তুরস্কের তানযিমাত, ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডি, আরবদের বোকামির দন্ড এবং ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা!

মুহাম্মদ ফজলুল হক দাউদ

সাহিত্যিক, ইতিহাস গবেষক, শিক্ষাবিদ

August 2, 2026
1 min read

ইসলামী সভ্যতার উত্থান আরবের মরুভূমিতে হলেও খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এ সভ্যতা বিশ্ব জয় করে নেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব আরবদের থেকে অনারবদের হাতে চলে যায়। নেতৃত্ব প্রথমে যায় পারস্যের নিকট। কিন্তু এটা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এরপর ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব চলে যায় তুর্কিদের নিকট। তুর্কিরা বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব দেয় প্রায় সাত শতাব্দী ধরে। এরপর পশ্চিমাদের আগ্রাসনে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা বাজে।

শিল্পবিপ্লব (১৭৬০), ফরাসী বিপ্লব (১৭৮৯) ও বিজ্ঞান বিপ্লবের (১৮৫০) ঢেউ খুব দ্রুত পুরো ইউরোপসহ তাদের উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বড় একটা অংশ যেহেতু অটোমান সাম্রাজ্যো অধীনে ছিলো সেহেতু এই তিন বিপ্লবের ধাক্কা তাদের গায়ে লাগে। শিল্প ও বিজ্ঞান বিপ্লবের সাথে খাপ খাইতে না পেরে তুর্কি সাম্রাজ্য আর্থিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

ফরাসী বিপ্লবের আঘাতে তুরস্কে তানযিমাত (সংস্কার) শুরু হয়েছিলো। তানযিমাত অর্থ পুনর্গঠন। ১৮৩৯ সাল থেকে শুরু করে ১৮৭৬ সালের তুরস্কের প্রথম সাংবিধানিক যুগের শুরু পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্যের সংস্কারমূলক কাজগুলো বোঝাতে তানযিমাত যুগ বলা হয়। উসমানীয় সাম্রাজ্যকে আধুনিক করে তোলার প্রচেষ্টা, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও আগ্রাসী শক্তি থেকে সাম্রাজ্যের সীমানার সুরক্ষাসহ আরো অনেক কাজের জন্য এই সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করছে। ১৮০০ সালের পরবর্তি সময়ে ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ পূর্ব ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে তুর্কিদের অধীনস্থ অনেক জাতির মাঝে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এ প্রেক্ষাপটে সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে অটোমানদের পক্ষে। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তুর্কি সুলতান বিভিন্ন সংস্কার শুরু করেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনস্থ এলাকার মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে থামাতে এই প্রচেষ্টা চালানো হয়। ১৮৩২ সালে এসে লন্ডন চুক্তির আলোকে তুরস্ক থেকে গ্রিস পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যায়। বলকান অঞ্চলের অটোমান অধীনস্থ অন্যান্য দেশগুলোতেও বিদ্রোহের দাবানল বিস্ফোরিত হতে থাকে।

‘তানজিমাত’ নামে তুরস্কে সার্বিক আধুনিকায়ন শুরু করেন সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ (১৭৮৫-১৮০৮-১৮৩৯)। তবে তিনি খুব বেশি সংস্কার কাজ করার সময় পাননি। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের মৃত্যুর পর তানযিমাতের কাজ এগিয়ে নেন সুলতান প্রথম আব্দুল মজিদ (১৮৩৯-১৮৬১)। ইনি মোটামুটি দুই দশকের লম্বা সময় পান। ১৮৩৯ সালে সূচিত তুরস্কের ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রমের আওতায় ছিলো কৃষি, শিল্প, অর্থ, শিক্ষা, আইন, ভূমি, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতি, জীবনাচার প্রভৃতি অনেক কিছুই। অধিক নাগরিক স্বাধীনতা ও সমানাধিকার দেয়ার মাধ্যমে অমুসলিম সম্প্রদায় ও তুর্কি ভিন্ন জাতিগুলোকে উসমানীয় সমাজের মূলধারায় আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

