চালাক মুখতাররা নিজেদের নামে জমির নিবন্ধন করা শুরু করে। ঠিক এ সময়ে রাশিয়ান ইহুদী নেতা এলিয়ার ফিলিস্তিনে জমি কেনার অনুমতি প্রার্থনা করে অটোমানদের নিকট। ইহুদীরা অটোমান প্রশাসনকে নিশ্চয়তা দেয় নিয়মিত খাজনা আদায়ের। অটোমানরা খুশি হয়ে ইহুদীদেরকে আরব ভূখন্ডে জমি ক্রয়ের অনুমতি দেয়। এ সময়ে দলে দলে রাশিয়ার ইহুদীরা পরিকল্পিতভাবে আরবের স্থানীয় কৃষকদের সাথে এবং মুখতারদের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে জমি কিনতে থাকে। অতিরিক্ত দাম পেয়ে স্থানীয় আরব কৃষকরা খুশি, নিয়মিত খাজনা পেয়ে অটোমান সম্রাটও খুশি। স্থানীয় আরব মুসলিম জমির দালালরা বিভিন্ন উপায়ে কৃষকদের থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে নতুন ইহুদি অভিবাসীদেরকে দিতে থাকে।

প্রথমে রাশিয়ান ইহুদীরা, তারপর জার্মান ইহুদীরা, এরপর পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে দলে দলে ইহুদীরা আরব ভূখন্ডে বসতি স্থাপন করতে লাগলো বিভিন্ন উপায়ে। আরব ভূখন্ড বলতে সমগ্র আরব না, তারা পরিকল্পিতভাবে ভূমি অধিগ্রহন করতে লাগলো ফিলিস্তিনে। ইহুদীবাদী জায়োনিস্ট আন্দোলন শুরু হয় আরো অন্তত দুই দশক পরে। তার আগেই অর্থাৎ অটোমানদের তানযিমাতের সময় নতুন ভূমি নীতিকে কাজে লাগিয়ে ইহুদীরা ফিলিস্তিন ভূমি দখলের সূত্রপাত করে। কিন্তু এ বিষয়টা না অটোমানরা বুঝলো, না আরবরা বুঝলো। পরবর্তি শতাব্দীর ইতিহাস তো আমাদের সবার জানা।

ইউরোপীয়দের ঐতিহাসিক ইহুদী বিদ্বেষের কথা সর্বজনবিদিত। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের প্রভাব কমতে থাকলে এবং ইউরোপীয়দের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাড়তে থাকলে শুরুর দিকে ইহুদী নির্যাতন বাড়ে। আবার ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব যখন বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন ইহুদী নির্যাতন কমতে থাকে। কিন্তু ইউরোপে ইহুদীদের বিদ্ধে এক ধরণের সামাজিক বর্ণবিদ্বেষ লেগেই ছিলো। শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা কমলেও মানসিক নির্যাতন তখনো বর্তমান ছিলো। ইহুদীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হতো। নির্যাতিত হতে হতে ইহুদীরা ভাবলো এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। এই চিন্তা থেকেই নতুন করে ইহুদীবাদের জন্ম।

১৮ শতক পর্যন্ত দেখা যায়, ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। বিশেষ করে রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রে তারা বেশি পরিমাণে ছিলো। প্রকৃতপক্ষে ইহুদীবাদের জন্ম হয় ফরাসী বিপ্লবের মধ্যদিয়ে জার্মানের রথচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অনেক ইহুদী জ্ঞানী দার্শনিক একটি ইহুদী রাষ্ট্রে চিন্তা করেন যেটি তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থলে হবে। এই চিন্তকদের অধিকাংশই বসবাস করতো জার্মানে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেই আন্দোলন সেটাকে জায়নিস্ট আন্দোলন বলা হয়। Zion মূলত জেরুজালেমের একটি প্রাচীন পাহাড়।

