চিন্তার স্বরূপ কী
চিন্তা করা হলো এই চরম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা যে, কেন কিছুই না থাকার বদলে কিছু একটা আছে। যেহেতু অস্তিত্বের আওতার বাইরে কিছুই নেই এবং সত্তার এই মহাশৃঙ্খলের বাইরে আর কিছুই নেই, তাই সমস্ত চিন্তাই হলো অস্তিত্ব ও তার অনন্ত রূপভেদ নিয়ে এক অনুশীলন।
আমরা যে কথিত তথ্যের যুগে বাস করছি, সেখানে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক ক্রিয়াকলাপের অর্থ আমরা হারিয়ে ফেলেছি: চিন্তা করা। আমরা তথ্য ও জ্ঞানের মধ্যে বিভ্রান্তি ঘটাই এবং প্রতারণামূলকভাবে মনে করি যে, চিন্তা করা মানেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ (processing information)।
চিন্তা করা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়। এটি উপাত্ত বিশ্লেষণও নয়। এটি কেবল বস্তুর সঙ্গে ধারণার সংযোগ স্থাপন বা ধারণাগত যৌক্তিক সম্পর্ক নির্ধারণও নয়। চিন্তা করা একটি সাধারণ মানসিক প্রক্রিয়ার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
চিন্তা করা হলো এই চরম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা যে, কেন কিছুই না থাকার বদলে কিছু একটা আছে। যেহেতু অস্তিত্বের আওতার বাইরে কিছুই নেই এবং সত্তার এই মহাশৃঙ্খলের বাইরে আর কিছুই নেই, তাই সমস্ত চিন্তাই হলো অস্তিত্ব ও তার অনন্ত রূপভেদ নিয়ে এক অনুশীলন। আমরা যখন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করি, সকালের হাওয়া নিয়ে মনোহর কবিতা রচনা করি কিংবা আধুনিক শহরগুলোর বিশ্লেষণ করি, মূলত তখন আমরা অস্তিত্বেরই বিভিন্ন দিক ও প্রকাশরূপ নিয়েই কাজ করছি।
সমস্ত চিন্তাকে অস্তিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; অন্যথায় আমরা কখনোই সলিপসিজম বা আত্মমাত্রিকতার (solipsism) ফাঁদ থেকে উত্তরণ পাব না। এই অর্থে, চিন্তা কেবল আমার মনের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের সমষ্টি নয়। যখন চিন্তা অস্তিত্বের সঙ্গে শেকড়গড়ে থাকে, তখন মন (res cogitans) ও জগতের (res extensa) ডেকার্টীয় দ্বৈতবাদের উদ্ভব ঘটে না। ধ্রুপদী দার্শনিকরা এই যুক্তিতেই আত্মকেন্দ্রিকতা ও দার্শনিক সংশয়বাদকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
অস্তিত্ব কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি সবচেয়ে সুস্পষ্ট এবং সর্বব্যাপী বাস্তবতা। আমরা একে আমাদের মনে একটি ভাব বা ধারণা হিসেবে কল্পনা করতে পারি। কিন্তু অস্তিত্বের বাস্তবতা সর্বদা এর মানসিক উপস্থাপনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ব্যাপারটা যেন একটি দৃশ্য ও তার ছবির মধ্যকার পার্থক্যের মতো। যখন আমরা কোনো ছবি তুলি, আমরা সেই মুহূর্তটিকে স্থির করে ফেলি, তার প্রাকৃতিক প্রবাহ থেকে বের করে এনে একটি স্থির মুহূর্ত হিসেবে দেখি। আমরা যা দেখি তা যে অবাস্তব তা নয়। ছবি হিসেবে এটি কোনো কাল্পনিক বস্তু নয়। কিন্তু এটি বাস্তবতা নিজে নয়, বরং বাস্তবতার একটি ছবি মাত্র। সকল বিমূর্ত ধারণার ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটে, এটি এখন সেই অস্তিত্বের প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যার মধ্যে এটি বিরাজমান। আমরা এই স্থির মুহূর্তটিকে বাস্তবতা বলে ধরে নিতে পারি না। কারণ বাস্তবতা কখনোই প্রবাহিত হওয়া থেমে যায় না।