  • ১৮৪০ সালে প্রথম উসমানীয় ব্যাংক নোটের প্রচলন করা হয়, সাম্রাজ্যের প্রথম ডাকঘর প্রচলন করা হয়, ফরাসি রীতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন করা হয়, ফরাসি রীতিতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের পুনর্গঠন করা হয়।
  • ১৮৪৪ সালে আদমশুমারি শুরু করে তুর্কিরা।
  • ১৮৪৮ সালে প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে।
  • ১৮৫৬ সালে অমুসলিমদের জন্য জিজিয়া করের অবলুপ্তি করে।
  • ১৮৫৭ সালে ভূমি আইন প্রণয়ন করে।
  • ১৮৭৬ সালে প্রথম সাম্রাজ্যের সংবিধান প্রণয়ন করে।

মূলত অটোমানকর্তৃক পশ্চিমা ধাচে সংস্কার কার্যক্রম কর্মসূচী গ্রহন করতে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রাচ্যের সাম্রাজ্যগুলোর পতন চূড়ান্ত হয়েছিলো। এবং সুনির্দিষ্ট করে বললে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা বেজে গিয়েছিলো এ সময়ে। ঠিক এ সময়টিকে সর্বগ্রাসী ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত সফলতার সময় বলা যায়। এ সময়ে পারস্যের সাফাভিদ কিংবা ভারতের মোগলরা নাই। আটোমানদের পর এ দুইটা ছিলো বড় মুসলিম সাম্রাজ্য। মুসলিমদের বাইরে এশিয়া ও আফ্রিকায় অন্য কোনো সাম্রাজ্যও তখন আর ছিলো না। প্রায় সব কিছু ইউরোপীয়ানদের দখলে চলে যায়।

শিল্প ও বিজ্ঞান বিপ্লবের মাধ্যমে ইউরোপে যে বিশাল পুঁজির পাহাড় তৈরি হয় তার ছিটেফোঁটাও তুরস্কে হয় না। শিল্প বিপ্লবে অংশ নিতে না পারা বিশাল অটোমান সাম্রাজ্য অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে পিছিয়ে পড়ে। তাদের ভাগ্যে পরাজয়ের পর পরাজয় জুটতে থাকে। এ সুযোগটা কাজে লাগায় চীরপ্রতিদ্বন্দ্বি রাশিয়া। ১৮৫০ সাল নাগাদ উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ইউরোপের রুগ্ন ব্যক্তি বলে অবিহিত করতে থাকে রুশ সম্রাট জার প্রথম নিকোলাস (১৮২৫-১৮৫৫)। এখানে ব্যক্তি বলতে দেশ বুঝানো হয়। রুশদের থেকে এই প্রচারণা পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। অটোমানরা তখনো টিকে থাকলেও অস্তিত্বের লড়াই করতে থাকে।

এখানে আলাদা করে তুর্কিদের ১৮৫৭ সালের ভূমি সংস্কার আইন নিয়ে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে। তানযিমাতের অংশ হিসেবে উসমানীয়রা নতুন ভূমি নীতি প্রণয়ন করে। এ নীতিমালার আলোকে ভূমির মালিকানার কাঠামোতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। কর ব্যবস্থাকে সুসংহত করার জন্য জমির নিবন্ধন করতে বলা হয় সাম্রাজ্যের সর্বত্র। আরব ফিলিস্তিনিরা অধিকাংশ ছিলো কৃষক, তেমন শিক্ষাদীক্ষা ছিলো না তাদের। এই মানুষগুলো সরকারকে কর দিতে অনিচ্ছুক ছিলো। আর্থিক কষ্টে থাকা তুর্কি প্রশাসনের দরকার টাকা। কিন্তু আরব নাগরিকরা সেটা বুঝতে রাজি না। এ সময় স্থানীয় চালাক মুখতাররা নিজেদের নামে জমির নিবন্ধন করা শুরু করে। ঠিক এ সময়ে রাশিয়ান ইহুদী নেতা এলিয়ার ফিলিস্তিনে জমি কেনার অনুমতি প্রার্থনা করে অটোমানদের নিকট। ইহুদীরা অটোমান প্রশাসনকে নিশ্চয়তা দেয় নিয়মিত খাজনা আদায়ের। অটোমানরা খুশি হয়ে ইহুদীদেরকে আরব ভূখন্ডে জমি ক্রয়ের অনুমতি দেয়। এ সময়ে দলে দলে রাশিয়ার ইহুদীরা পরিকল্পিতভাবে আরবের স্থানীয় কৃষকদের সাথে এবং মুখতারদের সাথে বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে জমি কিনতে থাকে। অতিরিক্ত দাম পেয়ে স্থানীয় আরব কৃষকরা খুশি, নিয়মিত খাজনা পেয়ে অটোমান সম্রাটও খুশি। স্থানীয় আরব মুসলিম জমির দালালরা বিভিন্ন উপায়ে কৃষকদের থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে নতুন ইহুদি অভিবাসীদেরকে দিতে থাকে।