১৮ এবং ১৯ শতকে ইহুদীদের মধ্যে ‘Haskala’ নামক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিমা ধর্মীয় নিরপেক্ষ শিক্ষা এবং সংস্কৃতির সাথে হিব্রু ধর্মীয় শিক্ষার একটা মেলবন্ধন করে। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিলো জার্মানের বার্লিন। ইহুদীদের এসব তৎপরতার দ্বিতীয় কেন্দ্র ছিলো ইংল্যান্ডে। রথচাইল্ড পরিবারের ব্যাংক ব্যবসার দ্বিতীয় কেন্দ্র ছিলো ইংল্যান্ড। এবং ইহুদীবাদের তৃতীয় কেন্দ্র ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। অর্থাৎ যেখানেই শিল্পবিপ্লব প্রসার লাভ করছিলো সেখানেই পুঁজিবাদের হাত ধরে ইহুদীরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করছিলো।

১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্রাসেলস এ প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। থিউডোর হার্জেল ছিলো এই কংগ্রেসের উদ্যোক্তা। এরপর প্রতি দুই বছর অন্তর জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু করে। তারা জেরুজালেম কেন্দ্রীক একটা ইহুদী রাষ্ট্র দাবী করে ১৯০২ সালের দিকে। জেরুজালেমসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন অটোমানদের অধীনে। অটোমান সুলতান ইহুদীদের এই দাবী নাকচ করে দেয়। ইহুদীরা এরপর বিকল্পের জন্য ধরনা দিতে থাকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট। এর মাঝে ছিলো ব্রিটেন, জার্মান, রাশিয়া। অটোমানরা প্রস্তাব করলো আফ্রিকার উগান্ডাতে ইহুদী রাষ্ট্র হতে পারে। জার্মানও অটোমানদের এই প্রস্তাবে সায় দিলো। অটোমান ও জার্মানের উপর অন্য কেউ তেমন কিছু বলতে পারলো না। ইহুদীরাও মন্দের ভালো হিসেবে আপাতত মেনে নিয়েছিলো এই প্রস্তাব। পরবর্তিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে এই প্রস্তাব ভেস্তে যায়। এতে অবশ্য ইহুদীরা খুশিই হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষাবলম্বন করলে ব্রিটেন সাথে সাথে মিসর ও সুদান দখলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। অবশ্য সেখানে ১৮৮২ থেকেই ব্রিটিশ সৈন্য ছিলো। যুদ্ধ শেষে পরাজিত অটোমানদের সকল ভূখণ্ড ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভাগ করে নেয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষে তুরস্কের মূল ভূমিও ব্রিটেন, ফ্রান্স দখল করে নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু তুর্কি সেনাপতি মোস্তফা কামাল পাশা বীরবিক্রমে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে প্রতিরোধ করে (১৯১৯-১৯২৩)। এতে করে টিকে যায় তুরস্কের মূল ভূখণ্ড।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর পুরো আরব এলাকা চলে যায় যুক্তরাজ্য- ফ্রান্সের অভিভাবকত্বে। মূলত আরবরাই তুরস্ককে তাড়িয়ে ইউরোপীয় দস্যুদেরকে ডেকে এনেছে। যুদ্ধ শেষে আরবদেরকে স্বাধীনতা দেয়ার পরিবর্তে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স আরব ভূখণ্ডকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করে নেয়। ১৮৮৪ সালে যেমনি তারা আফ্রিকা ভাগ করেছিলো ঠিক তেমনটা। পার্থক্য হচ্ছে আফ্রিকা ছিলো বিশাল এলাকা এবং ভাগ কারী রাষ্ট্রও ছিলো ৮টি। আর এখানে আরব উপদ্বীপ হচ্ছে তুলনামূলকভাবে ছোটো এলাকা এবং দখলদার হচ্ছে ২টি রাষ্ট্র। অন্য ইউরোপীয়রা আরব ভূখণ্ড ভাগ চাইতে এলো না। আরবদের নিকটবর্তী মিশর অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশদের দখলে ছিলো। কারণ ভূমধ্য সাগর থেকে মিশর হয়ে সুয়েজ খাল দিয়ে ভারতে আসা অনেক সহজ। এ বিষয় টা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এ সময়ে আরবের দক্ষিণে সমুদ্র সংলগ্ন অঞ্চল নিলো ইংল্যাণ্ড এবং উত্তরাঞ্চল নিলো ফ্রান্স। এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দীর্ঘ হাজার বছরের বিরোধের অবসান হয়ে গেছে এই শতাব্দীর শুরুতেই। এখন তাদের মাঝে গলায় গলায় খাতির।