চিন্তা হলো অস্তিত্বের এক অনুশীলন, কারণ আমরা যে প্রতিটি মানসিক সিদ্ধান্ত বা যৌক্তিক সম্পর্ক স্থাপন করি তা অস্তিত্বের সঙ্গেই যুক্ত। অস্তিত্ব (wujud) এবং বিদ্যমান বস্তু (mawjud)-এর মধ্যকার পার্থক্য এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তোলে। গাছ, আকাশ বা রাস্তার ওপারের বাড়ির মতো বস্তুগুলো বিদ্যমান থাকে। এদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এরা পরস্পর থেকে ভিন্ন। এদের প্রত্যেকটি নিজস্ব উপায়ে অস্তিত্বশীল। কিন্তু এদের একটি সাধারণ বিষয় মিল আছে, আর তা হলো—অস্তিত্বশীল হওয়ার ক্রিয়া। অথবা মোল্লা সদরার ধ্রুপদী দর্শনের ভাষায় বলতে গেলে, এরা সবাই অস্তিত্বে ‘অংশগ্রহণ’ করে। এমন নয় যে, অস্তিত্বশীল বস্তুগুলো মিলেই আমরা যাকে অস্তিত্ব বলি তা গঠন করে। বরং এর ঠিক উল্টোটাই সত্য: অস্তিত্ব হলো সেই সত্তা যা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অস্তিত্বশীল বিশেষ সত্তাগুলোকে সৃষ্টি করে। পর্বত, প্রাণী, মানুষ, বায়ু, বৃষ্টি, শহর এবং আমরা মানুষ হিসেবে নিজ হাতে তৈরি সব কিছু—এই জগৎ হিসেবে আমরা যা দেখি এবং অনুভব করি, অস্তিত্ব তার সবকিছুর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। অস্তিত্ব অসংখ্য রূপভেদে এবং অনন্ত রঙে প্রকাশ পায়। অস্তিত্ব হলো সমস্ত বিদ্যমান বস্তুর সমষ্টির চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
ঠিক যেভাবে বস্তুসমূহ (“দ্রব্য” বা substances) অস্তিত্বে অংশগ্রহণ করে, আমরা মানুষও অস্তিত্বে অংশগ্রহণ করি। এই অংশগ্রহণ আমাদের ও অস্তিত্বের মাঝে এক বিশেষ সংযোগ স্থাপন করে, কারণ আমরা এই বিশেষ সম্পর্কের তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করি।
যখন আমরা কোনো বস্তু, মুহূর্ত, পরিস্থিতি বা সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করি, মূলত তখন আমরা অস্তিত্ব ও তার অগণিত প্রকাশরূপ নিয়েই ভাবছি। এমন নয় যে, অস্তিত্বের জগৎ একটি নিষ্ক্রিয় বস্তু যার কোনো অর্থ নেই এবং আমরাই তাতে অর্থ আরোপ করে দিই। উল্টো তার বিপরীত সত্য: বস্তুগুলো আমাদের থেকে স্বাধীনভাবেই অর্থ, উদ্দেশ্য, সুষমতা ও তাৎপর্যে ভরপুর। পাশ্চাত্য দর্শনে আত্মকেন্দ্রিকতার (subjectivism) যে মোড় নেওয়া হয়েছে, তা জগৎকে এক অর্থহীন বস্তুতে এবং মানুষকে জগৎহীন সত্তায় পরিণত করেছে। আর আমরা এখনো সেই গোলকধাঁধায় আটকে আছি। আমরা মনে করি, আমাদের ছাড়া এই মহাবিশ্বের কোনো অর্থ নেই। মূর্খতাপূর্ণ অহংকার ও অজ্ঞতাবশত আমরা দাবি করি যে, আমাদের সেবা করা ছাড়া অস্তিত্বের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। সত্যটি এর ঠিক উল্টো। আমরা বুঝি আর না বুঝি, জগতের নিজস্ব অর্থ আছে। আমরা কেবল আমাদের চেয়ে বৃহত্তর এক বাস্তবতার অংশমাত্র।
মুসলিম দার্শনিকরা দর্শনকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন: “মানুষের সামর্থ্যানুযায়ী বস্তুর সত্যিকারের রূপটি জানার সক্ষমতা।” এই সংজ্ঞাটি অস্তিত্বের বাস্তবতা এবং তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সম্পর্কে অনেক কিছুই প্রকাশ করে: বস্তুগুলোর আমাদের থেকে স্বাধীন নিজস্ব বাস্তবতা রয়েছে এবং আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তা বোঝার চেষ্টা করতে পারি। জগতের মালিক আমরা নই। আমরা অস্তিত্বকে দাসের মতো ব্যবহার করতে পারি না। আমরা কেবল নিজ সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্যই একে রক্ষা ও লালন করতে পারি। অস্তিত্বের জগতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনোই আধিপত্য বিস্তার বা শোষণের হতে পারে না।