প্রথমে রাশিয়ান ইহুদীরা, তারপর জার্মান ইহুদীরা, এরপর পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে দলে দলে ইহুদীরা আরব ভূখন্ডে বসতি স্থাপন করতে লাগলো বিভিন্ন উপায়ে। আরব ভূখন্ড বলতে সমগ্র আরব না, তারা পরিকল্পিতভাবে ভূমি অধিগ্রহন করতে লাগলো ফিলিস্তিনে। ইহুদীবাদী জায়োনিস্ট আন্দোলন শুরু হয় আরো অন্তত দুই দশক পরে। তার আগেই অর্থাৎ অটোমানদের তানযিমাতের সময় নতুন ভূমি নীতিকে কাজে লাগিয়ে ইহুদীরা ফিলিস্তিন ভূমি দখলের সূত্রপাত করে। কিন্তু এ বিষয়টা না অটোমানরা বুঝলো, না আরবরা বুঝলো। পরবর্তি শতাব্দীর ইতিহাস তো আমাদের সবার জানা।

ইউরোপীয়দের ঐতিহাসিক ইহুদী বিদ্বেষের কথা সর্বজনবিদিত। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের প্রভাব কমতে থাকলে এবং ইউরোপীয়দের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাড়তে থাকলে শুরুর দিকে ইহুদী নির্যাতন বাড়ে। আবার ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব যখন বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন ইহুদী নির্যাতন কমতে থাকে। কিন্তু ইউরোপে ইহুদীদের বিদ্ধে এক ধরণের সামাজিক বর্ণবিদ্বেষ লেগেই ছিলো। শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা কমলেও মানসিক নির্যাতন তখনো বর্তমান ছিলো। ইহুদীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হতো। নির্যাতিত হতে হতে ইহুদীরা ভাবলো এই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। এই চিন্তা থেকেই নতুন করে ইহুদীবাদের জন্ম।

১৮ শতক পর্যন্ত দেখা যায়, ইহুদীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। বিশেষ করে রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রে তারা বেশি পরিমাণে ছিলো। প্রকৃতপক্ষে ইহুদীবাদের জন্ম হয় ফরাসী বিপ্লবের মধ্যদিয়ে জার্মানের রথচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে অনেক ইহুদী জ্ঞানী দার্শনিক একটি ইহুদী রাষ্ট্রে চিন্তা করেন যেটি তাদের পূর্বপুরুষদের আবাসস্থলে হবে। এই চিন্তকদের অধিকাংশই বসবাস করতো জার্মানে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেই আন্দোলন সেটাকে জায়নিস্ট আন্দোলন বলা হয়। Zion মূলত জেরুজালেমের একটি প্রাচীন পাহাড়।