তৎকালীন আরব প্রধানত দুই অংশে বিভক্ত ছিলো। মক্কা, মদীনা কেন্দ্রীক অংশটার নাম ছিলো হেজাজ। এটি পশ্চিম উত্তরে অবস্থিত। তুর্কি অটোমানদের প্রভাব ছিলো এ অঞ্চলে। আর এই হেজাজেরই নেতা ছিলেন শরীফ হুসাইন। আরবের পূর্বাঞ্চলের নাম ছিলো নজদ। এই নজদের উপর তুর্কিদের প্রভাব কম ছিলো। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নজদীরা না তুর্কিদের পক্ষে ছিলো, না মিত্র শক্তির পক্ষে ছিলো। তারা ছিলো নিরব দর্শক। বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপীয়রা যখন আরবদেরকে স্বাধীনতা দেয়ার পরিবর্তে ভাগ করে দখল করে নিলো তখন শরীফ বিন আলী প্রতিবাদ করতে লাগলেন। এতে করে হেজাজ (মক্কা, মদীনা) থেকে পরিকল্পিতভাবে শরীফ হুসাইনকে উৎখাত করে নজদের নেতা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে পুরো নজদ ও হেজাজের নেতৃত্বে বসায় ব্রিটিশ ও ফরাসীরা। আর শরীফের ভাইদেরকে দেয়া হরো জর্ডান ও মেসোপটেমিয়ার (ইরাক) কর্তৃত্ব। কিন্তু আরবের সর্ব পশ্চিমের ভূখণ্ড ফিলিস্তিনকে কারো সাথে না দিয়ে এমনকি স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীনতাও না দিয়ে ব্রিটেনের অধীনে রেখে দেয়া হলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের দিকে, ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী লর্ড উইলিয়াম বেলফোর যুক্তরাজ্যের ইহুদি কমিউনিটির নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথচাইল্ডকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে। উক্ত চিঠিতে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়। এটাই বেলফোর ঘোষণা হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত। ফিলিস্তিনি ভূমি কেন্দ্রীক ইহুদীদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। বেলফোর ঘোষণার আগ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ছিলো আফ্রিকার উগান্ডাতে ইহুদী রাষ্ট্র হবে। সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেলো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো।

ইহুদীদের নিকট ছিলো অঢেল সম্পদ। এই বইয়ের শুরুর দিকে আমরা জেনেছিলাম, পুরো ইউরোপের খ্রিষ্টান জগৎ ইউদীদেরকে পছন্দ করতো না। মুসলিমদের সাথে ইহুদীদের ছিলো দীর্ঘ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় দ্বারা বিশ্বব্যাপী ইহুদীরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। আর মুসলিমরা আশ্রয় দিয়ে এসেছে নির্যাতিত ইহুদিদেরকে। এমনি করে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে জায়গা কিনে ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়ায়। যেহেতু তুর্কি অটোমানদের সাথে ইহুদীদের একটা সুসম্পর্ক ছিলো সেহেতু তুর্কি জোট তথা অক্ষ শক্তির কেউ যদি ইহুদীদেরকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেবে বলে তবে ইহুদীদের বিশাল সম্পত্তি মিত্র শক্তির হাতছাড়া হয়ে যাবে। বিশেষ করে তুর্কিদের সাথে ইহুদীদের এমন একটা চুক্তি হওয়ার কথা ছিলো। অবশ্য সেটা ছিলো আফ্রিকা কেন্দ্রীক ইহুদী রাষ্ট্রের চিন্তা। তাছাড়া ইহুদীবাদী আন্দোলনগুলো পরিচালিত হতো জার্মান থেকে। ইহুদী নেতাদের আস্তানা ছিলো জার্মানে। সব মিলিয়ে অক্ষ শক্তির সুযোগ ছিলো ইহুদীদেরকে হাত করার। এ জন্য ব্রিটিশরা তড়িঘড়ি বেলফোর ঘোষণা দিয়ে ইহুদীদেরকে তাদের হাতে নিয়ে নেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং সুয়েজ খালে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সেখানে একটি ব্রিটিশ অনুগত রাষ্ট্র বেশ দরকারী বটে। পরের ইতিহাস দীর্ঘ রক্তাক্ত, যা আজো চলমান। পাশ্চাত্য শক্তি যা ভেবেছিলো তার চাইতে অনেক নিখুঁত হলো কাজটি। আর এর ফলাফলও তাদের ধরাণারও অতীত। তারা যতটুকু সুবিধা পাবে ভেবেছিলো বাস্তবে পেলো অনেক বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমাদের সহায়তায় আরবের বুকে গঠিত হলো অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। আরবদের অনৈক্যে সুযোগে অবৈধ দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্রটি তাদের সীমানা বাড়িয়েই চলছে। এভাবে তুরস্কের তানযিমাত থেকে শুরু হওয়া ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডি মহীরুহ আকার ধারণ করে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরবদের বোকামির দণ্ড হিসেবে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা চূড়ান্তরূপে বেজে উঠে!