চিন্তা করা মানে হলো, অস্তিত্ব নামক সেই জটিল ও গতিশীল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, যৌক্তিক ও আবেগীয় সক্ষমতাকে বিকশিত করা। অস্তিত্বের জগতকে কেবল আমার মানসিক গঠনে পরিণত করাটাই হলো আমরা যে সবচেয়ে মারাত্মক দার্শনিক ভুল করতে পারি। অস্তিত্বের বহুস্তরবিশিষ্ট বাস্তবতার ওপর বিভিন্ন জ্ঞানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করার মাধ্যমেই আমরা কেবল এর বাস্তবতা রপ্ত করতে এবং নিজেদের সত্য বুঝতে শুরু করতে পারি। এর অর্থ হলো জ্ঞান ও চিন্তাকে কেবল হিসাব-নিকাশমূলক বুদ্ধি এবং বিশ্লেষণমূলক আলোচনার গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়া।
জগতের যথার্থ উপলব্ধি লাভের জন্য আমাদের মস্তিষ্কের পাশাপাশি হৃদয়েরও ব্যবহার করতে হবে। দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, শিল্প, কবিতা ও ধর্মও তেমনি সমভাবে জরুরি। কোনো চিন্তাই ততক্ষণ অর্থবহ নয়, যতক্ষণ না তা প্রজ্ঞার দিকে পরিচালিত করে এবং দেখায় যে অস্তিত্ব কীভাবে নিজেকে উন্মোচিত করে। চিন্তা কেবল তখনই আমাদের সমৃদ্ধ করবে, যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে আমরা জগতের মালিক নই, আমরা কেবল এর রক্ষক ও পালক হতে পারি।
লেখক পরিচিতি: ইব্রাহিম কালিন বর্তমানে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমআইটি)-এর প্রধান। প্রশাসনিক পদের বাইরে তিনি একজন দার্শনিক ও গবেষক। ইসলামী দর্শন, বিশেষত মোল্লা সদরার অস্তিত্ববাদ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক চিন্তাধারার সমালোচনা এবং অস্তিত্বের গভীরতর বিশ্লেষণই তার দার্শনিক লেখার মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ানের সাবেক মুখপাত্র ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
[সূত্রঃ প্রবন্ধটি Daily Sabah পত্রিকায় ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত]
মূল প্রবন্ধের লিংক- What is thinking? | Daily Sabah
Related Posts
View All
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চা: আলেম, শিক্ষা ও দাওয়াহর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
ড. এম. ইব্রাহীম খলিল আনোয়ারী
ফ্যাকাল্টি মেম্বার, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ। রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক থ্যট (বিআইআইটি), ঢাকা। মাস্টার ট্রেইনার, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা টিচার্স ট্রেইনিং ইন্সটিটিউট (বিএমটিটিআই)।
বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: আলিয়া মাদরাসা নিয়ে একটি গবেষণা
আব্দুল মোমেন || মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম
ইলম বা জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নারীদের ভ্রমণ
Al-Muhaddithat Team