১৮ এবং ১৯ শতকে ইহুদীদের মধ্যে ‘Haskala’ নামক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিমা ধর্মীয় নিরপেক্ষ শিক্ষা এবং সংস্কৃতির সাথে হিব্রু ধর্মীয় শিক্ষার একটা মেলবন্ধন করে। এই আন্দোলনের কেন্দ্র ছিলো জার্মানের বার্লিন। ইহুদীদের এসব তৎপরতার দ্বিতীয় কেন্দ্র ছিলো ইংল্যান্ডে। রথচাইল্ড পরিবারের ব্যাংক ব্যবসার দ্বিতীয় কেন্দ্র ছিলো ইংল্যান্ড। এবং ইহুদীবাদের তৃতীয় কেন্দ্র ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। অর্থাৎ যেখানেই শিল্পবিপ্লব প্রসার লাভ করছিলো সেখানেই পুঁজিবাদের হাত ধরে ইহুদীরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করছিলো।

১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্রাসেলস এ প্রথম জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। থিউডোর হার্জেল ছিলো এই কংগ্রেসের উদ্যোক্তা। এরপর প্রতি দুই বছর অন্তর জায়োনিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু করে। তারা জেরুজালেম কেন্দ্রীক একটা ইহুদী রাষ্ট্র দাবী করে ১৯০২ সালের দিকে। জেরুজালেমসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন অটোমানদের অধীনে। অটোমান সুলতান ইহুদীদের এই দাবী নাকচ করে দেয়। ইহুদীরা এরপর বিকল্পের জন্য ধরনা দিতে থাকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট। এর মাঝে ছিলো ব্রিটেন, জার্মান, রাশিয়া। অটোমানরা প্রস্তাব করলো আফ্রিকার উগান্ডাতে ইহুদী রাষ্ট্র হতে পারে। জার্মানও অটোমানদের এই প্রস্তাবে সায় দিলো। অটোমান ও জার্মানের উপর অন্য কেউ তেমন কিছু বলতে পারলো না। ইহুদীরাও মন্দের ভালো হিসেবে আপাতত মেনে নিয়েছিলো এই প্রস্তাব। পরবর্তিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে এই প্রস্তাব ভেস্তে যায়। এতে অবশ্য ইহুদীরা খুশিই হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষাবলম্বন করলে ব্রিটেন সাথে সাথে মিসর ও সুদান দখলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। অবশ্য সেখানে ১৮৮২ থেকেই ব্রিটিশ সৈন্য ছিলো। যুদ্ধ শেষে পরাজিত অটোমানদের সকল ভূখণ্ড ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভাগ করে নেয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষে তুরস্কের মূল ভূমিও ব্রিটেন, ফ্রান্স দখল করে নিতে চেয়েছিলো। কিন্তু তুর্কি সেনাপতি মোস্তফা কামাল পাশা বীরবিক্রমে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে প্রতিরোধ করে (১৯১৯-১৯২৩)। এতে করে টিকে যায় তুরস্কের মূল ভূখণ্ড।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর পুরো আরব এলাকা চলে যায় যুক্তরাজ্য- ফ্রান্সের অভিভাবকত্বে। মূলত আরবরাই তুরস্ককে তাড়িয়ে ইউরোপীয় দস্যুদেরকে ডেকে এনেছে। যুদ্ধ শেষে আরবদেরকে স্বাধীনতা দেয়ার পরিবর্তে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স আরব ভূখণ্ডকে টুকরো টুকরো করে ভাগ করে নেয়। ১৮৮৪ সালে যেমনি তারা আফ্রিকা ভাগ করেছিলো ঠিক তেমনটা। পার্থক্য হচ্ছে আফ্রিকা ছিলো বিশাল এলাকা এবং ভাগ কারী রাষ্ট্রও ছিলো ৮টি। আর এখানে আরব উপদ্বীপ হচ্ছে তুলনামূলকভাবে ছোটো এলাকা এবং দখলদার হচ্ছে ২টি রাষ্ট্র। অন্য ইউরোপীয়রা আরব ভূখণ্ড ভাগ চাইতে এলো না। আরবদের নিকটবর্তী মিশর অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশদের দখলে ছিলো। কারণ ভূমধ্য সাগর থেকে মিশর হয়ে সুয়েজ খাল দিয়ে ভারতে আসা অনেক সহজ। এ বিষয় টা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। এ সময়ে আরবের দক্ষিণে সমুদ্র সংলগ্ন অঞ্চল নিলো ইংল্যাণ্ড এবং উত্তরাঞ্চল নিলো ফ্রান্স। এখানে উল্লেখ্য যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দীর্ঘ হাজার বছরের বিরোধের অবসান হয়ে গেছে এই শতাব্দীর শুরুতেই। এখন তাদের মাঝে গলায় গলায় খাতির।