চিন্তার স্বরূপ কী

চিন্তা করা হলো এই চরম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা যে, কেন কিছুই না থাকার বদলে কিছু একটা আছে। যেহেতু অস্তিত্বের আওতার বাইরে কিছুই নেই এবং সত্তার এই মহাশৃঙ্খলের বাইরে আর কিছুই নেই, তাই সমস্ত চিন্তাই হলো অস্তিত্ব ও তার অনন্ত রূপভেদ নিয়ে এক অনুশীলন।

আমরা যে কথিত তথ্যের যুগে বাস করছি, সেখানে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক ক্রিয়াকলাপের অর্থ আমরা হারিয়ে ফেলেছি: চিন্তা করা। আমরা তথ্য ও জ্ঞানের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটাই এবং প্রতারণামূলকভাবে মনে করি যে, চিন্তা করা মানেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ (processing information)।

চিন্তা করা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়। এটি উপাত্ত বিশ্লেষণও নয়। এটি কেবল বস্তুর সঙ্গে ধারণার সংযোগ স্থাপন বা ধারণাগত যৌক্তিক সম্পর্ক নির্ধারণও নয়। চিন্তা করা একটি সাধারণ মানসিক প্রক্রিয়ার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

চিন্তা করা হলো এই চরম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা যে, কেন কিছুই না থাকার বদলে কিছু একটা আছে। যেহেতু অস্তিত্বের আওতার বাইরে কিছুই নেই এবং সত্তার এই মহাশৃঙ্খলের বাইরে আর কিছুই নেই, তাই সমস্ত চিন্তাই হলো অস্তিত্ব ও তার অনন্ত রূপভেদ নিয়ে এক অনুশীলন। আমরা যখন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করি, সকালের হাওয়া নিয়ে মনোহর কবিতা রচনা করি কিংবা আধুনিক শহরগুলোর বিশ্লেষণ করি, মূলত তখন আমরা অস্তিত্বেরই বিভিন্ন দিক ও প্রকাশরূপ নিয়েই কাজ করছি।

সমস্ত চিন্তাকে অস্তিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; অন্যথায় আমরা কখনোই সলিপসিজম বা আত্মমাত্রিকতার (solipsism) ফাঁদ থেকে উত্তরণ পাব না। এই অর্থে, চিন্তা কেবল আমার মনের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের সমষ্টি নয়। যখন চিন্তা অস্তিত্বের সঙ্গে শেকড়গড়ে থাকে, তখন মন (res cogitans) ও জগতের (res extensa) ডেকার্টীয় দ্বৈতবাদের উদ্ভব ঘটে না। ধ্রুপদী দার্শনিকরা এই যুক্তিতেই আত্মকেন্দ্রিকতা ও দার্শনিক সংশয়বাদকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

অস্তিত্ব কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং সর্বব্যাপী বাস্তবতা। আমরা একে আমাদের মনে একটি ভাব বা ধারণা হিসেবে কল্পনা করতে পারি। কিন্তু অস্তিত্বের বাস্তবতা সর্বদা এর মানসিক উপস্থাপনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ব্যাপারটা যেন একটি দৃশ্য ও তার ছবির মধ্যকার পার্থক্যের মতো। যখন আমরা কোনো ছবি তুলি, আমরা সেই মুহূর্তটিকে স্থির করে ফেলি, তার প্রাকৃতিক প্রবাহ থেকে বের করে এনে একটি স্থির মুহূর্ত হিসেবে দেখি। আমরা যা দেখি তা যে অবাস্তব তা নয়। ছবি হিসেবে এটি কোনো কাল্পনিক বস্তু নয়। কিন্তু এটি বাস্তবতা নিজে নয়, বরং বাস্তবতার একটি ছবি মাত্র। সকল বিমূর্ত ধারণার ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটে, এটি এখন সেই অস্তিত্বের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যার মধ্যে এটি বিরাজমান। আমরা এই স্থির মুহূর্তটিকে বাস্তবতা বলে ধরে নিতে পারি না। কারণ বাস্তবতা কখনোই প্রবাহিত হওয়া থেমে যায় না।

চিন্তা হলো অস্তিত্বের এক অনুশীলন, কারণ আমরা যে প্রতিটি মানসিক সিদ্ধান্ত বা যৌক্তিক সম্পর্ক স্থাপন করি তা অস্তিত্বের সঙ্গেই যুক্ত। অস্তিত্ব (wujud) এবং বিদ্যমান বস্তু (mawjud)-এর মধ্যকার পার্থক্য এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলে। গাছ, আকাশ বা রাস্তার ওপারের বাড়ির মতো বস্তুগুলো বিদ্যমান থাকে। এদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা পরস্পর থেকে ভিন্ন। এদের প্রত্যেকটি নিজস্ব উপায়ে অস্তিত্বশীল। কিন্তু এদের একটি সাধারণ বিষয় মিল আছে, আর তা হলো—অস্তিত্বশীল হওয়ার ক্রিয়া। অথবা মোল্লা সদরার ধ্রুপদী দর্শনের ভাষায় বলতে গেলে, এরা সবাই অস্তিত্বে ‘অংশগ্রহণ’ করে। এমন নয় যে, অস্তিত্বশীল বস্তুগুলো মিলেই আমরা যাকে অস্তিত্ব বলি তা গঠন করে। বরং এর ঠিক উল্টোটাই সত্য: অস্তিত্ব হলো সেই সত্তা যা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অস্তিত্বশীল বিশেষ সত্তাগুলোকে সৃষ্টি করে। পর্বত, প্রাণী, মানুষ, বায়ু, বৃষ্টি, শহর এবং আমরা মানুষ হিসেবে নিজ হাতে তৈরি সব কিছু—এই জগৎ হিসেবে আমরা যা দেখি এবং অনুভব করি, অস্তিত্ব তার সবকিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। অস্তিত্ব অসংখ্য রূপভেদে এবং অনন্ত রঙে প্রকাশ পায়। অস্তিত্ব হলো সমস্ত বিদ্যমান বস্তুর সমষ্টির চেয়েও অনেক বেশি কিছু।

ঠিক যেভাবে বস্তুসমূহ (“দ্রব্য” বা substances) অস্তিত্বে অংশগ্রহণ করে, আমরা মানুষও অস্তিত্বে অংশগ্রহণ করি। এই অংশগ্রহণ আমাদের ও অস্তিত্বের মাঝে এক বিশেষ সংযোগ স্থাপন করে, কারণ আমরা এই বিশেষ সম্পর্কের তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করি।