তৎকালীন আরব প্রধানত দুই অংশে বিভক্ত ছিলো। মক্কা, মদীনা কেন্দ্রীক অংশটার নাম ছিলো হেজাজ। এটি পশ্চিম উত্তরে অবস্থিত। তুর্কি অটোমানদের প্রভাব ছিলো এ অঞ্চলে। আর এই হেজাজেরই নেতা ছিলেন শরীফ হুসাইন। আরবের পূর্বাঞ্চলের নাম ছিলো নজদ। এই নজদের উপর তুর্কিদের প্রভাব কম ছিলো। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নজদীরা না তুর্কিদের পক্ষে ছিলো, না মিত্র শক্তির পক্ষে ছিলো। তারা ছিলো নিরব দর্শক। বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপীয়রা যখন আরবদেরকে স্বাধীনতা দেয়ার পরিবর্তে ভাগ করে দখল করে নিলো তখন শরীফ বিন আলী প্রতিবাদ করতে লাগলেন। এতে করে হেজাজ (মক্কা, মদীনা) থেকে পরিকল্পিতভাবে শরীফ হুসাইনকে উৎখাত করে নজদের নেতা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদকে পুরো নজদ ও হেজাজের নেতৃত্বে বসায় ব্রিটিশ ও ফরাসীরা। আর শরীফের ভাইদেরকে দেয়া হরো জর্ডান ও মেসোপটেমিয়ার (ইরাক) কর্তৃত্ব। কিন্তু আরবের সর্ব পশ্চিমের ভূখণ্ড ফিলিস্তিনকে কারো সাথে না দিয়ে এমনকি স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীনতাও না দিয়ে ব্রিটেনের অধীনে রেখে দেয়া হলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের দিকে, ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী লর্ড উইলিয়াম বেলফোর যুক্তরাজ্যের ইহুদি কমিউনিটির নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথচাইল্ডকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে। উক্ত চিঠিতে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়। এটাই বেলফোর ঘোষণা হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত। ফিলিস্তিনি ভূমি কেন্দ্রীক ইহুদীদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। বেলফোর ঘোষণার আগ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ছিলো আফ্রিকার উগান্ডাতে ইহুদী রাষ্ট্র হবে। সে অনুযায়ী সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেলো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলো।

ইহুদীদের নিকট ছিলো অঢেল সম্পদ। এই বইয়ের শুরুর দিকে আমরা জেনেছিলাম, পুরো ইউরোপের খ্রিষ্টান জগৎ ইউদীদেরকে পছন্দ করতো না। মুসলিমদের সাথে ইহুদীদের ছিলো দীর্ঘ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় দ্বারা বিশ্বব্যাপী ইহুদীরা নির্যাতিত হয়ে আসছে। আর মুসলিমরা আশ্রয় দিয়ে এসেছে নির্যাতিত ইহুদিদেরকে। এমনি করে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে জায়গা কিনে ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়ায়। যেহেতু তুর্কি অটোমানদের সাথে ইহুদীদের একটা সুসম্পর্ক ছিলো সেহেতু তুর্কি জোট তথা অক্ষ শক্তির কেউ যদি ইহুদীদেরকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেবে বলে তবে ইহুদীদের বিশাল সম্পত্তি মিত্র শক্তির হাতছাড়া হয়ে যাবে। বিশেষ করে তুর্কিদের সাথে ইহুদীদের এমন একটা চুক্তি হওয়ার কথা ছিলো। অবশ্য সেটা ছিলো আফ্রিকা কেন্দ্রীক ইহুদী রাষ্ট্রের চিন্তা। তাছাড়া ইহুদীবাদী আন্দোলনগুলো পরিচালিত হতো জার্মান থেকে। ইহুদী নেতাদের আস্তানা ছিলো জার্মানে। সব মিলিয়ে অক্ষ শক্তির সুযোগ ছিলো ইহুদীদেরকে হাত করার। এ জন্য ব্রিটিশরা তড়িঘড়ি বেলফোর ঘোষণা দিয়ে ইহুদীদেরকে তাদের হাতে নিয়ে নেয়।

মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং সুয়েজ খালে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সেখানে একটি ব্রিটিশ অনুগত রাষ্ট্র বেশ দরকারী বটে। পরের ইতিহাস দীর্ঘ রক্তাক্ত, যা আজো চলমান। পাশ্চাত্য শক্তি যা ভেবেছিলো তার চাইতে অনেক নিখুঁত হলো কাজটি। আর এর ফলাফলও তাদের ধরাণারও অতীত। তারা যতটুকু সুবিধা পাবে ভেবেছিলো বাস্তবে পেলো অনেক বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমাদের সহায়তায় আরবের বুকে গঠিত হলো অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল। আরবদের অনৈক্যে সুযোগে অবৈধ দখলদার ইসরাইল রাষ্ট্রটি তাদের সীমানা বাড়িয়েই চলছে। এভাবে তুরস্কের তানযিমাত থেকে শুরু হওয়া ফিলিস্তিন ট্র্যাজেডি মহীরুহ আকার ধারণ করে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরবদের বোকামির দণ্ড হিসেবে ইসলামী সভ্যতার বিদায় ঘন্টা চূড়ান্তরূপে বেজে উঠে!

Share:

Related Posts

View All
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চা: আলেম, শিক্ষা ও দাওয়াহর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চা: আলেম, শিক্ষা ও দাওয়াহর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

ড. এম. ইব্রাহীম খলিল আনোয়ারী

ড. এম. ইব্রাহীম খলিল আনোয়ারী

ফ্যাকাল্টি মেম্বার, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ। রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক থ্যট (বিআইআইটি), ঢাকা। মাস্টার ট্রেইনার, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা টিচার্স ট্রেইনিং ইন্সটিটিউট (বিএমটিটিআই)।

১. ভূমিকা একসময় জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে মানুষকে বই, শিক্ষক, গ্রন্থাগার বা বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হতো। ইসলামি জ্ঞানচর্চায় শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর কিতাব অধ্যয়ন, শিক্ষকের সান্নিধ্য ও আলেমদের আলোচনা থেকে জ্ঞান অর্জন করতেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডে কুরআনের আয়াত, হাদিস, ফিকহি মাসআলা বা ইসলামি বিষয়ের সারসংক্ষেপ জানা সম্ভব। এর ফলে […]
Read More
বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আলিয়া মাদরাসা নিয়ে একটি গবেষণা

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আলিয়া মাদরাসা নিয়ে একটি গবেষণা

আব্দুল মোমেন || মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম

আব্দুল মোমেন || মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম

সারসংক্ষেপ: এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাদান কাঠামো এবং ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষা প্রদানের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষ অধ্যাপকের প্রয়োজনীয়তা এবং একাডেমিক পরিবর্তনসমূহের অকার্যকর বাস্তবায়ন। এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো এই ব্যবস্থার সম্ভাবনা অনুসন্ধান […]
Read More
ইলম বা জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নারীদের ভ্রমণ

ইলম বা জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নারীদের ভ্রমণ

Al-Muhaddithat Team

Al-Muhaddithat Team

প্রাচীন এবং পরবর্তী যুগে হজ্জব্রত পালন ছিল আলেমদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। এর একটি দৃষ্টান্ত হলেন মারিয়াম বিনত নূরুদ্দীন আল-হূরিমিয়্যাহ [মৃ. ৮৭১ হি.]। তাঁর মাতামহ তাঁর শিক্ষার বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁকে মক্কায় নিয়ে যান, সেখানে তিনি ʿআফীফুদ্দীন আন-নাশাওয়ারী, আবুল আব্বাস ইবনে আবদিল মুতী, শিহাবুদ্দীন যাহিরাহ এবং […]
Read More