যখন আমরা কোনো বস্তু, মুহূর্ত, পরিস্থিতি বা সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করি, মূলত তখন আমরা অস্তিত্ব ও তার অগণিত প্রকাশরূপ নিয়েই ভাবছি। এমন নয় যে, অস্তিত্বের জগৎ একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু যার কোনো অর্থ নেই এবং আমরাই তাতে অর্থ আরোপ করে দিই। উল্টো তার বিপরীত সত্য: বস্তুগুলো আমাদের থেকে স্বাধীনভাবেই অর্থ, উদ্দেশ্য, সুষমতা ও তাৎপর্যে ভরপুর। পাশ্চাত্য দর্শনে আত্মকেন্দ্রিকতার (subjectivism) যে মোড় নেওয়া হয়েছে, তা জগৎকে এক অর্থহীন বস্তুতে এবং মানুষকে জগৎহীন সত্তায় পরিণত করেছে। আর আমরা এখনো সেই গোলকধাঁধায় আটকে আছি। আমরা মনে করি, আমাদের ছাড়া এই মহাবিশ্বের কোনো অর্থ নেই। মূর্খতাপূর্ণ অহংকার ও অজ্ঞতাবশত আমরা দাবি করি যে, আমাদের সেবা করা ছাড়া অস্তিত্বের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। সত্যটি এর ঠিক উল্টো। আমরা বুঝি আর না বুঝি, জগতের নিজস্ব অর্থ আছে। আমরা কেবল আমাদের চেয়ে বৃহত্তর এক বাস্তবতার অংশমাত্র।

মুসলিম দার্শনিকরা দর্শনকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: “মানুষের সামর্থ্যানুযায়ী বস্তুর সত্যিকারের রূপটি জানার সক্ষমতা।” এই সংজ্ঞাটি অস্তিত্বের বাস্তবতা এবং তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সম্পর্কে অনেক কিছুই প্রকাশ করে: বস্তুগুলোর আমাদের থেকে স্বাধীন নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে এবং আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তা বোঝার চেষ্টা করতে পারি। জগতের মালিক আমরা নই। আমরা অস্তিত্বকে দাসের মতো ব্যবহার করতে পারি না। আমরা কেবল নিজ সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্যই একে রক্ষা ও লালন করতে পারি। অস্তিত্বের জগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনোই আধিপত্য বিস্তার বা শোষণের হতে পারে না।

চিন্তা করা মানে হলো, অস্তিত্ব নামক সেই জটিল ও গতিশীল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, যৌক্তিক ও আবেগীয় সক্ষমতাকে বিকশিত করা। অস্তিত্বের জগতকে কেবল আমার মানসিক গঠনে পরিণত করাটাই হলো আমরা যে সবচেয়ে মারাত্মক দার্শনিক ভুল করতে পারি। অস্তিত্বের বহুস্তরবিশিষ্ট বাস্তবতার ওপর বিভিন্ন জ্ঞানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল এর বাস্তবতা রপ্ত করতে এবং নিজেদের সত্য বুঝতে শুরু করতে পারি। এর অর্থ হলো জ্ঞান ও চিন্তাকে কেবল হিসাব-নিকাশমূলক বুদ্ধি এবং বিশ্লেষণমূলক আলোচনার গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়া।

জগতের যথার্থ উপলব্ধি লাভের জন্য আমাদের মস্তিষ্কের পাশাপাশি হৃদয়েরও ব্যবহার করতে হবে। দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প, কবিতা ও ধর্মও তেমনি সমভাবে জরুরি। কোনো চিন্তাই ততক্ষণ অর্থবহ নয়, যতক্ষণ না তা প্রজ্ঞার দিকে পরিচালিত করে এবং দেখায় যে অস্তিত্ব কীভাবে নিজেকে উন্মোচিত করে। চিন্তা কেবল তখনই আমাদের সমৃদ্ধ করবে, যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে আমরা জগতের মালিক নই, আমরা কেবল এর রক্ষক ও পালক হতে পারি।

লেখক পরিচিতি: ইব্রাহিম কালিন বর্তমানে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমআইটি)-এর প্রধান। প্রশাসনিক পদের বাইরে তিনি একজন দার্শনিক ও গবেষক। ইসলামী দর্শন, বিশেষত মোল্লা সদরার অস্তিত্ববাদ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক চিন্তাধারার সমালোচনা এবং অস্তিত্বের গভীরতর বিশ্লেষণই তার দার্শনিক লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের সাবেক মুখপাত্র ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

[সূত্রঃ প্রবন্ধটি Daily Sabah পত্রিকায় ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত]

মূল প্রবন্ধের লিংক- What is thinking? | Daily Sabah